সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী হতে হবে মুসলিম নারীকে

dreamstime_xs_56529246
Tawakal kerana Allah SWT © Eldar Nurkovic | Dreamstime.com

সমাজের মানুষের প্রতি সবার অনেক দায়িত্ব ও কর্তব্য থাকে। নারীরাও এর ব্যতিক্রম না। একজন মুসলিম নারীর সামাজিক দায়িত্ব ও কর্তব্য অনেক।
সভ্যতার শুরু থেকে সকল উন্নয়ন ও অগ্রগতির অংশীদার হিসেবে সৃজনশীল ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে পুরুষের পাশাপাশি নারী সমাজ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছে। কিন্তু ক্ষেত্র বিশেষ তাদের অধিকার স্বীকৃত নয়। বিষয়টি অবশ্যই বেদনাদায়ক।

এ চিত্র শুধু বাংলাদেশেই নয়, পৃথিবীর সর্বত্র দৃশ্যমান। বিদ্যমান অবস্থায় রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে সত্য, কিন্তু তা কাক্ষিত মাত্রার অনেক নিচে অবস্থান করছে। শুধু তাই নয়, নারী নির্যাতন ও বঞ্চনাও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা সম্ভব হয়নি। দেশের নারী সমাজ এখনও নানা ধরনের পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় নির্যাতন ও বঞ্চনার শিকার।

নারী সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে কারিমে আল্লাহতায়ালা বলেন, তোমরা (পুরুষরা) তাদের (নারীদের) ভূষণ, তারাও তোমাদের ভূষণ। আল্লাহতায়ালা কি চমৎকার উপমাই না তুলে ধরেছেন; যা ভাবলে অবাক ও বিস্মিত হতে হয়। আমরা জানি, পোশাক ছাড়া যেমন নারী কিংবা পুরুষ কেউ উলঙ্গ হয়ে চলতে পারে না। অবশ্যই তার পোশাক চাই। তেমনি আল্লাহতায়ালা পুরুষকে বলেছেন নারীর পোশাক আর নারীকে বলেছেন পুরুষের পোশাক অর্থাৎ পুরুষ ছাড়া নারীর চলবে না আর নারী ছাড়াও পুরুষের চলবে না। এ আয়াত অকাট্যভাবেই প্রমাণ করে দেয় যে, পুরুষ-নারী একে অপরের সহায়ক, পরিপূরক এবং একে অন্যের ওপর নির্ভরশীলও বটে।

এ ছাড়াও আল্লাহতায়ারা পবিত্র কোরআনে কারিমে পুরুষদের লক্ষ্য করে বলেন, ‘তোমরা নারীদের সঙ্গে উত্তম ব্যবহার কর, কেন না তারা তোমাদের মা, বোন, স্ত্রী ও কন্যা।’
নারীরা এই সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারা শুধু নিজেকে নিয়ে ভাববে না, তাদের সমাজ নিয়েও ভাবতে হয়। সে জন্য ইসলামী সমাজের স্বার্থকে ব্যক্তিস্বার্থের উপরে স্থান দিতে হবে। প্রত্যেক সমাজেই ধনী-গরিব-ফকির-মিসকিন, এতিম-অসহায় বসবাস করে। তারা সবাই মুসলিম সমাজের সদস্য। তাই সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য মুসলমান সমাজের সবাইকে সবার প্রতি খেয়াল রাখতে হবে।
কোরআনে কারিমে মুসলমানদের পরস্পরের ভাই বলে অভিহিত করা হয়েছে। সেজন্য সমাজে যারা অসহায়-বঞ্চিত জনগোষ্ঠী, এতিম-মিসকিন, তাদের পুনর্বাসন, তাদের দায়িত্ব গ্রহণ, তাদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার ব্যাপারে সামর্থ্যবানদের গুরুত্বপূর্ণ করণীয় রয়েছে। এটি আল্লাহ প্রদত্ত দায়িত্ব বিশেষ। এ দায়িত্বকে অবহেলা করার কোন সুযোগ নেই।

দোজখের আগুন থেকে বাঁচার জন্যই সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতি অবশ্য যত্নবান হতে হবে, সতর্ক থাকতে হবে সামাজিক দায়বদ্ধতা যেন আমাদের কোনরকম আচরণে ক্ষুণ্ন না হয়। প্রতিটি মানুষকে তাই সর্বোত্তম আচরণের মাধ্যমে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখার প্রয়াস চালাতেই হবে। হযরত রাসূলে আকরাম (সাঃ) বলেছেন, “সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে” (মিশকাত শরীফ)। হাদীসে আরো পাই “সেই ব্যক্তি মু’মিন হতে পারে না, যে ব্যক্তি নিজে পেট ভরে পানাহার করে, কিন্তু তার পার্শ্বেই প্রতিবেশী খাদ্যের অভাবে অভুক্ত থাকে।” (মিশকাত-বায়হানী)। তাই নবী করীম (সাঃ) -এর পরামর্শমতো চলতে হবে।

‘মানবতার সেবায় যিনি নিজের জীবন নিঃশেষে বিলিয়ে দিতে পারেন, তিনিই মহামানব। যার থেকে প্রতিবেশীর ক্ষতির কোন আশঙ্কা নেই তিনি উত্তম একজন মানুষ, ঈমানদার একজন মানুষ।’ হাদীসের এসব বাণীতে সামাজিকতার প্রতি কতটা গুরত্ব দেয়া হয়েছে তা উপলব্ধি করতে কষ্ট হয় না। এও বলা হয়েছে, ‘রোগীর সেবা ও শুশ্রূষাকারী নিজ গৃহে ফিরে না আসা পর্যন্ত বেহেস্তের পথে চলতে থাকে’। মানবতার অনুরূপ সেবা সামাজিক দায়বদ্ধতার উজ্জ্বলতম উলেস্নখযোগ্য দৃষ্টান্ত। স্বজনত্যাগীর পরিবারে আল্লাহর রহমত অবতীর্ণ হয় না। তাইতো হাদীসে এসেছে -“সকল মুসলমান (সম্মিলিতভাবে) যেন একটি প্রাচীর, যার প্রতিটি অংশ বাকি অংশগুলোকে দৃঢ় করে। এমনিভাবে তারা নিশ্চয়ই প্রতিষ্ঠিত হবে একে অন্যের সহায়তায়”।

পবিত্র মাহে রমজান মাস এসেছে, যার মাধ্যমে এতিম-দুঃখীদের সেবা করার পথ প্রশস্ত হয়। এটা সওয়াবের কারণে হোক বা ক্ষুধা-তৃষ্ণার যে তীব্র ও অসহ্য জ্বালা অনুভব করি, সে কারণে হোক।
আর ক’দিন পরই আসছে আনন্দের ঈদ। সবাই সবার সন্তানদের জন্য, নিজেদের জন্য, পরিবারের সবার জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী কত কিছুই না কিনবেন। কিন্তু যে সন্তানটি বাবাকে হারিয়েছে কিংবা হারিয়েছে মা অথবা অভিভাবককে, তার জন্য কে কিনবে নতুন জামা? কে তার মুখে তুলে দেবে সামান্য মিষ্টান্ন? তাই এ রমজান মাসে তাদের কথা খেয়াল রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, এতিম শিশুরা যে কেবল খেতেই চায়, তা নয়। তারা আপনার শিশুসন্তানের মতো হেসে-খেলে বেড়াতে চায়, আনন্দ করতে চায়, পিতা-মাতার স্নেহের পরশ পেতে চায়, দ্বিধাহীন ভালোবাসা চায়। একটি এতিম শিশুকে তার এসব চাহিদা মেটানোর জন্য আপনার-আমার খুব একটা অর্থকড়ি খরচ করার প্রয়োজন নেই, কেবল মনের ইচ্ছাটুকুই যথেষ্ট। আর সে ইচ্ছা ও আগ্রহ যদি এ রমজানেও না জন্মায়, তাহলে রমজান আমাদের মধ্যে কী প্রভাব বিস্তার করল, সে প্রশ্ন থেকেই যায়! তাই আসুন, এ রমজানে কিছুটা হলেও সামাজিক দায় পরিশোধ করি। নিজেদের আল্লাহর পছন্দনীয় মানুষের কাতারে দাড় করাই।