সামিয়া সুলুহু হাসান: তানজানিয়ার প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট

আফ্রিকা ১২ এপ্রিল ২০২১ Contributor
সামিয়া সুলুহু হাসান

সামিয়া সুলুহু হাসান যখন রাষ্ট্রপতি হওয়ার শপথ নিচ্ছিলেন, তখন কি তাঁর মনে পড়ছিল নারী হয়েও রাজনীতিতে আসার পথের লড়াইগুলোর কথা? কিন্তু ইসলামে নারীর উন্নতির যে যে উপায় বলে দেওয়া আছে, তা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছিলেন তিনি। তাই জন্যই আজ তানজানিয়ার বুকে প্রথম মুসলমান নারী প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন এই মহীয়সী।

সম্প্রতি তানজানিয়ার পূর্বতন রাষ্ট্রপতি জন মাগুফুলির আকস্মিক মৃত্যুর পরেই ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরাসরি নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিলেন সামিয়া। তিনি ২০২৫ সাল পর্যন্ত পূর্বতন প্রেসিডেন্টের দ্বিতীয় মেয়াদের পাঁচ বছরের দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি তানজানিয়ার ষষ্ঠ প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বগ্রহণ করলেন।

সামিয়া সুলুহু হাসান ও তাঁর শিশুকাল

১৯৬০ সালের ২৭ জানুয়ারি জাঞ্জিবার সুলতানি সাম্রাজ্যের মাকুন্দুচি প্রদেশে। শিশুকাল থেকেই পড়াশুনো ও মানুষের উন্নতির প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল অপরিসীম।

ইন্সটিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজমেন্ট থেকে গ্র্যাজুয়েশন করার পর তিনি জনপ্রশাসন সংক্রান্ত ডিপ্লোমা করেন। এরপর, ১৯৯২ থেকে ১৯৯৪-এর মধ্যে ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন সামিয়া। কিন্তু সেখানেই তাঁর পড়াশুনোর প্রতি আগ্রহ শেষ হয়ে যায়নি। ২০১৫ সালে, তানজানিয়া মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও সাদার্ন নিউ হ্যাম্পশায়ার ইউনিভার্সিটির যুগ্ম-কার্যক্রমে তিনি কমিউনিটি ইকোনমিক ডেভেলপমেন্টে পুনরায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।

রাজনীতি ও মানুষের কল্যাণে যোগ দেওয়া

শিশুকাল থেকেই সামিয়া জানতেন তিনি মানুষের জন্য কিছু করতে চান। এ কারণে, সেকেন্ডারি স্কুল শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগে ক্লার্ক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। সেখানেই প্রথম প্রশাসন ও রাজনীতির হাতেখড়ি হয় তাঁর। পরবর্তীতে, ইউনেস্কোর ওয়র্ল্ড ফুড প্রোগ্রামেও তিনি যোগ দিয়েছিলেন।

২০০০ সালে তাঁর সতীর্থদের উৎসাহে তিনি সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। তারপরে আর কখনোই ফিরে তাকাতে হয়নি। জাঞ্জিবারের হাউজ অফ রিপ্রেজেন্টেটিভে তিনি বিশেষ আসন অর্জন করেন। শুধু তাই নয়, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আমানই কারুমে তাঁকে মন্ত্রী হিসেবেও নির্বাচন করেন। জানা যায়, ক্যাবিনেটের একমাত্র মহিলা মন্ত্রী হওয়ার কারণে তাঁর পুরুষ সহকর্মীরা তাঁকে যথেচ্ছ অপারগ ভাবতেন। কিন্তু, একের পর এক কাজের মাধ্যমে তাঁদের এই ভুল ধারণার অবসান ঘটান সামিয়া।

সেই শুরু… তারপর একের পর এক রাজনৈতিক বেড়াজাল কাটিয়ে ২০১৫ সালে পূর্বতন রাষ্ট্রপতি জন মাগুফুলি তাঁকে রানিং মেট হিসেবে বেছে নেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন সামিয়া। মাগুফুলির হাত ধরে দেশের মানুষের জন্য একের পর এক উন্নয়ণের পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তিনি। ২০২০ সালে, তানজানিয়ার মানুষ পুনরায় তাঁকে নির্বাচন করেন।

সামিয়া সুলুহু হাসানঃ তানজানিয়ার “মামা সামিয়া”

মৃদুভাষী সামিয়ার ব্যক্তিগত জীবন একেবারেই জানা যায় না। তিনি বরাবরই প্রচারমাধ্যমের আলোর বাইরে থাকতে পছন্দ করেন। ইথিওপিয়ার প্রেসিডেন্ট সাহলে-ওয়ার্ক জেউদের পর তিনিই দ্বিতীয় কোনো নারী যিনি বর্তমানে আফ্রিকার কোনো দেশের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সাহলে-ওয়ার্ক জেউদের দায়িত্ব মূলত আনুষ্ঠানিক, সুতরাং সামিয়াকে প্রথম বললেও খুব একটা ভুল হয় না। ৬১ বছর বয়সী এই প্রেসিডেন্টকে তানজানিয়ার বাসিন্দারা ভালবেসে ডাকেন “মামা সামিয়া” বা মা সামিয়া বলে। আর তাঁরা যে খুব একটা ভুল বলে না তাঁর প্রমাণ পাওয়া যায় সামিয়ার কোমল ব্যবহারে।

রাজধানী দারুস সালামে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের দিন সামিয়ার বক্তৃতায় ছিল মাগুফুলির প্রতি শ্রদ্ধা ও তাঁর মৃত্যুর জন্য শোক প্রকাশ। তিনি খুব অল্প কথায় জানিয়েছিলেন, সেদিন তিনি যে শপথ নিচ্ছেন তা তাঁর জীবনের বাকি শপথের থেকে ভিন্ন। জীবনের অন্য শপথগুলি তিনি আনন্দের সঙ্গে নিয়েছিলেন। কিন্তু এই শপথের আড়ালে রয়েছে শোকোচ্ছ্বাস।

এরকম অনুভূতির প্রকাশ থেকেই বোঝা যায় তানজানিয়ার মানুষেরা তাঁদের ‘মামা সামিয়া’ অর্থাৎ সামিয়া সুলুহু হাসানের নির্বাচনে খুব একটা ভুল সিদ্ধান্ত নেয়নি।