সিন্ধু বিজয়ের সেনাপতির করুণ পরিণতি

dreamstime_s_126863348

দ্বিতীয় পর্ব

আগের পর্বে আমরা পড়েছি কীভাবে হাজাজ বিন ইউসুফ শাকাফি এবং সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাশিমের নেতৃত্বে সিন্ধু জয় করে উম্মাইয়া বংশ। এই পর্বে সিন্ধু জয়ের পরবর্তীকালে দোর্দন্ডপ্রতাপ সামরিক নেতার পরিণতি নিয়ে আলোচনা করা হবে।  

সিন্ধু বিজয়ের অন্যতম প্রভাব ছিল ভারতবর্ষের প্রাচীন বৈদিক সভ্যতার সঙ্গে ইসলামের পরিচয় হওয়া। পরবর্তীকালে বহু মুসলমান পণ্ডিত , শিক্ষক ও ছাত্র অঙ্ক, জ্যোতির্বিজ্ঞান, লৌহশিল্প প্রভৃতি বিষয়ে বৈদিক সভ্যতা থেকে শিক্ষা আহরণ করেন। তবে ইসলাম পণ্ডিতরা যত না পশ্চিমের থেকে আদানপ্রদান করতে আগ্রহী হয়েছেন তত ভারতবর্ষ থেকে হননি। এর ফলে ইসলাম থেকে সমস্ত জ্ঞান পশ্চিমে গিয়ছে, অপরাপর ভারতবর্ষ থেকে কিন্তু ইসলাম অনেক কিছু শিখেছে।

সিন্ধু বিজয়ের প্রথম ভাগের পর উম্মায়দ সাম্রাজ্য আরও বিস্তারলাভ করে এবং চীনদেশে পৌঁছয়। সেখানে মুসলমানরা অনেক কিছু শেখে। রেশম শিল্প, রেশম বয়ন শিল্প, পোর্সিলিন শিল্প, কাগজ শিল্প, আর বারুদ শিল্পের ব্যাপারে। স্বয়ং প্রিয় নবী (সা.) বলেছেন, জ্ঞানার্জনের জন্য সুদূর চীন দেশে যাও। (তাবরানি)। বর্তমানে যা পাকিস্তান তা প্রাচীন কালে পিরিনিজ থেকে সিন্ধুনদ থেকে গোবি মরুভূমি পর্যন্ত ইসলাম সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল। মুসলমানরা পারস্য, গ্রিস, ভারত ও চীনদেশ থেকে যা যা জ্ঞান অর্জন করেছিল সবকিছু দিয়ে এই সাম্রাজ্য বানিয়েছিল। এই সাম্রাজ্যে মুহাম্মদ বিন কাশিমের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। তিনি নিজের সবটুকু দিয়ে এই যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। 

সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাশিম অবশ্য এখানেই থেমে যেতে চাননি। উত্তর ও পূর্ব পাঞ্জাবেও তিনি অভিযান চালাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সুদূর দামাস্কাসে ৭১৩ সনে খলিফা প্রথম ওয়ালিদের মৃত্যু হয়। রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য কাশিমকে ইরাকে ফিরে যেতে হয়। ঠিক যেভাবে মুসা বিন নুসায়েরকেও স্পেন থেকে ফিরে আসতে হয়। 

খলিফা প্রথম ওয়ালিদ-এর মৃত্যুর পর রাজনৈতিক অস্থিরতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় মুহাম্মদ বিন কাশিমের। তিনি হাজাজ বিন ইউসুফের ভাইপো ছিলেন, যাকে সকলে নিষ্ঠুর হাজাজ বলত। শুধু তাই নয়, কাশিম হাজাজের মেয়ে জুবায়েদাকে বিবাহও করেন। হাজাজই কাশিমকে নিজের ছেলের মতো বড় করে তোলেন। অস্ত্রশিক্ষা, বিদ্যা শিক্ষা সবই দেন। কিন্তু হাজাজ ঘরে এক ও বাইরে এক মানুষ ছিলেন।  ইরাকের প্রশাসক হিসাবে নিষ্ঠুরতার কোনও অন্ত রাখেননি তিনি। কেবল্মাত্র অপরাধীরা নয়, সাধারণ মানুষও তাকে যমের মতো ভয় করত। অনেক সময় খলিফার সিদ্ধান্ত পালন না করে তিনি নিজের মতো সিদ্ধান্ত নিতেন ও শাসনকাজ চালাতেন। এই নিয়ে খলিফার সভায় অসন্তোষ ছিল। ওয়ালিদের মৃত্যুর পর খলিফা হন সুলাইমান। হাজাজ বিন ও সুলাইমানের মধ্যে শত্রুতা ছিল। কিন্তু ততদিনে হাজাজের মৃত্যু হওয়ায় সুলাইমান প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য হাজাজের আত্মীয়দের বেছে নেন। অত্যাচার শুরু হয়, বড় বড় পদ থেকে হাজাজের আত্মীয়দের বরখাস্ত করা হয়। কাশিমকেও সেই একই কারণে ইরাকে ফিরিয়ে আনা হয়। এদিকে, ইরাকের নতুন প্রশাসক সালেহ বিন আবদুর রহমান হাজাজকে অসম্ভব অপছন্দ করতেন। হাজাজ সালেহের ভাইকে নির্মম মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন। তিনিও হাজাজের মৃত্যুর পর হাজাজের আত্মীয়দের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে শুরু করেন। প্রতিশোধ নিতেই কাশিমকে বন্দি করা হয়। বন্দিদশায় তাকে অত্যাচার করে অন্ধ করে দেওয়া হয়, তারপর অত্যাচারেই তার মৃত্যু হয়। এইভাবেই অষ্টম শতকের একজন মুসলমান সেনাপতির অন্তিম পরিণতি হয়। 

(চলবে)