সিল্ক রোড-এর ধারে গড়ে ওঠা পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ শহর

মধ্য প্রাচ্য ০৬ মার্চ ২০২১ Contributor
ফিচার
সিল্ক রোড
Sultan Sandjar mosque at ancient Merv historical sites. Merv area is one of the main sightseeting in Turkmenistan, Central Asia, situated on the road of the ancient Grest Silk Way. © Milonk | Dreamstime.com

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মধ্যে পণ্য পরিবহণ থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান সমস্ত ক্ষেত্রে, বিভিন্ন বাণিজ্য পথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, ইতিহাসে তার বহু প্রমাণ রয়েছে। ঐতিহাসিক সিল্ক রোড ছিল স্থল ও জলপথে চিনের সাথে বিভিন্ন এশীয় ও ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলির বাণিজ্য পথের নেটওয়ার্ক। এর দ্বারা বিভিন্ন সভ্যতা, বিভিন্ন সংস্কৃতি, ধর্ম এবং ভাষার মানুষ পরস্পরের সান্নিধ্যে এসেছেন, নিজেদের মধ্যে ভাব-বিনিময় করেছেন। যার ফলে বিভিন্ন দেশের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছে।

সিল্ক রোড বরাবর, চিন, মধ্য এশিয়া, আরব, ভারত, পারস্য এবং আধুনিক তুরস্কের বহু শহর গড়ে উঠেছিল। বাণিজ্য এই শহরগুলিকে সম্পদ এবং সমৃদ্ধি প্রদান করেছিল, যার ফলে এখানকার প্রকাশনা, কাঁচ এবং কাগজ তৈরি, চিকিৎসা, দর্শন, জ্যোতির্বিদ্যা ও কৃষিবিদ্যার বিকাশ ঘটেছিল। ইতিহাস ও সভ্যতার অগ্রগতিতে এদের অবদান অনস্বীকার্য।

জেনে নেওয়া যাক এমনই কয়েকটি শহরের কথা:

১. শিয়ান

চতুর্থ শতাব্দী থেকে শুরু করে, একটি চীনা শহর শিয়ান ছিল চীনা সাম্রাজ্যের রাজধানী এবং ট্যাং বংশের শাসনকালে (৬১৮ থেকে ৯০৪ খ্রিস্টাব্দ) এই শহর উন্নতির শিখরে পৌঁছেছিল। শিয়ান সেই দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্রের পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ধর্মাবলম্বী মানুষদের ভাব আদানপ্রদানের কেন্দ্রস্থল ছিল। সিল্ক রোড এর প্রাচীন গৌরবের অংশ যে স্থানগুলি আজও রয়েছে সেগুলি হল- শিয়ান পশ্চিমী বাজার বা ওয়েস্টার্ন মার্কেট এবং গ্রেট মস্ক বা বড় মসজিদ।

২. সমরখন্দ

সিল্ক রোডের প্রান্তে অধুনা উজবেকিস্তানের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই শহরটি চীন এবং ভূমধ্যসাগীয় অঞ্চলের মাঝে অত্যন্ত কৌশলগত স্থানে অবস্থিত। মূলত শিল্প ও বিদ্যাচর্চার পীঠস্থান হিসেবে এই শহর বিখ্যাত ছিল। ঐতিহাসিক নথি থেকে জানা যায় যে, হান আমল (২০৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ২২০ খ্রিস্টাব্দ) থেকেই এই শহরের বণিকরা চীনের মতো দূরবর্তী দেশের সাথে দামি ধাতু, মশলা এবং কাপড়ের ব্যবসা করত। এই শহরের ঐতিহ্যপূর্ণ স্থানগুলি হল সেন্ট্রাল হাই স্ট্রিট, সমরখন্দের নিরীক্ষণ কেন্দ্র।

৩. আলেপ্পো

পূর্ব ভূমধ্যসাগরী অঞ্চল এবং ইউফ্রেটিস নদীর তীরে কৌশলগত অবস্থানের জেরে সিরিয়ার শহর আলেপ্পো খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক থেকেই বিভিন্ন বাণিজ্যপথের সাথে যুক্ত, এবং ঐতিব্যবাহী সিল্ক রোড-এর অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল এই শহর। আলেপ্পো হল পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন জনবসতিপূর্ণ শহর, যা বরাবরই বাণিজ্য এবং শিল্পের পীঠস্থান ছিল। ঐতিহাসিক শহর আলেপ্পোতে বেশ কিছু অসাধারণ মিনার ছিল যা এই শহরের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক উৎকর্ষের পরিচয় বহন করত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য এর সিটাডেল ও মসজিদ এবং আলেপ্পোর প্রখ্যাত বাজার।

৪. মোসুল

অধুনা ইরাকের একদা অত্যন্ত সমৃদ্ধ শহর মোসুল ছিল উত্তর ইরাকের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র, যাকে ভিত্তি করে দেশের বাণিজ্য, শিল্প এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। সেই সময় সিল্ক রোডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর ছিল মোসুল। দশম শতাব্দীর মুসলিম ভৌগলিক আল-মুকাদ্দাসীর লেখনিতে এই শহরের উল্লেখ পাওয়া যায়।

আব্বাসীয় মুসলিম সাম্রাজ্যের অধীনে, মোসুল সিল্ক রোডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। এখানকারী শিল্পীদের হাতের সূক্ষ্ম কাজের কদর ছিল বহু দেশে। এখানে নানা অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে শিল্প এবং সূক্ষ্ম বস্তু নির্মাণের কাজ হত। এখানকারই সূক্ষ্ম বস্ত্রের নাম ছিল মসলিন, যা সারা বিশ্বে বিখ্যাত ছিল।

এছাড়াও এখানকার সবচেয়ে এখানে প্রচলিত বাণিজ্য ছিল তেলের, কারণ এখানে প্রাচীন আমল থেকেই খনিজ তেল উত্তোলন করা হত। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র থেকে জানা যায় যে, মোসুল যাওয়ার পথে টাইগ্রিস নদীর পূর্ব প্রান্তে ইরাকের বেশ কয়েকটি তেলের খনি ছিল। বিভিন্ন মুসলিম ভৌগলিক ও পর্যটকের বয়ান থেকে জানা যায় যে, এই খনিগুলি থেকে প্রচুর পরিমাণে খনিজ তেল উত্তোলন করা এবং বিদেশে রপ্তানি করা হত।

৫. মার্ভ

মার্ভ হল মধ্য এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মরূদ্যান শহর, যা ছিল সিল্ক রোডের এক প্রান্তে, তুর্কমেনিস্তানের বর্তমানে মেরি অঞ্চলের কাছেই এর অবস্থান ছিল। ইসলাম-পূর্ববর্তী যুগে মার্ভ ছিল খোরাসান প্রদেশের রাজধানী। পরবর্তী কালে, দ্বাদশ শতাব্দীতে এই শহর বিশ্বের বৃহত্তম শহরে পরিণত হয়েছিল।

আব্বাসীয় শাসকদের অধীনে, মার্ভ পূর্বের রাজধানী ছিল। অষ্টম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত সময়কালে মার্ভ সবচেয়ে বেশি সমৃদ্ধ হয়েছিল। একাদশ শতাব্দী নাগাদ, মার্ভ পরিণত হয়েছিল একটি বিশাল বাণিজ্য কেন্দ্রে যেখানে হস্তশিল্পীদের জন্য দোকান, মুদ্রা বিনিময়কারী, কামার, বস্ত্রশিল্পী, ধাতুশিল্পী এবং কুমোরদের দোকান-সহ একটি বিশাল বাজার ছিল। এমন বাজার সেই সময় পৃথিবীর অন্য কোনও দেশে ছিল না। শুধু একটি উৎকৃষ্ট বাণিজ্য কেন্দ্রই নয়, মার্ভ ছিল তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রশাসনিক ও ধর্মীয় কেন্দ্র, যেখানে একাধিক মসজিদ এবং মাদ্রাসার অস্তিত্ব ছিল। এখানকার বস্ত্রশিল্প, বিশেষ করে মার্ভের সিল্ক অত্যন্ত বিখ্যাত ছিল।