SalamWebToday নিউজলেটার
Sign up to get weekly SalamWebToday articles!
আমরা দুঃখিত কোনো কারণে ত্রুটি দেখা গিয়েছে:
সম্মতি জানানোর অর্থ, আপনি Salamweb-এর শর্তাবলী এবং গোপনীয়তার নীতি মেনে নিচ্ছেন
নিউজলেটার শিল্প

সুদানের রাজধানী খার্তুম: দুই নীল নদের মিলনে সমৃদ্ধশালী যে শহর!

পর্যটন ২১ জানু. ২০২১
ফিচার
সুদানের রাজধানী খার্তুম
Aerial panoramic view to Khartoum, Omdurman and confluence of the Blue and White Niles, Sudan © Sergey Mayorov | Dreamstime.com

পৃথিবীর মানচিত্রে নদীর নামকরণের বেশ অদ্ভুত এক নিয়ম রয়েছে। যখনই দুটো নদী কোথাও এসে একে অপরের সঙ্গে মেশে, তখনই যে নদী বেশি প্রবহমান সেই নদীর নামেই মিলিত প্রবাহ বয়ে চলে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, ভারতের এলাহাবাদে গঙ্গা যমুনা সঙ্গমের পর গঙ্গা ও যমুনার মিলিত ধারার নাম কিন্তু গঙ্গা। কিন্তু, পৃথিবীতে এমন একটি নদী রয়েছে যা এই নিয়মের ব্যতিক্রম। আর সেই ব্যতিক্রম দেখতে হলে যেতে হবে সুদানের রাজধানী খার্তুম-এ। এই খার্তুম-এই শ্বেত নীল নদ (হোয়াইট নাইল) ও আসমানি নীল নদ (ব্লু নাইল)-এর মেলবন্ধন বয়ে চলেছে সম্পূর্ণ অন্য এক নাম নিয়ে। যেখানে এই দুই নদের ধারা মিলিত হয় সেখান থেকে পরবর্তী তিন হাজার কিলোমিটার প্রবহমান এই মিলিত ধারার নাম নীল নদ বা নাইল, আরবিতে যাকে বলা হয় ‘বাহার আল নীল’ বা নীল সমুদ্র। এই মিলিত ধারা অতঃপর মিশে যায় ভূমধ্যসাগরের বুকে।

তবে শুধু এইক্ষেত্রে নয়, সুদানের রাজধানী খার্তুম আরও অনেক ক্ষেত্রেই অন্যরকম একটি শহর। অথবা বলা চলে, এই দুই নদের সঙ্গম সম্পূর্ণ আলাদা ভাবে খার্তুমের তিনটি অংশকে পুষ্ট করেছে। নাইলের দক্ষিণ পূর্বে মূল খার্তুম শহরের অবস্থান। একে খার্তুম কিবলিও বলা হয়। কিবলির অর্থ কিবলার দিকে, অর্থাৎ মক্কার দিকে। যেহেতু মিশরে দক্ষিণমুখী হয়ে মুসলিমরা নমাজ আদায় করে, তাই কিবলি-র চলিত অর্থ দক্ষিণমুখী। পশ্চিমে ওমদারমান শহর ও উত্তর পূর্বে অবস্থান করছে খার্তুম বাহরই বা সমুদ্রমুখী খার্তুম শহর। সুদানের ইতিহাসে এই শহরাংশগুলির ভূমিকা অনস্বীকার্য!

সুদানের রাজধানী খার্তুম-এর ইতিহাস

খার্তুম কিন্তু আদতে ছিল নীল নদের ধারের এক ছোট্ট গ্রাম। জনাকয়েক জেলেদের বাস ছিল সেখানে। কিন্তু ১৮২০ সনে যখন অটোমান তুর্কিরা সুদানের রাজধানী খার্তুম-এ পা রাখে, তখন থেকেই সে বিশ্বে পরিচিতি পেতে শুরু করে। মিশরের খেড়িভদের সাহায্যে খার্তুমের শাসনকার্য পরিচালিত হত। পরবর্তীকালে, বহু পশ্চিমা চলচ্চিত্র ও লেখা সেই সময়ের খার্তুমকে অনেক অন্ধকারাচ্ছন্ন প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করেছে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, ১৯৬৬-এর চলচ্চিত্র ‘খার্তুম’-এ দেখানোই হয়েছে যে ১৮৮৫ সালের সুদানের সঙ্গে পশ্চিমের যুদ্ধে কীভাবে ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল চার্লস গর্ডন মৃত্যুবরণ করেন।

সেভাবে দেখতে গেলে, খার্তুমে পশ্চিমাদের পা রাখা শুরু হয় সৈন্য শিবির ও দূতাবাসের মাধ্যমে। সাধারণত, ইউরোপিয়ানরা সরকারি ও কূটনৈতিক কাজে খার্তুমের দূতাবাসে বসবাস করতে শুরু করতেন। ১৮৮২ সালে মিশর ও সুদান ব্রিটিশরা দখল করলে শুরু হয় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন। এই আন্দোলনের নেতা ছিলেন মুহাম্মদ আহমদ ইবনে আবেদ আল্লাহ।

ব্রিটিশ শাসনের শুরু থেকেই মিশরীয়রা দাবি করতে থাকে, মিশর ও সুদান এক রাষ্ট্র হবে। কিন্তু তারা শেষে বোঝে যে সুদানের ওপর মিশরীয় সার্বভৌমত্ব দাবি বাতিল না করলে ব্রিটিশরা স্বাধীনতা দিতে বিলম্ব করবে। তাই ১৯৫৪ সালে মিশর- ব্রিটিশ চুক্তি অনুসারে ১৯৫৬ সালের ১ জানুয়ারি সুদান স্বাধীনতা লাভ করে। ইসমাইল আল আজহারি সুদানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন ও আধুনিক সুদানের প্রথম সরকারের নেতৃত্ব দেন।

সুদানের রাজধানী খার্তুম-এর পর্যটন

পর্যটকদের পক্ষে সুদানের রাজধানী  খার্তুম শহর দেখতে শুরু করার আদর্শ জায়গা দুই নদের মিলনস্থল। মূল খার্তুম শহরের এক প্রান্তে অবস্থিত এই উপদ্বীপকে আরবিতে বলা হয় মোকরান-আল- নিলায়ন। এখানে ব্লু নাইল ধীরে ধীরে প্রবাহিত হয় ও হোয়াইট নাইল তুলনায় বেশ তীব্রগতিতে প্রবাহিত হয়। এরপর অবশ্যই দুই নদের মিলিত প্রবাহ অনুসরণ করে ওমদারমান শহরাংশে আসতে হবে। মূলত ওমদারমান ও খার্তুম বাহরি-এর কলকা আকৃতির দ্বীপই পরিচয় দেয় কেন ও কীভাবে সুদানের এই শহর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শহর গড়ে ওঠার আদর্শ জায়গা ছিল এই সঙ্গম। একদিকে পরিষ্কার পানীয় জলের উৎস, আরেকদিকে পলল মৃত্তিকার অবস্থানের জন্য কৃষিকাজের বিকাশ। দুইয়ে মিলে পত্তন হয় নাগরিক সভ্যতার। পরে, নদীপথে বাণিজ্য শুরু হলে খার্তুমের সমৃদ্ধির দিন শুরু হয়।

ওমদারমানের বিপ্লবী ঐতিহ্য এখনও খুঁজে পাওয়া যায় খলিফা হাউজ মিউজিয়ামে। এটি প্রাথমিকভাবে ইবন মুহাম্মদের হেডকোয়ার্টার ছিল। আর নিল নদের তীরের থেকে খানিকটা দূরে খুঁজে পাওয়া যায় ধ্বংসপ্রাপ্ত অটোমান দুর্গ ও এস এস বোঁর্দে নামে একটি লোহার নৌযানের। এই নৌযানের মাধ্যমেই ইউরোপিয়ানরা নিল নদের উচ্চগতিতে অভিযান চালাত। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন স্যামুয়েল বেকার। এমনকি, কথিত আছে, এই নৌকার মাধ্যমেই নাকি চার্লস গর্ডন মৃত্যুবরণ করার আগে তাঁর ছয়খানা জার্নাল নিরাপদ হস্তে পৌঁছে দিতে পেরেছিলেন। আজও তাঁর লেখাকে ভিক্টোরিয়ান হিরোয়িক লিটারেচারের অন্যতম উদাহরণ ধরা হয়।

ওমদারমানের অন্যতম উল্লেখযোগ্য স্থান হল আহফাদ বিশ্ববিদ্যালয়। সুদানের বিদ্রোহর পর বিংশ শতকে বাবিকির বদরী নামক এক সৈনিকের আগ্রহে তৈরি হয় মেয়েদের একটি বিদ্যালয়। কালক্রমে সেই বিদ্যালয়ই বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ নিয়েছে। শুধু খার্তুম শহর নয়, দারফিউরিস, নুবিয়া এবং লোহিত সাগর অঞ্চলের মেয়েরাও এখানে পড়তে আসে।

অপরদিকে, খার্তুম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার জগতে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ১৯০২ সনে এই বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয় গর্ডন মেমোরিয়াল কলেজ নামে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান বিল্ডিংটি নিও-অটোমান ও গথিক কারুকার্যের মেলবন্ধনে তৈরি। গ্রিক স্থপতি, দিমিত্রিয়াস ফাব্রিসিয়াস পাশার পরিকল্পনায় তৈরি এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

পর্যটনের অন্যতম নিদর্শন

সুদানের রাজধানী খার্তুম-এর পর্যটন শিল্পের অন্যতম নিদর্শন হল অ্যাক্রোপল হোটেল। এক ঝলকে হোটেলের স্থাপত্য দেখলে মনে হবে সটান আগাথা ক্রিস্টির গল্পের পাতা থেকে নেমে এসেছে। কথিত আছে, এই হোটেলে কখনওই জায়গা পাওয়া যায় না। এর কারণ, খার্তুমের ২০০ কিলোমিটার উত্তরে রয়েছে মেরো। এখানকার পিরামিড ও অন্যান্য মিশরিয় ঐতিহাসিক স্থাপত্য নিয়ে গবেষণা করার জন্য প্রত্নতত্ববিদরা প্রায়শই আসেন। আর তখন তাঁদের থাকার প্রিয় জায়গা অ্যাক্রোপল হোটেল। হোটেলের স্থাপনা করেছিলেন একজন গ্রিক অভিবাসী পেগুল্যাটোস। এখন তাঁর ছেলে এথেনাসিওস ও জর্জই হোটেলটি চালনা করেন।

মূল খার্তুম বা খার্তুম কিবলি ও খার্তুম বাহরি-র মধ্যে গোটা চারেক ব্রিজ রয়েছে। একটি ব্রিজের পাদদেশে দেখা পাওয়া যাবে জাফর মিরগনির। খার্তুম বাহরি-র এই অধিবাসী আসলে ‘সুদান সিভিলাইজেশন ইনস্টিটিউট’-এর অধিকর্তা।

প্রাজ্ঞ এই মানুষটির থেকে খার্তুম সম্পর্কে জানা গেল অনেক কথা। তিনি জানালেন, ‘বাইরের মানুষের কাছে খার্তুমের সমগ্র রূপ হয়তো ভীষণ এলোমেলো লাগবে। কিন্তু, তা আসলে ইতিহাসের স্বাক্ষর। প্রতিটি গঠনে লুকিয়ে রয়েছে এক একটি ইতিহাসের কাহিনী।’

মিরগনির থেকেই জানা গেল খার্তুম শহরের পত্তনের আগের তিনটি গ্রাম বা হিল্লার নাম- হামিদ, খোজালি ও আল- শাহবাবি। সেখান থেকেই আজ সুদানের রাজধানী সুন্দরী খার্তুম শহরের সূচনা।

খার্তুমের মানুষ

খার্তুম শহর আসলে অন্য বড় শহরের মতোই নানা মানুষের সমাগমে সমৃদ্ধ। নানারকম আমোদ প্রমোদের ব্যবস্থা রয়েছে সারা শহর জুড়ে। তবে, সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে সপ্তাহান্তে নীল নদের ধারে কুস্তির আখড়া।

মূলত ফ্রি-স্টাইল কুস্তির প্রচলন থাকলেও, বালির গাদায় নুবিয়া স্টাইল কুস্তি ও টার্কিশ অয়েল রেসলিং-এরও চল রয়েছে এখানে।

কুস্তিগিরদের র‍্যাংকিং কিন্তু ওজন অনুসারে হয় না। বরং, কার দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কত বেশি তার উপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত হয় কে কোন পজিশনে যাবে। তিনটি বিভাগ রয়েছে দক্ষতার, শিবলি বা সিংহ- এটি একেবারে প্রাথমিক বিভাগ। এরপর আসে ওইস্ট বা মধ্য ভাগ এবং শেষে ফারিজ বা মধ্যযুগীয় বীর।

তিনটি শহরাংশ থেকে মিনি বাসে করে দর্শকরা এই লড়াই দেখতে আসে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই লড়াই শান্তিপূর্ণ ভাবেই শেষ হয়।

বাহরই ট্রেন স্টেশন থেকে সেহেন্দি পর্যন্ত নিয়মিত ট্রেন চলে। এই সেহেন্দি মেরোর কাছের স্টেশন। মেরো হল সেই পিরামিড সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক শহর যা খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ থেকে ৩৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কুশ সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল।

ইব্রাহিম এল জাইন সোঘাইউরুন একজন অভিজ্ঞ ইতিহাসের প্রফেসর। তিনি ১৯৩৬ সনে খার্তুম কিবলিতে জন্মেছিলেন। তারপর তাঁর বড় হয়ে ওঠা ও কর্মজীবন এ শহরেই। তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল অনেক কিছু। সুদানের চতুর্থ রাষ্ট্রপতি, জাফর নিমিরে তাঁর সহপাঠী ছিলেন। তিনি বললেন, ‘আমার কখনও মনে হয়নি খার্তুম পৃথিবীর থেকে আলাদা একটি শহর। বরং, প্রাচীনকাল থেকেই আমরা ভীষণভাবে সংযুক্ত বিশ্বের সঙ্গে।’

ঐতিহ্য সংস্কৃতি ও আধুনিকতার মিশেল দেখা যায় বর্তমান খার্তুম শহরে। দুই নদের সম্মিলিত প্রবাহ ও বিভিন্ন মানুষের সহাবস্থান শহরকে বিশ্বের মানচিত্রে করে তুলেছে অনুপম।