সুরা রুম এর তাৎপর্য্য ও শিক্ষা (১ম পর্ব)

আকীদাহ Contributor
ফিচার
সূরা রুম
117185950 © Leo Lintang | Dreamstime.com

এই সূরার নামকরণ করা হয়েছে প্রথম আয়াতের ‘গ্বুলিবাতির রুম’ বাক্যাংশটির কারণে। এ সূরাটি ৬১৫ খ্রিষ্টাব্দে নাযিল হয় এবং হাবশায় হিজরতও এ বছরই অনুষ্ঠিত হয়। সূরা রুমের প্রথম দিকের আয়াতগুলোতে যে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে তা কুরআন যে আল্লাহর কালাম এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম যে সত্য রাসূল তা সুস্পষ্ট প্রমাণ করে। এটি অনুধাবন করার জন্য এ আয়াতগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনাবলী সম্পর্কে জানা প্রয়োজন।

ঐতিহাসিক পটভূমি

ইরানী সেনাদল তৎকালীন রোমানদের পরাজিত করে জর্দান, ফিলিস্তীন ও সমগ্র সিনাই উপদ্বীপ দখল করে পারস্য সাম্রাজ্যের সীমানা মিসর পর্যন্ত বিস্তৃত করে। এটা এমন এক সময় ছিল যখন মক্কা মুকাররামায় এর চাইতেও আরোও অধিক গুরুত্বপূর্ণ একটি ঐতিহাসিক যুদ্ধ চলছিল। এখানে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নেতৃত্বাধীনে তাওহীদের পতাকাবাহীরা কুরাইশ সরদারদের নেতৃত্বে শিরকের পতাকাবাহীদের সাথে যুদ্ধরত ছিল। এ অবস্থা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে, ৬১৫ খৃষ্টাব্দে বিপুল সংখ্যক মুসলমানকে স্বদেশ ত্যাগ করে হাবশার খৃষ্টান রাজ্য।

যেটি ছিল রোম সাম্রাজ্যের মিত্র দেশ, সেখানে আশ্রয় নিতে হয়। এ সময় রোম সাম্রাজ্যে ইরানের বিজয় অভিযানের কথা ছিল সবার মুখেমুখে। মক্কার মুশরিকরা পর্যন্ত এসব কথায় খুব খুশি হয়ে উঠেছিল। তারা মুসলমানদেরকে বলতো, দেখো, ইরানের অগ্নি উপাসকরা বিজয় লাভ করেছে এবং ওহী ও নবুওয়াতের অনুসারী খৃষ্টানরা একের পর এক পরাজিত হয়ে চলছে। অনুরূপভাবে আমরা আরবের মূর্তিপূজারীরাও তোমাদেরকে এবং তোমাদের দ্বীনকে একসময় ধ্বংস করে ছাড়বো।

এ অবস্থায় কুরআন মাজীদের এই সূরাটি নাযিল হয় এবং এখানে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়ঃ “নিকটবর্তী দেশে রোমানরা পরাজিত হয়েছে কিন্তু এ পরাজয়ের পর কয়েক বছরের মধ্যেই তারা আবার বিজয়ী হবে।” এর মধ্যে একটির পরিবর্তে দুটি ভবিষদ্বাণী করা হয়েছে। একটি হচ্ছে , রোমানরা ইরানের মুর্তিপুজারীদের উপর জয়লাভ করবে এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে, মুসলমানরাও একই সময় মুশরিকদের উপর বিজয় লাভ করবে। আপাতদৃষ্টিতে এ দুটি ভবিষদ্বাণীর কোনো একটিরও কয়েক বছরের মধ্যে সত্যে পরিণত হবার কোন দূরতম সম্ভাবনাও ছিল না।

কারণ তখন মক্কায় ছিল মুষ্টিমেয় কয়েকজন মুসলমান। তারা মক্কায় নির্যাতিত হয়ে চলছিল। এ ভবিষদ্বাণীর পরও আট বছর পর্যন্ত কোনো দিক থেকে তাদের বিজয় লাভের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না। অপরদিকে রোমকদেরও পরাজয়ের বহর দিন দিন বেড়েই চলছিল।

ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হওয়ার শর্ত

সুতরাং, কুরআন মাজীদের এ ভবিষদ্বাণীর পরও সাত আট বছর পর্যন্ত অবস্থা এমন ছিল যে, রোমানরা ইরানীদের ওপর বিজয় লাভ করবে এ ধরনের কোনো কথা কোনো ব্যক্তি কল্পনাও করতে পারতো না । বরং বিজয় তো দূরের কথা তখন সামনের দিকে এ সাম্রাজ্য আর টিকে থাকবে এ আশাও কারোও ছিল না।

কুরআন মাজীদের এ আয়াত নাযিল হলে মক্কার কাফেররা এ নিয়ে খুব ঠাণ্ডা বিদ্রুপ করতে থাকে। উবাই ইবনে খালফ হযরত আবু বকর (রাযিঃ) এর সাথে বাজি ধরে। সে বলে, “যদি তিন বছরের মধ্যে রোমানরা ইরানীদের উপর জয়লাভ করে তাহলে আমি তোমাকে দশটা উট দেবো। অন্যথায় তুমি আমাকে দশটা উট দেবে।” নবীজী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এই বাজির কথা জানতে পেরে আবু বকরকে বলেন, “কুরআনে বলা হয়েছে ‘ফী বিদ্বঈসিনিন’ আর আরবী ভাষায় ‘বিদঈ’ শব্দ দশের কম সংখ্যাকে বোঝায়। কাজেই দশ বছরের শর্ত রাখো এবং উটের সংখ্যা আরও দশ গুণ বাড়িয়ে একশো করে দাও।” এ কথা শুনে হযরত আবু বকর (রাযিঃ) উবাই-এর সাথে আবার কথা বলেন এবং নতুনভাবে দশ বছরের জন্য ১০০টি উট শর্ত লাগান।

একের পর এক হামলা

৬২২ খ্রিষ্টাব্দে একদিকে নবীজী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরাত করে মদীনায় চলে যান। অপরদিকে রোমসম্রাট হিরাক্লিয়াস নীরবে কনস্ট্যান্টিনোপল থেকে বের হয়ে কৃষ্ণসাগরের পথে ত্রাবিজুনের দিকে রওয়ানা দেন। সেখানে গিয়ে তিনি পেছন দিক থেকে ইরানের ওপর আক্রমণ করার প্রস্তুতি নেন। এবং এই প্রতি আক্রমণের প্রস্তুতির জন্য তিনি গীর্জার কাছে অর্থ সাহায্যের আবেদন জানান। খৃষ্টীয় গীর্জার প্রধান খৃষ্টবাদকে অগ্নিপূজারীদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য গীর্জায় জমাকৃত অর্থ-সম্পদ সুদের ভিত্তিতে তাকে ঋণ দেন।

এরপর হিরাক্লিয়াস ৬২৩খৃষ্টাব্দে আর্মেনিয়া থেকে আক্রমণ শুরু করেন। এর পরের বছর অর্থাৎ, ৬২৪ খ্রিষ্টব্দে তিনি আজারবাইজানে প্রবেশ করে আরমিয়াহ ধ্বংস করেন এবং ইরানীদের সর্ববৃহৎ অগ্নিকুণ্ড বিধ্বস্ত করে দেন। আল্লাহর মহিমা দেখুন, এই বছরেই মুসলমানরাও বদরের যুদ্ধে মুশরিকদের মোকাবিলা করে ইসলামের প্রথম চূড়ান্ত বিজয় লাভ করে। এভাবে সূরা রুমে উল্লেখিত দু’টি ভবিষ্যদ্বাণীর ১০ বছরের সময়সীমা ফুরাবার আগেই একই সঙ্গে দুটিই সত্য প্রমাণিত হয়।

 

(চলবে)

Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.