শরিয়াহ সম্মত ওয়েব পরিবেশ. আরওসন্ধানকরুন

সাইয়েদ আলী হামদানীর সুফি ধ্বনিতে ইসলাম ও ফার্সি প্রসার কাশ্মীরে

M
ID 82085999 © Janusz Pieńkowski | Dreamstime.com

কাশ্মীরে ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বেশী অবদান ইসলাম প্রচারক ও সুফি-দরবেশদের। মুসলিম শাসকরাও এক্ষেত্রে অনন্য ও অসাধারণ ভূমিকা পালন করেন।

একদা কাশ্মীরের জনগণের একাংশ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ছিল। হিন্দুর সংখ্যাও বৌদ্ধদের চেয়ে কম ছিল না। এই বৌদ্ধ ও হিন্দু জনগোষ্ঠী কালক্রমে প্রায় শতভাগ ইসলামের অনুসারী হয়ে যায়। ইতিহাস থেকে দেখা যায়, ইসলাম যেখানেই বিজয়ী ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেখানে স্থানীয়দের স্বাধীনতা, স্বকীয়তা এবং ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতির ওপর পারতপক্ষে হস্তক্ষেপ করেনি। ইসলামের মূল শিক্ষা, দর্শন এবং অনুসরণীয় অপরিহার্য বিষয়গুলোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিষয়াবলীই শুধু নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

কাশ্মীরের ক্ষেত্রেও এটা লক্ষ্য করা গেছে। কাশ্মীরিদের স্বাধীনতা বিনষ্ট না করে ইসলামের সঙ্গে বিরোধীয় নয়, এমন অনুসরণীয় আচার-সংস্কৃতির ওপর আঘাত না হেনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সাধন করেছিলেন মুসলমান শাসকগণ। তাদের দিক-নির্দেশনা দানসহ সব রকমের সহযোগিতা প্রদান করেছিলেন সুফি-দরবেশগণ। যতদূর জানা যায়, ১১১৮ সালে মধ্য এশিয়া থেকে আগত জুল কদর খান (যিনি তাতার জুলজু নামেও পরিচিত ছিলেন) কাশ্মীরে অভিযান চালান। তার কয়েক মাসের এই অভিযানের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো কাশ্মীরিদের সঙ্গে ইসলামের পরিচয় ঘটে।

তবে কাশ্মীরে ইসলামের গভীর প্রভাব বিস্তৃত হয় অষ্টম শতকের পরে। এক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করেন দু’জন সুফি সাধক। এদের একজনের নাম হযরত বুলবুল শাহ কলন্দর। অন্য জনের নাম সাইয়েদ আলী হামাদানি। হযরত বুলবুল শাহ কলন্দর ইরান বা মধ্য-এশিয়ার কোনো দেশ থেকে ইসলাম প্রচারের জন্য কাশ্মীরে আসেন। তার প্রচারকর্মের মধ্য দিয়ে ইসলামের প্রসার ঘটতে থাকে। তখন কাশ্মীরের শাসক ছিলেন বৌদ্ধ রাজা রিনচানা। তিনি হযরত বুলবুল শাহ কলন্দরের কাছে সপরিবারে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন। এটা ছিল সে সময় বিপুল আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা। কাশ্মীরি সমাজে এর ফলে এক বিরাট পরিবর্তনের সূত্রপাত হয়। রাজার অনুসরণে জনসাধারণের একটা বিরাট অংশ ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়ে যায়। রাজা রিনচানা সম্পর্কে যতদূর জানা যায়, তিনি ছিলেন লাদাখের এক অভিজাত পরিবারের সন্তান।

ফিদা হাসনাইন তার সম্পর্কে লিখেছেন, তিনি ছিলেন বিশ্বাসের দিক থেকে বৌদ্ধ। কিন্তু উপত্যকায় তাদের সংখ্যা ছিল কম। অধিকাংশ কাশ্মীরি ছিল ব্রাহ্মণ। এমতাবস্থায়, তিনি দেবস্বামী ব্রাহ্মণ সমাজের প্রধানের কাছে অনুরোধ করেছিলেন, তাদের সমাজে তাকে অন্তর্ভুক্ত করে নিতে। তার এ অনুরোধ প্রত্যাখ্যাত হয়। অতঃপর তিনি সপরিবারের ইসলাম গ্রহণ করেন। তার মুসলমান নাম হয় শামসুদ্দীন (কারো কারো মতে সদরুদ্দিন)।

এরপর থেকে পরবর্তী কয়েক শতকে কাশ্মীরে ইসলামের নিরঙ্কুশ প্রতিষ্ঠা  ঘটে। এ সময় বহু সূফী-দরবেশের কাশ্মীরে আগমন ঘটে এবং তারা ইসলামের প্রচার ও শিক্ষা বিস্তারে নিরলস ভূমিকা পালন করেন। ঐতিহাসিকদের মতে, হযরত বুলবুল শাহ কলন্দরের পর এক্ষেত্রে যার সবচেয়ে বেশি অবদান তিনি হলেন সাইয়েদ আলী হামাদানি।

তখন কাশ্মীরের শাসক ছিলেন সুলতান সিকান্দর শাহ (১৩৯৩-১৪১৩)। তিনি হযরত হামাদানির দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত ছিলেন। কাশ্মীরের সংস্কৃতিতে হযরত হামাদানির প্রভাব এখনো বিদ্যমান। কাশ্মীরের শিক্ষা ও অর্থনীতিতে তার অবদান ঐতিহাসিকভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে। মনে করা হয় যে, তিনি ইরান থেকে এসেছিলেন এবং সেখান থেকে বেশ কিছু অনুসারী নিয়ে এসেছিলেন, যাদের মধ্য ছিলেন জ্ঞানী, গুণী, বিদ্বান ও শিল্পী।

কাশ্মীর অঞ্চলে ইসলাম ধর্ম ও ফার্সি ভাষা এবং সাহিত্যের বিস্তারে মির সাইয়্যেদ আলী হামেদানি ও তার সুযোগ্য ছাত্রদের অবদানের কথা প্রখ্যাত কোনো কোনো লেখকের বর্ণনায়ও উঠে এসেছে। এ অঞ্চলসহ নানা অঞ্চলে সাইয়্যেদ আলী হামেদানি ও তার সুযোগ্য ছাত্রদের বংশধর তথা পরবর্তী প্রভাবশালী প্রজন্ম আজও সক্রিয় রয়েছে। অনেক ঐতিহাসিক ও গবেষক মনে করেন ভারত উপমহাদেশ এবং কাশ্মীরে বেশ কিছু শিল্পের প্রচলন ও বিকাশ সাইয়্যেদ হামেদানি ও তার সুযোগ্য ছাত্রদের শিল্প-সাধনার কাছে ঋণী। আমরা আরও জেনেছি হামেদানি তার সুফি-তাত্ত্বিক চিন্তাধারা ও শিক্ষা বর্ণনায় গাজ্জালি, আত্তার, রুমি, সা’দী ও শাবিস্তারির মত খ্যাতনামা আরেফ বা সুফি-সাধকদের চিন্তাধারা এবং রচনা ব্যবহার করেছেন।

সাইয়্যেদ আলী হামেদানি কাশ্মীরের আলেম, পর্যটক এবং বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মসহ অন্য ধর্মের সন্ন্যাসী বা পুরোহিতদের সঙ্গে আলোচনা ও বিতর্কে অংশ নিতেন। এসব বিতর্কে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তিনি বিজয়ী হতেন। ইতিহাস বলে, সাইয়্যেদ আলী হামেদানি কাশ্মিরে মোট পাঁচ বছর ছিলেন।  এ সময় তার হাতে তিন হাজার ৭০০ ব্যক্তি মুসলমান হন। তার অসাধারণ সামাজিক ও আধ্যাত্মিক প্রভাবের কারণে এ অঞ্চলে ইসলামের ব্যাপক প্রসার ঘটেছিল। হামেদানি এ অঞ্চলের জনগণকে ইসলামের প্রতি এত গভীর অনুরাগী করতে সক্ষম হন যে তারা নিজ উপাসনালয়গুলোকে ভেঙ্গে ফেলতেন এবং ঐসব উপাসনালয়ের জায়গায় মসজিদ নির্মাণ করতেন। তারা সাইয়্যেদ হামেদানির সঙ্গীদের দাওয়াত দিয়ে আনতেন যাতে তারা নব-নির্মিত মসজিদগুলোতে আযান দেন এবং সেইসব মসজিদকে চালু করেন।

স্থানীয় শাসকরা হামেদানির আদেশ-নিষেধ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন এবং তার প্রচারমূলক ও শিক্ষামূলক তৎপরতা সব সময়ই ছিল খুব বরকতময়।

ভারতের বিখ্যাত হিন্দু আর বৌদ্ধ জাদুকর ও যোগী-সন্ন্যাসীরা সাইয়্যেদ হামেদানির সঙ্গে বিতর্কের সময় তার যৌক্তিক বক্তব্য এবং নানা কারামাত বা অলৌকিক ঘটনা দেখে স্বেচ্ছায় মুসলমান হয়ে যেতেন। আর এসব বিষয় সাধারণ জনগণের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। প্রজ্ঞা ও ধার্মিকতার জন্য খ্যাত সাইয়্যেদ হামেদানির এসব সাফল্যের পটভূমিতে কাশ্মির অঞ্চলে শিয়া মুসলিম মাজহাবেরও ব্যাপক বিকাশ ঘটে বলে মনে করা হয়।

কাশ্মীরে কার্পেট ও শাল শিল্পের সূচনা হযরত হামাদানির অনুসারীদের দ্বারাই হয়েছে, যা শত শত বছর ধরে ‘কাশ্মীরি ঐতিহ্য’ হিসাবে পরিগণিত। শত শত বছর ধরে কাশ্মীরি অর্থনীতির প্রধান স্তম্ভ হয়ে আছে এই কার্পেট ও শাল শিল্প।

আধ্যাত্মিকতা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতিতে অসাধারণ অবদান রয়েছে হযরত হামাদানির। শুধু কাশ্মীর নয়, মধ্য এশিয়াজুড়ে তার আধ্যাত্মিক প্রভাব বিস্তৃত হয়ে আছে। তিনি এখনো অনুসারিত হয়ে থাকেন। বর্তমান পাকিস্তানের হাজারা জেলায় তিনি ইন্তেকাল করেন। তবে তাকে সমাহিত করা হয় কাজাখিস্তানে।

সাইয়্যেদ আলী হামাদানি সব সময়ই ধর্মীয় বিশ্বাস ও চিন্তাধারার বিষয়ে জনগণের সঙ্গে কথা বলতেন এবং তাদেরকে উপদেশ দিতেন। তিনি নৈতিক নানা বিষয় খুব সুমিষ্ট ও আকর্ষণীয় ভাষায় তুলে ধরতেন। উপস্থিত জনগণের প্রতিভা ও জ্ঞানগত ধারণ-ক্ষমতার আলোকে সহজ সরল ভাষায় বক্তব্য রাখতেন তিনি। ধর্ম প্রচারের পাশাপাশি তিনি এ অঞ্চলে ফার্সি ভাষারও প্রচলন করতে সক্ষম হন। কাশ্মীর অঞ্চলের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রের উন্নয়নে হামাদানির প্রচার কাজ ও তৎপরতা ফার্সি ভাষার কাছে ঋণী।  ইসলাম ও ফার্সি ভাষার পারস্পরিক এই প্রভাবের জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত হয়ে আছে কাশ্মীর। এক সময় কাশ্মীরকে বলা হত ক্ষুদ্র ইরান এবং হামাদানিকে বলা হয় ‘কাশ্মীরের হাওয়ারি’। হযরত ঈসার (সা) সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ কয়েক জন সঙ্গীকে বলা হত হাওয়ারি।

সময়সাপেক্ষে যদিও ভারত উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় কাশ্মীর ফার্সি ভাষার প্রচলন হয়েছিল অনেক দেরিতে কিন্তু তা সত্ত্বেও এ অঞ্চলের ফার্সি-ভাষী কবি ও লেখকদের সংখ্যা ভারত উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি।

প্রখ্যাত ইরানি মনীষী, কবি ও আরেফ সাইয়্যেদ আলী হামাদানি ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য কাশ্মির অঞ্চলে গড়ে তুলেছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান। এখানে ধর্ম-প্রচারক এবং ওয়াজকারীদেরকে প্রশিক্ষণ দেয়া হত। এরপর তাদেরকে পাঠানো হত বিভিন্ন অঞ্চলের জনগণের কাছে যাতে তারা পবিত্র কুরআন ও বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা)’র পবিত্র আহলে বাইতের শিক্ষার  সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন।

জম্মু ও কাশ্মির অঞ্চলে সাইয়্যেদ আলী হামাদানির সেবামূলক তৎপরতাসহ নানা ধরনের অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং মূল্যবান। এ অঞ্চলের প্রথম ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তথা মাদ্রাসা গড়ে তুলেছিলেন তিনি। মীর সাইয়্যেদ আলী হামেদানির পরামর্শে এ অঞ্চলে পবিত্র কুরআন শিক্ষার একটি বিশেষ প্রতিষ্ঠান তথা মাদ্রাসা গড়ে তোলেন সুলতান শাহাবুদ্দিন। কাশ্মিরের নানা অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিতেন। হামাদানির সবচেয়ে ভালো ছাত্র ও তার হাতে গড়ে ওঠা চিন্তাবিদ বা আলেমরা প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন এই মাদ্রাসায়।

সাইয়্যেদ মীর হামেদানি কাশ্মিরে গড়ে তুলেছিলেন একটি লাইব্রেরি। এই লাইব্রেরিতে ছিল ইসলামী নানা জ্ঞানের উৎস-বিষয়ক আরবি ও ফার্সি ভাষায় লেখা অনেক বই। বড় বড় পণ্ডিত ও শাসকরা এ লাইব্রেরি ব্যবহার করতেন। সাইয়্যেদ হামেদানির লেখা অনেক ফার্সি কবিতা ও গজলের অংশ বিশেষ উৎকীর্ণ করা হয়েছিল কাশ্মিরের নানা মসজিদ ও মাদ্রাসায়। এসবই ভারত উপমহাদেশে  এই মহান সাইয়্যেদের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের সাক্ষ্য বহন করছে। আমরা আগেই বলেছিলাম যে হামেদানির লেখা বইয়ের সংখ্যা ১১০টিরও বেশি। সাহিত্য, নৈতিকতা, দর্শন, ইরফান ও ইসলামী নানা জ্ঞান তুলে ধরা হয়েছে এসব বইয়ে।

তার ইন্তেকালের পর তার পুত্র মীর মোহাম্মদ হামাদানি পরবর্তী ২২ বছর পিতার মতোই ইসলাম প্রচারে ভূমিকা রাখেন। কাশ্মীরে ইসলাম ও আধ্যাত্মিকতা হযরত বুলবুল শাহ কলন্দর ও সাইয়েদ আলী হামাদানিকে বাদ রেখে কল্পনাও করা যায় না।

কিছুবলারথাকলে

যোগাযোগকরুন