সিন্থেটিকের দাপটে অস্তিত্ব সঙ্কটে মরক্কোর হাতে-বোনা প্রাকৃতিক মাদুর হাসিরা

morrocco mat

কয়েক শতাব্দী ধরে, মরক্কোর শিল্প বহু সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে বিকশিত হয়েছে। নতুন এই কেন্দ্রগুলি মূলত ঐতিহাসিক রাজধানীকে কেন্দ্র করে বিবর্তিত হয়েছে যেমন, ফেজ, মেকনেস, সালে এবং মাররাকেশ। এই শিল্পগুলির মধ্যে অবশ্যই উল্লেখ্য বাস্কেট বুনন, মৃৎশিল্প, বস্ত্রশিল্প এবং চর্মশিল্প। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলা এই ঐতিহ্যগুলি ধীরে ধীরে পর্যটকদের সামনে নিজেদের তুলে ধরছে, যাতে গোটা বিশ্ব জানতে পারেন এই শিল্প সম্পর্কে। যাতে পর্যটকরা উঁকি দিতে পারেন তাঁদের কর্মশালায়, যেখানে এই শিল্প তিলে তিলে গড়ে তোলা হয়।

কোন সমস্যায় ভুগছে ঐতিহ্যবাহী শিল্প

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, শিল্পীরা উত্তরাধিকার সূত্রে এই শিল্পের পরম্পরা বজায় রেখেছেন। এই শিল্পের টানেই শিল্পী পরিবারের তরুণরা নিজেদের বয়স্কদের কাছ থেকে পাঠ নিতে শুরু করেন। তবে এমনও দেখা গিয়েছে, উপযুক্ত উত্তরাধিকারের অভাবে কর্মশালা বন্ধ হয়ে গিয়েছে, বা বন্ধের মুখে। 

শুধুই উত্তরাধিকারীর সমস্যা নয়, আরও একটি যে সমস্যার মুখে এই শিল্প দাঁড়িয়ে রয়েছে তা হল পৃষ্ঠপোষকতা। এই শিল্পগুলির বৈশিষ্ট্যই হল- হাতের নিখুঁত কাজ, যা সময়সাপেক্ষ। হাতের কাজের জন্য এই শিল্পকীর্তিগুলির দামও হয় উপযুক্ত। কিন্তু বর্তমানে অনেক কম দামে পাওয়া যায় মেশিনে তৈরি জিনিস। একে বলা হয়, মেড-ইন চায়না সিনড্রোম। প্রাকৃতিক রংয়ের পরিবর্তে এই সস্তার জিনিসগুলিতে ব্যবহার করা হয় সিন্থেটিক রং, চামড়া বা কাঠির পরিবর্তে ব্যবহার করা হয় প্লাস্টিক, সিল্ক এবং কটনের মতো দামি ও আরামদায়ক কাপড়ের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয় নাইলন ও পলিয়েস্টার।

হাসিরার ব্যবহার

মরক্কোতে হাসিরার ব্যবহার বহু প্রাচীন আমল থেকে প্রচলিত। মাঘরেবি মসজিদগুলির মেঝে, দেওয়াল ও স্তম্ভগুলি ঢাকা থাকে এই হাসিরা দিয়ে। হাতের ঠাসা বুননে সমৃদ্ধ হাসিরাগুলি থেকে বেরোয় খুব মৃদু সুগন্ধ। হাসিরা ব্যবহার করে মেঝে, দেওয়াল ঢেকে রাখার অন্যতম কারণ হল সৌন্দর্যায়নের পাশাপাশি সেগুলিকে ধুলোবালির হাত থেকে রক্ষা করা। 

সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি করা হাসিরাগুলি এমন পদ্ধতিতে তৈরি করা হয়, যাতে ধুলো এই মাদুরের উপরে জমা হওয়ার পরিবর্তে তার নীচে জমা হয়। ফলে হালকা ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে নিলেই এটি পরিষ্কার হয়ে যায়। তাজা প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি করার ফলে এতে খুব মৃদু সুগন্ধ থাকে, যা ঘরে আলাদা মাত্রা যোগ করে। এই মাদুরগুলির নকশা করার জন্য যে রং ব্যবহার করা হয়, তা-ও প্রাকৃতিক। বিভিন্ন রকমের নকশাযুক্ত হাসিরা পাওয়া যায়। মূলত কাজের ঘনত্বের উপরে নির্ভর করেই এই মাদুরগুলির দামে হেরফের হয়। নরম হাসিরায় বসে নামাজ পড়ার আলাদা আরাম রয়েছে।   

মূলত গরম আবহাওয়ার কথা ভেবেই হাসিরা তৈরি করা হয়। শীতকালে এই হাসিরার উপরে পেতে দেওয়া হয় উলের কার্পেট। তখন এর উপরে বসে আরও বেশি আরাম পাওয়া যায়।   

পঞ্চদশ শতকে শিল্পীদের হাতে তৈরি এই আট শতক পুরোনো শিল্পকীর্তির কিছু নিদর্শন অভিযাত্রীদের হাত ধরে পৌঁছেছিল দক্ষিণ আফ্রিকাতে। অনেকে মনে করেন, হাসিরার জন্ম দক্ষিণ স্পেনে। কারণ এর সাথে স্পেনের প্রাচীন আমলের মাদুর-বুনন শিল্পের বেশ কিছু মিল পাওয়া যায়। তবে সেই বিতর্ক এখানে আলোচনার মূল বিষয় নয়।

বেড়ে চলা সিন্থেটিকের দাপট 

বর্তমানে হাসিরার মতো হাতে তৈরি মাদুরকেও প্রতিস্থাপিত করেছে নিম্ন মানের সিন্থেটিক কার্পেট। হুবহু এক ধরনের নকশা-যুক্ত এই সিন্থেটিক হাসিরার দাম অনেক কম। ফলে অনেকেই হাতে তৈরি দামি ও ভালো মানের হাসিরার বদলে কম দামি দেওয়াল-জোড়া হাসিরা কিনতেই পছন্দ করছেন। বহু মসজিদেও হাসিরার পরিবর্তে ঠাঁই পেয়েছে এই সিন্থেটিক মাদুর।

যাঁরা এই সিন্থেটিক হাসিরা মোড়া মসজিদে নামাজ পড়েছেন তাঁরা জানেন এর গন্ধ কী ভীষণ অস্বস্তিকর। তাছাড়া হাতে বোনা হাসিরার কোমল ও নরম ভাবও এই নকল হাসিরায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। তবুও দেখা গিয়েছে, উনবিংশ শতকের শেষ ভাগ থেকেই টিউনিসিয়া থেকে শুরু করে মরক্কোর বহু মসজিদের মেঝে মুড়ে দেওয়া হয়েছে এই সিন্থেটিক হাসিরায়। সাধারণ মানুষজনও নিজেদের বাড়ির জন্য বেছে নিচ্ছেন এই কম দামি জিনিস। 

একটা সময় ভীষণ চাহিদা থাকলেও বর্তমানে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই করতে হচ্ছে হাসিরা শিল্প ও শিল্পীদের। ফলে বহু শিল্পী এই কাজও বন্ধ করে দিয়েছেন। যেমন, সালে শহরে আগে ১৪৬ জন শিল্পী হাসিরা তৈরির কাজ করতেন, কিন্তু এখন সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২ জনে।

সালে শহরের ১০০ বছর বা তার চেয়েও বেশি পুরোনো বহু দোকান, যেগুলি হাসিরা বিক্রির জন্য প্রসিদ্ধ ছিল, আজ তাদের ক্রেতার অভাব চোখে পড়ার মতো। বংশপরম্পরায় ভালো মানের হাসিরা বিক্রি করে আসা এই প্রসিদ্ধ দোকানগুলি সিন্থেটিক হাসিরা বিক্রির বিরোধী। কিন্তু নকল হাসিরার দাপটে তাদের ব্যবসাও বন্ধের মুখে।

  

morocco hand made carpet