সুরা রুম এর তাৎপর্য্য ও শিক্ষা (২য় পর্ব)

আকীদাহ Contributor
জানা-অজানা
সূরা রুমের

১ম পর্বে সুরা রুমে কৃত কুরআনের দুটি ভবিষ্যতবাণী সত্য হওয়ার আলোচনা এসেছে। ১মটি হল ইরানীদের উপর রোমকদের বিজয় আর ২য়টি হল মুশরিকদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের বিজয়।

কুরআনের ভবিষ্যদ্বাণী এত নিখুতভাবে পুরোপুরি সত্য প্রমানিত হয়েছিল ছিল যে, এ ব্যাপারে আর কারোও সামান্যতম সন্দেহের অবকাশও ছিল না। আরবের বিপুল সংখ্যক মুশরিক এর পরে কুরআনের উপর ঈমান আনে; ইসলাম গ্রহণ করে।

উবাই ইবনে খালফ আবু বকর (রাযিঃ)-এর সাথে ১০০টি উট বাজি ধরেছিল। বদরের যুদ্ধে সে নিহত হওয়ার কারণে তার উত্তরাধিকারীদেরকে পরাজয় মেনে নিয়ে আবু বকর (রাযিঃ)-কে সেই বাজির একশো উট দিয়ে দিতে হয়। তিনি সেগুলো নিয়ে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আ’লাহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে হাজির হলে নবীজী তাকে হুকুম দেন, এগুলো সাদকা করে দিতে। কারণ আবু বকর(রাযিঃ) যখন বাজি ধরেছিলেন তখন ইসলামে জুয়া হারাম হবার হুকুম নাযিল হয়েছিল না। কিন্তু ঐ সময়ে তা হারাম হবার হুকুম এসে গিয়েছিল। তাই যুদ্ধের মাধ্যমে বশ্যতা স্বীকারকারী কাফেরদের থেকে বাজির অর্থ নিয়ে নেয়ার অনুমতি দেওয়া হলেও একই সঙ্গে হুকুম দেয়া হয়, তা নিজে ভোগ না করে সাদকা করে দিতে হবে।

সূরা রুমের বিষয়বস্তু ও মূল বক্তব্য

এ সূরার ভূমিকাতে বলা হয়েছে, আজ রোমানরা পরাজিত হয়েছে এবং সমগ্র বিশ্ববাসী মনে করছে এ সাম্রাজ্যের পতন আসন্ন। কিন্তু কয়েক বছর অতিবাহিত হতে না হতেই সবকিছুর পরিবর্তন হয়ে যাবে এবং আজ যে পরাজিত সেদিন সে বিজয়ী হয়ে যাবে।

এ ভুমিকা থেকে একথা প্রকাশিত হয়েছে যে, মানুষ নিজের বাহ্য দৃষ্টির কারণে শুধুমাত্র তাই দেখে যা তার চোখের সামনে থাকে। কিন্তু এ বাহ্যিক পর্দার পেছনে যা কিছু আছে সে সম্পর্কে সে সম্পূর্ণই বেখবর থাকে। এ বাহ্যদৃষ্টি যখন দুনিয়ার অতি সামান্য বিষয়ের ব্যাপারে বিভ্রান্তি ও ভ্রান্ত অনুমানের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং যখন শুধুমাত্র “আগামীকাল কি হবে” এতটুকু কথা না জানার কারণে মানুষ ভুল হিসাব করে বসে, তখন সামগ্রিকভাবে সমগ্র জীবনকে ইহকালীন বাহ্যিক জীবনের ওপর নির্ভরশীল করে দেওয়া এবং এরই ভিত্তিতে নিজের সমগ্র জীবনের পুঁজিকে বাকি রাখা যে কত বড় ভুল এবং বোকামী, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

এভাবে রোম-ইরানের বিষয় থেকে কুরআনের বক্তব্য আখেরাতের বিষয়ের দিকে মোড় নিয়েছে এবং ক্রমাগত তিন রুকু পর্যন্ত বিভিন্নভাবে এ কথা মানুষকে বুঝাবার চেষ্টা করা হয়েছে যে, আখেরাতের জীবন বাস্তবসম্মত, যুক্তিসঙ্গত এবং এর প্রয়োজনও আছে। মানুষের জীবন ব্যবস্থাকে সুস্থ ও সুন্দর রাখার স্বার্থে তার জন্য আখেরাতে বিশ্বাস করে বর্তমান জীবনের জন্য কর্মসূচীহাতে নেওয়া খুবই প্রয়োজন। অন্যথায় বাহ্যদৃষ্টির ওপর নির্ভর করে কর্মসূচী গ্রহণ করার যে পরিণাম হয়ে থাকে এক্ষেত্রেও সেটিই হতে বাধ্য।

সূরা রুমের উপমা

এ প্রসঙ্গে আখেরাতের পক্ষে যুক্তি পেশ করতে গিয়ে বিশ্বজগতের যেসব নিদর্শনকে সাক্ষ্য বা প্রমাণ হিসেবে পেশ করা হয়েছে সেগুলো নির্দ্বিধায় তাওহীদেরও প্রমাণ পেশ করে। তাই চতুর্থ রুকুর শুরু থেকে তাওহীদের সত্য ও শিরককে মিথ্যা প্রমাণ করাই পরবর্তী আয়াতগুলো লক্ষ্য হয়ে দাড়িয়েছে এবং বলা হয়েছে, মানুষের জন্য পুরোপুরি একনিষ্ঠ হয়ে একমাত্র আল্লাহর বন্দেগী করা ছাড়া আর কোথাও কল্যাণ নেই।

শিরক মূলত বিশ্ব প্রকৃতি এবং মানব প্রকৃতি উভয়েরই বিরোধী। তাই যেখানেই মানুষ এই ভ্রষ্টতার পথ অবলম্বন করেছে সেখানেই বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। পরবর্তীতে আবার সেই মহা বিপর্যয়ের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে যা সে সময় দুনিয়ার দু’টি সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্যের মধ্যে যুদ্ধের কারণে সৃষ্টি হয়েছিল। বলা হয়েছে, এ বিপর্যয়ও শিরকের অন্যতম ফল এবং মানব জাতির অতীত ইতিহাসে যতগুলি জাতি বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে তারা সবাই ছিল মুশরিক।

সূরার শেষ পর্যায়ে উপমার মাধ্যমে মানুষকে বুঝানো হয়েছে, যেমন খরায় মৃত যমীন আল্লাহর কর্তৃক প্রেরিত বৃষ্টির স্পর্শে এসে সহসা জীবন্ত হয়ে ওঠে এবং জীবন ও ফসলের ভাণ্ডার উদগীরণ করতে থাকে, ঠিক তেমনি আল্লাহ প্রেরিত ওহী এবং নবুওয়াতও মৃত, পতিত, রুক্ষ মানবতার পক্ষে রহমতের বারিধারা স্বরূপ। ওহী নাযিল হওয়াই মানুষের জীবন, বৃদ্ধি, বিকাশ এবং কল্যাণের উৎসের কারণ হয়। এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করলে আরবের শিরকে ভরা এ অনুর্বর ভূমি আল্লাহর রহমতে তাওহীদের বীজে শস্য-শ্যামল হয়ে উঠবে এবং সমস্ত কল্যাণ হবে মানুষের নিজেদেরই জন্য। আর এর সদ্ব্যবহার না করলে মানুষই ক্ষতি করবে। তারপর অনুশোচনা করেও কোনো লাভ হবে না এবং ক্ষতিপূরণ করার কোন সুযোগও সে পাবে না।

Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.