SalamWebToday নিউজলেটার
Sign up to get weekly SalamWebToday articles!
আমরা দুঃখিত কোনো কারণে ত্রুটি দেখা গিয়েছে:
সম্মতি জানানোর অর্থ, আপনি Salamweb-এর শর্তাবলী এবং গোপনীয়তার নীতি মেনে নিচ্ছেন
নিউজলেটার শিল্প

সুগন্ধি তেলের প্রতি ফোঁটায় রয়েছে তিন হাজার বছরের পুরোনো ইতিহাস

স্বাস্থ্য ২২ জানু. ২০২১
মতামত
সুগন্ধি তেলের
© Sofiaworld | Dreamstime.com

অ্যারোমাথেরাপি আর সুগন্ধি তেলের প্রতি মানুষের নির্ভরতা ও আকর্ষণ ক্রমশ বাড়ছে। সারাদিন পরিশ্রমের পর অল্প গরম হলে একটু রোজ অয়েলই হোক, কিংবা রাতে শোয়ার আগে ক্রিমের সঙ্গে একটু ল্যাভেন্ডার অয়েল মিশিয়ে মেখে নেওয়াই হোক। এই প্রাকৃতিক নির্যাস থেকে তৈরি তেল যে আদতে ভীষণ উপকারী সে বিষয়ে নিন্দুকেরও বিশেষ সন্দেহ নেই। কিন্তু এটা কি জানা আছে যে এই তেলে ইতিহাস আদতে তিন সাড়ে তিন হাজার বছরের পুরনো?

ঐতিহাসিক ও গবেষকরা খুঁজে বার করেছেন যে আজ থেকে প্রায় সওয়া তিন হাজার বছর আগে মিশর, চীনদেশ ও ভারতের চিকিৎসক ও উদ্ভিদতাত্ত্বিকদের চিকিৎসার মূল উপাদান ছিল এই সুগন্ধি অত্যাবশ্যক তেল। সেই আমলের পুঁথি ও সাহিত্যে খোঁজ পাওয়া গিয়েছে এই ব্যবহারের। যদিও গবেষকদের ধারণা, সুগন্ধি তেলের ব্যবহার আদতে আরও প্রাচীন।

হিপোক্রেটাসের নাম সকলের কাছেই পরিচিত। পৃথিবীর প্রথম চিকিৎসক ধরা হয় তাঁকে, এমনকি তাঁর নাম অনুসারে বর্তমানে ডাক্তাররা ‘হিপোক্রেটিক ওথ’ নিয়ে চিকিৎসা জগতে পা রাখেন। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্দশ শতকে মিশর ও ভারত থেকে সুগন্ধি তেল আনিয়ে তিনি তাঁর রোগীদের চিকিৎসা শুরু করেছিলেন। কথিত আছে, প্রায় ৩০০ রকম সুগন্ধি তেল-এর ব্যবহার জানতেন তিনি।

সেখান থেকেই গ্রিকদের মধ্যে শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসার জন্য সুগন্ধি তেলের ব্যবহার শুরু হয়। পরবর্তীকালে, ডায়োস্করিডেস, যিনি মেটিরিয়া মেডিকা লেখার জন্য খ্যাত, সুগন্ধি তেল ও মশলার সুগন্ধের ব্যবহার শুরু করেন।

তাঁর থেকেই রোমানরা সুগন্ধি তেলের উপকারিতা সম্পর্কে অবগত হয়। সেখান থেকে ধীরে ধীরে বাইজান্টিয়াম ও আরব উপদ্বীপে সুগন্ধি তেলের ব্যবহারের পুন্ররায় সূচনা হয়। এ যেন এক অদ্ভুত সুগন্ধি চক্রাকার পথ।

সুগন্ধি তেলে রোমানদের ভূমিকা

রোমানরা গ্রিকদের থেকেও শৌখিন ছিল। গ্রিকরা শুধু চিকিৎসার জন্য সুগন্ধি তেল ও অ্যারোমাথেরাপির ব্যবহার করলেও রোমানরা শুধু তাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তারা তেল ও জলের মিশ্রণে স্নান, নিজেদের শরীরের সুগন্ধি হিসাবে সুগন্ধি তেলের মালিশ এমনকি ব্যথা বেদনার মালিশ হিসাবেও বিভিন্ন প্রাকৃতিক তেলের ব্যবহার করতে শুরু করে।

রোমানদের প্রিয় সুগন্ধি ছিল অলিবানু, আরবিতে যাকে বলা হত আল- লিবান। এটি আফ্রিকান বসওয়েলিয়া গাছ থেকে প্রাপ্ত একটি রজন। এই রজনকেই নানা পদ্ধতিতে তেল বানিয়ে রোমানদের জন্য নিয়ে আসত আরবিয় বণিকরা। এই জন্যই, অনেক রোমান সাহিত্যে, ভূমধ্যসাগর থেকে রোমে আসার পথকে ‘অলিবানুর রাস্তা’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে নিজেদের বিলাসিতাসহ রোমান সাম্রাজ্য ধূলিসাৎ হয়ে যায়। কিন্তু সুগন্ধি তেল-এর ব্যবহার কিন্তু থেমে থাকে না। ততদিনে বাইজান্টিয়াম সাম্রাজ্য মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গিয়েছে এই তেলের উপকারিতায়। কনস্টান্টিনোপল (বর্তমানের ইস্তানবুল) থেকে আরম্ভ করে দামাস্কাস, কায়রো, বাগদাদ এমনকি কর্ডোবা পর্যন্ত তখন সুগন্ধি তেলের জয়জয়কার!

সুগন্ধি তেল উৎপাদনে মুসলিম পণ্ডিতদের ভূমিকা

দশম শতকে সুগন্ধি তেলের ব্যবহার বিখ্যাত পণ্ডিত ও বিজ্ঞানী ইবন এ সিনার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। যেহেতু তিনি গ্রিক, রোমান, ভারতীয় ও পারস্যের প্রাচীন ইতিহাস ও চিকিৎসা সম্পর্কে অবগত ছিলেন, সুগন্ধি তেলের উপকারিতা বুঝে নিতে তাঁর বেশি সময় লাগেনি। তিনি হিপোক্রেটাসের মতোই প্রায় ৮০০ টি উদ্ভিদ থেকে একটি বিশেষ পদ্ধতিতে তেল উৎপন্ন করেন। এই বিশেষ পদ্ধতিই ডিস্টিলেশন নামে পরিচিত এবং আজকের দিনেও ঠিক একই পদ্ধতিতে সুগন্ধি তেল তৈরি হয়।

ত্রয়োদশ শতকের দামাস্কাসের ইবন আল বায়তুর আভিসেনার পথ অনুসরণ করে প্রায় ১৪০০ উদ্ভিদ থেকে সুগন্ধি তেল ও নির্যাস উৎপন্ন করেন। তিনিই প্রথম গোলাপ জল ও কমলালেবুর সুগন্ধের উপকারিতা বর্ণনা করেছিলেন বলে জানা যায়।

সুগন্ধি তেলের ইউরোপে প্রবেশ

মধ্যপ্রাচ্য থেকেই ধীরে ধীরে যাজক সম্প্রদায়ের মধ্যে সুগন্ধি তেলের ব্যবহার প্রভাব বিস্তার করে। ৫৪২ খ্রিস্টাব্দে, বিউবনিক প্লেগ-এ ইউরোপ যখন ছাড়খার হয়ে যাচ্ছে। তখন পাইন ও অলিবানু প্রজ্বলিত করা হত রাস্তার মোড়ে মোড়ে। ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা সেজ অয়েল ব্যবহার করত সুস্থ থাকার তাগিদে।

পরবর্তীকালে, যে সমস্ত ক্রুসেডের সৈনিক জেরুজালেম থেকে ইউরোপে ফিরে এসেছিল, তারা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল সুগন্ধি তেল সম্পর্কে জ্ঞান। শুধু তাই নয়, সুগন্ধি তেল ব্যবহারের অভ্যাসও ছিল তাদের মধ্যে প্রকট।

এরপর, ইউরোপের নবজাগরণের সঙ্গে সঙ্গে সুগন্ধি তেল-এর ব্যবহারে মজে যায় গোটা মহাদেশ। ইউরোপের বিখ্যাত উদ্ভিদবিদ, অ্যালকেমিস্টরাও সুগন্ধি তেলের গুণপনা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে অবহিত করতে থাকেন। হিলডেগার্ড ফোন বিনজেন, নিকোলাস কালপেপার প্রমুখ বিখ্যাত পণ্ডিত মুসলমানদের কাছ থেকেই ল্যাভেন্ডার, লবঙ্গ, রোজমেরি তেলের ব্যবহার শেখেন।

বিংশ শতকের একটু পর থেকেই সুগন্ধি তেল চিকিৎসার ও রূপচর্চার অন্যতম মাধ্যম হয়ে ওঠে। ফ্রান্সের রেনে মরিসকে এর পথিকৃৎ বলা চলে। তিনি ১৯০৭ সালে পৈতৃক সুগন্ধি তেলের ব্যবসার মালিকানা পান। সেখান থেকেই মাথা খাটিয়ে তিনি ফরাসী পারফিউমে তেলের ব্যবহার শুরু করেন। শুধু তাই নয়, প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের সময় সৈনিকদের সুগন্ধি তেলের মাধ্যমে সুস্থ করে তোলেন।

রেনে মরিসকে আধুনিক অ্যারোমাথেরাপির জনক বলা হয় ঠিক এই কারণেই।

বর্তমানে সুগন্ধি তেল আমাদের জীবনের অন্যতম একটি অংশ হয়ে উঠেছে। তবে, বুটিকের ছোট্ট দামী বোতলেই সেই তেল আপনার হাতে আসুক। কিংবা সুপারমার্কেটের সাধারণ বোতল আপনার পছন্দ হোক। মনে রাখবেন, এই তেলের এক এক ফোঁটায় সম্পৃক্ত আছে এক অনন্য ইতিহাস। যে ইতিহাস খতিয়ান দেয় মানুষের উন্নতি ও মননশীলতার।