সামান্য হলেও, বৈধ উপার্জনই শ্রেষ্ঠ

অর্থ-সম্পদ আল্লাহতালার অনেক বড় নিয়ামত। এই নিয়ামত অর্জন করার জন্য আমরা বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে থাকি। বর্তমান আধুনিক পৃথিবীতে উপার্জনের বিভিন্ন ধরনের নতুন নতুন কর্মক্ষেত্রের সৃষ্টি হয়েছে। তবে আমাদের মনে রাখা উচিত উপার্জনের মাধ্যম সেটিই শ্রেষ্ঠ, বা শ্রেষ্ঠ উপার্জন যা বৈধ বা হালাল।

উপার্জন একটি বাস্তব এবং খুবই প্রয়োজনীয় বিষয়। জীবনের চাহিদা পূরণ করার ক্ষেত্রে উপার্জন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উপার্জনের উপর নির্ভর করে মানুষ তার আয়-ব্যয়, অর্থ-সম্পদ অর্জিত করে। কিন্তু বর্তমানে আগ্রাসী বিপণন, উদাসীনতা ও আরো বিভিন্ন কারণে বৈধ এবং অবৈধ উপার্জন নিয়ে আমাদের চিন্তার জগত বদলে গেছে। বর্তমানে আমরা অধিক পরিমাণ উপার্জনকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকি, সেটা হোক বৈধ অথবা অবৈধ পথে।

কিন্তু ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান হল হালাল উপার্জন করা ও হারাম উপার্জন থেকে নিজেকে বিরত রাখা। পবিত্র কোরআন ও হাদিসের বিভিন্ন স্থানে এই বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। একটি বিষয় আমাদের জেনে রাখা উচিত ইসলামে হালাল উপার্জনের যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, এটি শুধুমাত্র আখেরাতের জন্য নয়। এটি দুনিয়ার কল্যাণের জন্যও বলা হয়েছে।

পবিত্র কোরআনে অন্তত ৫ জায়গায় হালাল গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।

১. ‘হে মানবজাতি, পৃথিবীতে যা কিছু বৈধ ও পবিত্র খাদ্যবস্তু রয়েছে, তা থেকে তোমরা আহার করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্র।’ (সূরা বাকারা : ১৬৮)।

২. ‘হে মোমিনরা, আমি তোমাদের জীবিকারূপে যে উৎকৃষ্ট ও হালাল বস্তুগুলো দিয়েছি, তা থেকে (যা ইচ্ছা) খাও এবং আল্লাহর শোকর আদায় কর, যদি সত্যিই তোমরা শুধু তাঁরই ইবাদত করে থাক।’ (সূরা বাকারা : ১৭২)।

আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন ‘আল্লাহপাক এ আয়াতে আদেশসূচক শব্দে তাঁর বান্দাদের হালাল গ্রহণ করতে আদেশ করেছেন। এরপর শুকরিয়া আদায় করতেও আদেশ করেছেন। যদি তারা সত্যিই তাঁর বান্দা হয়ে থাকে।’

৩. ‘আল্লাহ তোমাদের হালাল ও পবিত্র যা কিছু দিয়েছেন, তা থেকে তোমরা আহার করো এবং আল্লাহর অনুগ্রহের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, যদি তোমরা শুধু তাঁরই ইবাদত করে থাক।’ (সূরা নাহল : ১১৪)।

৪. ‘তোমাদের যা দান করেছি, তা থেকে ভালো ও হালাল বস্তু আহার করো এবং এ বিষয়ে সীমালঙ্ঘন করো না। করলে তোমাদের ওপর আমার ক্রোধ অবধারিত এবং যার ওপর আমার ক্রোধ অবধারিত, সে তো ধ্বংস হয়ে যায়।’ (সূরা ত্বহা : ৮১)।

৫. ‘হে রাসুলগণ, তোমরা উত্তম ও হালাল বস্তু আহার করো ও নেক আমল করো, নিশ্চয়ই আমি তোমাদের আমল সম্পর্কে সম্যক অবহিত।’ (সূরা আল মোমিনুন : ৫১)।

এছাড়াও হাদীসেও হালাল গ্রহণের প্রতি অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। হজরত আনাস বিন মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন ‘হালাল রুজি সন্ধান করা প্রত্যেক মুসলিমের ওপর অপরিহার্য কর্তব্য।’ (মাজমাউয যাওয়ায়েদ : ১৮০৯৯)।

নবীজি এমন এক ব্যক্তির কথা আলোচনা করলেন, যে মরুভূমিতে দীর্ঘ সফর করেছে। যার চুলগুলো এলোমেলো। ধুলায় ধূসরিত। এ অবস্থায় সে আকাশের দিকে দুই হাত তুলে দোয়া করে বলে, ‘হে আমার প্রতিপালক! হে আমার প্রতিপালক!’ অথচ তার খাদ্য হারাম। পানীয় হারাম। পোশাক-পরিচ্ছদ হারাম। তার শরীর বেড়ে উঠেছে হারাম দ্বারা। অতএব তার দোয়া কীভাবে কবুল করা হবে!’ (মুসলিম : ১০১৫)।

সুতরাং আমরা বুঝতে পারছি হালাল বা বৈধ উপার্জন একজন মুসলমানের জন্য অত্যন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কেয়ামতের দিন যে পাঁচটি প্রশ্ন করা হবে সেখানেও বৈধ উপার্জন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

১. তার জীবনকাল কিভাবে অতিবাহিত করেছে,

২. যৌবনের সময়টা কিভাবে ব্যয় করেছে,

৩. ধন সম্পদ কিভাবে উপার্জন করেছে,

৪. তা কিভাবে ব্যয় করেছে,

৫. যে দ্বীনের যতটুকু জ্ঞান অর্জন করেছে সেই অনুযায়ী আমল করেছে কিনা।

আবার ইবাদত কবুল হওয়ার পূর্বশর্ত হচ্ছে বৈধ বা হালাল উপার্জন। হালাল উপার্জন জীবনের এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন। কারণ জান্নাত লাভের যে কয়েকটি উপায় রয়েছে তার একটি হচ্ছে হালাল উপার্জন ।

পরিশেষে আমরা এটা নির্দ্বিধায় বলতে পারি যে, হালাল বা বৈধ উপার্জন হচ্ছে জীবনের সাথে ঈমানের সাথে আখেরাতের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি বিষয়। তাই আমাদের উচিত, কম হোক বা বেশি সবসময় বৈধ বা হালাল উপার্জনের পথে থাকা।

আল্লাহতালা আমাদের হালাল উপার্জন করা এবং হারাম উপার্জন থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দিন।