সুগন্ধি পোলাওর শেকড়ের সন্ধানে

নদীমাতৃক দেশগুলোর প্রধান খাদ্য ভাত ও মাছ। তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকা চাল ছাড়া প্রায় চলে না বললেই চলে। শুধু যে ভারত বা বাংলাদেশ তা কিন্তু নয়, এই ব্যবহার দক্ষিণ -পূর্ব এশিয়ার প্রতিটি দেশেই বহুলভাবে লক্ষনীয়।চালের ব্যবহারের এই ধারা নতুন না, তা অনেককাল আগে থেকেই চলে আসছে। ঐতিহাসিক চর্যাপদে এর উজ্জ্বল প্রমান মেলে। অস্ট্রিকভাষী আদিবাসী থেকে শুরু করে হরোপ্পা-মহেঞ্জোদাড়ো সভ্যতা, বৈদিক যুগ ও উপনিষদ যুগেও এই চালের ব্যবহার প্রচলিত ছিল। মধ্যযুগে চালের ব্যবহারও ভাতের ব্যবহার বেশি হলেও, বহুবছর পেরিয়ে এখনো একই ধারা বয়ে চলেছে।

চালের ধরন ও গুণাগুণ  বিভিন্ন হলেও চাল মোটামুটি দু রকমের -সিদ্ধ ও আতপ। “বাঙালির খাদ্যকোষ”এ মিলন দত্ত লিখেছেন-“1965 সাল পর্যন্ত বাংলায় সাড়ে পাঁচ হাজার জাতের ধানের নাম পাওয়া যায়। যদিও আজকের যুগে তা খুব একটা মেলে না, তবে যা পাওয়া যায় তার পরিমাণও নেহাত কম নয়।“ বাঙালির নিয়মিত খাদ্য হিসেবে ভাতের প্রতি টানটা অনেক বেশি। তবে শুধু ভাত নয়, তাকে নানা উপকরনে আরও সুস্বাদু করে তোলাতেই যেন খাদ্যসুখ। খিচুড়ি, পোলাও, বিরিয়ানি এইসব পদ তো এখান থেকেই সৃষ্টি। সংস্কৃতে এই পোলাওের নাম উল্লেখ ছিল।’পল্লাও’,পল অর্থাৎ মাংস ও অন্ন মিলিয়ে পলান্ন নামটাই বেশি পরিচিত। অবশ্য তখনকার পলান্ন মাংস ছাড়া হতই না।

আমিষ পোলাও যে শুধু মাংস দিয়ে হয় তা নয়, চিংড়ি ও কাঁকড়াও যোগ করা হয়। মাছের কোফতা পোলাও এর মধ্যেই পড়ে। মুসলিম শাসনের সময় এই পলান্ন নামবদল করে হয়েছিল “পোলাও”। প্রজ্ঞাসুন্দরী দেবী লিখেছেন,”সামান্য ভাতও রাঁধিবার গুনে রাজভোগ্য খাদ্যে পরিণত হইতে পারে, পোলাও তার প্রমান।” বেশিরভাগ লোকজন বাসমতী চালের ও গোবিন্দভোগ চালের পোলাওটাই বেশি পছন্দ করে। তবে বাঁকতুলসী, চিনিশর্কর, চামরমনি, পেশোয়ারী চাল দিয়েও পোলাও ভালো হয়, কাজ চালানোর জন্য অন্য চালও যায় বৈকি। নানারকম বাদাম(পেস্তা,কাজুবাদাম), কিসমিস, দারুচিনি, এলাচ, লবঙ্গ, তেজপাতা পোলাও দিয়ে এর স্বাদ বাড়ানো হয়। রান্নায় স্বাদ ও গন্ধ একে অপরের পরিপূরক। স্বাদ প্রসঙ্গে বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায় একটা কথা বলেছেন,”পরিমিত জল,মাংস ও মশলাদি দ্বারা সিদ্ধ করলে সেই জলকে আখ্নি বলা হয়।” এই আখ্নিটাই পোলাও এর স্বাদ বলা যায়। আর গন্ধের জন্য পুষ্প অর্থাৎ বেল, জুঁই, গোলাপ ও চামেলির পাপড়ি ব্যবহার করা হয়। রান্নার শেষের দিকে পাপড়ি সাজিয়ে দিলে, পোলাও ফুলের সুবাস টেনে যায়। তাছাড়া অনেকে আতর, মৃগনাভি; আবার কেউ কেউ গোলাপ জলও ব্যবহার করে। রান্নার পরিমান অনুযায়ী বা বিশেষ ধরনের ফ্রুট পোলাও তৈরীতে অনেকে নানান ফল, যেমন-বেদানা, আনারস, কমলালেবু, আপেল, পাকা আম দিয়ে থাকেন। এছাড়াও শালগম, কড়াইশুঁটি, ডুমুর দেওয়া হয়। ভারতবর্ষে রাজ-রাজত্বে নানা বংশ, নানান ধর্মের আগমন ঘটেছে। তাদের কিছু ছাপও পড়েছে এই খাদ্যতালিকায়। রাজা রামমোহন রায় খাদ্যরসিক ছিলেন, তার নামে পটোল ও মোরব্বা দিয়ে তৈরী হয়েছে রামমোহন দোলমা পোলাও বা মিঠা দোলমা।

পশ্চিমবঙ্গে যখন মুর্শিদ কুলি খাঁর আগমন ঘটেছিল, তখন হিন্দুস্থানী বা মুর্শিদাবাদি মাহী পোলাও তৈরী হয়েছিল, আবার সিরাজউদ্দিন এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সিরাজি পোলাও। এমনিতে মুসলমানদের  শাসনকালীন জনপ্রিয় হয়েছিল গুরুপাক লোকমা পোলাও, যা আজও বতর্মান। আতপ চাল, মিছরি, সাবু ও খোবানি মিশিয়ে দ্বারকানাথ ফির্নি পোলাও। মুগডালের ওপর বিশেষ জোর দিয়ে মোকেশ্বর পোলাও ও বাটা মশলার পোলাও বানানো হয়েছিল। ধর্মের জন্য অনেকেই নিরামিষাশী, তাদের হাত ধরে এসেছে ছানার পোলাও,সরমালাই পোলাও, রাজভোগ। এসব নিরামিষ-আমিষ প্রসঙ্গ থেকে বেরোলে মনে পড়ে খেচরান্ন ও হেমান্ন পোলাও এর কথা। কত ইতিহাস আজও অজানা, তাই দেশের অলিগলিতে হয়তো আরো গল্প ছিটিয়ে আছে, একটু খুঁজলে তারও স্পর্শ মিলত।