সময় ব্যবস্থাপনার জন্য কুরআন থেকে প্রাপ্ত ৫টি শিক্ষা

সময়, সময় ব্যবস্থাপনা, ঘড়ি

সমাজের অধিকাংশ লোক আপনাকে বলবে, সময়ের সঠিক ব্যবস্থাপনা শিক্ষা করা আপনার চাপ হ্রাস করবে, অলস হওয়া থেকে বিরত রাখবে, আপনার সুযোগসমূহকে প্রসারিত করবে, ক্যারিয়ারে আপনাকে আরও সাফল্য দেবে ইত্যাদি।

একজন মুসলিমের জন্য এই কারণগুলিও গুরুত্বপূর্ণ, তবে এগুলিই মুখ্য উদ্দেশ্য নয়।

একজন মুসলিম সময়ের ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে করবে তার প্রাথমিক ও মুখ্য কারণ হল সে আখিরাতের সফলতা চায়। 

তাঁর জন্য সময় ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্য হল কার্যকরভাবে সময়কে এমন কাজের মাধ্যমে অতিবাহিত করা যেগুলি তাঁকে মূল লক্ষ্যের নিকটে নিয়ে যায়।

আর একজন মুমিনের জন্য চূড়ান্ত লক্ষ্য হল জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তর জান্নাতুল ফিরদাউসের উত্তরাধিকারী হওয়া। তাঁর বাকি সব লক্ষ্য এই চূড়ান্ত লক্ষ্যটিকে সামনে রেখেই আবর্তিত হয়।

এই পৃথিবীতে সময়কে কীভাবে পরিচালনা করা উচিত সে সম্পর্কে কুরআনে পরিপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। সূরা আল-মু’মিনের আলোকে এখানে কিছু শিক্ষা তুলে ধরা হল।

১)সালাত- সময় ব্যবস্থাপনার মূলভিত্তি

সূরা আল-মু’মিনূন শুরু হয়েছে মুমিন বান্দাদের কিছু গুণাবলীর বর্ণনা দেওয়ার মাধ্যমে। মজার বিষয় হল, গুণাবলীর এই তালিকাটি শুরু হয়েছে সালাত দিয়ে এবং শেষও হয়েছে সালাত দিয়ে। আর এর মধ্যে বাকি গুণগুলির আলোচনা এসেছে। ২ নং আয়াতে সালাতে খুশু (নম্র ও বিনয়ী) বজায় রাখার কথা উল্লেখিত হয়েছে। আবার ৯ নং আয়াতে আপনাকে নামাজের ‘হাফিজ’ অর্থাৎ, সংরক্ষণকারী হওয়ার কথা বলা হয়েছে, যার অর্থ সকল নামাজ নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে আদায় করা।

একজন সত্যিকারের মুমিন বান্দা যেখানেই থাকুক বা যে অবস্থাতেই থাকুক না কেন দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন। এমনকি যদি তিনি আইসিইউতে অর্ধ-পক্ষাঘাতগ্রস্থ অবস্থায় পড়ে থাকেন এবং তাঁর বুদ্ধি বাকি থাকে এবং তিনি মাথা নড়াতে সক্ষম হন তবে তার জন্যও নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে নামাজ আদায় করতে হয়। সুতরাং, একজন মুমিনের জন্য সময় ব্যবস্থাপনা হয় নামাজ কেন্দ্রিক।

নামাজ যদি যথাযথ নয়মে খুশু-খুযুর সাথে আদায় করা হয় তবে তা মনকেও হালকা করে এবং সারা দিনের কর্ম্যব্যস্ততার মধ্যে এক ধরণের কর্মউদ্দীপনা সৃষ্টি করে। এতে করে সময়ের যথযথ ব্যবহার করাটাও সহজ হয়।

২) লক্ষ্য নির্ধারণ

“তোমরা কি মনে করেছিলে যে, আমি তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমার নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে না?” (আল কুরআন-২৩:১১৫)

প্রকৃতপক্ষে সাফল্য এবং ব্যর্থতা কিয়ামতের দিন এমন স্কেল দ্বারা পরিমাপ করা হবে যেটি আমাদের জীবনের সকল ভাল-মন্দকে ওজন করবে। আমলের এই ওজনই সিদ্ধান্ত দেবে যে, আমরা জান্নাতে পৌঁছাব নাকি জাহান্নামের আগুনের জ্বালানী হব।

সুতরাং, আপনার লক্ষ্য নির্ধারণের সময় এই স্কেলটি মাথায় রাখুন।

৩) জরুরী ভিত্তিতে কর্ম সম্পাদনের চেতনা

আমরা যদি আখিরাতের জীবনের সাথে তুলনা করি তবে বুঝতে পারব যে, এই দুনিয়াতে আমরা খুব স্বল্প সময়ের জন্য প্রেরীত হয়েছি।

আল্লাহ আমাদেরকে এই সূরায় বিভিন্ন জাতির উদাহরণ দিয়েছেন যারা তাদের অবিশ্বাস, অহংকার ও পুনরুত্থানের অস্বীকারের জন্য ধ্বংস হয়েছিল। কিয়ামতের দিন যখন তারা পৃথিবীতে কতটা সময় অবস্থান করেছিল সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে তখন তারা উত্তর দেবে:

“একদিন বা একদিনের কিছু অংশ” (আল কুরআন-২৩: ১১২)

মৃত্যুর সময় কাফেররা আল্লাহকে অনুরোধ করবে তাদেরকে যেন দ্বিতীয়বারের মত পৃথিবীতে আসার সুযোগ দেওয়া হয় আর তারা সে সময়টিকে ভালোভাবে অতিবাহিত করবে। তবে তাদের এই অনুরোধ গ্রহণ করা হবে না কারণ সময় শেষ হয়ে গেছে এবং তারা কোনো অতিরিক্ত সময় পাবে না।

অন্যদিকে, মুমিনগণ এ বিষয়ে একধাপ এগিয়ে। তারা দৃঢ়ভাবে আখিরাতের জবাবদিহিকে বিশ্বাস করে। সুতরাং তারা ভাল কাজের দিকে দৌড়ায় এবং অন্য সকলকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।

৪) সময়-অপচয়কারীদেরকে এড়ানো

মুমিনদের সাধারণ অবস্থা হল তারা সময়ের অপচয় করা থেকে বেঁচে থাকে। তাদেরকে এমন সব বিষয় থেকেও দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয় যা তাদের লক্ষ্য থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়। আর এর মধ্যে অন্যতম হল যারা সময় অপচয় করে তাদের সাথে সময় কাটানো।

অপরদিকে কাফেররা মন্দ কাজ করার মধ্য দিয়ে তাদের সময় ব্যয় করে। তাদের সময়ের একটি বড় অংশ অন্যকে নিয়ে মজা করার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়।

আখিরাতে তারাই সফল হবে যারা বুদ্ধিমানদেরকে বন্ধু বানায় এবং সময় অপচয় থেকে বেঁচে থাকে।

৫)বরকতের ধারণাকে বোঝা

আল্লাহ হলেন সময়ের মালিক। তাই আল্লাহ যার সময়ে বরকত দেবেন সেই সময়কে যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারবে। তাই আল্লাহর নিকট সময়ের বরকতের জন্য দু’আ করা চাই।