সুলতানি যুগে বেকার ভাতা এবং কর্মনিয়োগ কেন্দ্র গড়েছিলেন এই শাসক

Jami Masjid mosque at Feroz Shah Kotla, New Delhi. The mosque was built by Feroz Shah Tughlaq, the Sultan of Delhi Sultanate in 1354
Jami Masjid mosque at Feroz Shah Kotla, New Delhi. The mosque was built by Feroz Shah Tughlaq, the Sultan of Delhi Sultanate in 1354 ID 170260320 © Karunesh Johri | Dreamstime.com

ভারতবর্ষে দিল্লিতে সুলতানি সাম্রাজ্যের প্রভাব এবং প্রতিপত্তির ইতিহাস নানা কারণে ঐতিহাসিকদের কাছে বিশেষ ভাবে স্মরণযোগ্য। সুলতানি সাম্রাজ্যের ইতিহাসে তুঘলক বংশের শাসনকাল নানা কারণে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থেকেছে। ১৩২০ খ্রিস্টাব্দে গিয়াসউদ্দিন তুঘলকের হাত ধরে দিল্লিতে তাদের সাম্রাজ্য বিস্তারের ইতিবৃত্ত প্রতিষ্ঠিত হয়। ইতিহাসের পাতায় এই বংশেরই উত্তরসূরী মহম্মদ বিন তুঘলক নানা কারণে সমালোচিত হলেও তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর কাকার ছেলে ফিরোজ শাহ তুঘলক দিল্লির সিংহাসন লাভ করেন (১৩৫১ খ্রি)। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করতেই হবে তিনি জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন কাজের জন্য ভারতের ইতিহাসে একইসঙ্গে ইসলামি সংস্কৃতির ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছেন। এই প্রসঙ্গে হেনরি এলিয়টের প্রসঙ্গ উদ্ধৃত করতে হবে। তিনি ফিরোজ শাহ তুঘলককে সুলতানি যুগের আকবরবলে অভিহিত করেছিলেন। তাঁর জনকল্যাণমূলক কাজের বিবরণী নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিকভাবে প্রসিদ্ধ এবং সমৃদ্ধ।

প্রথমেই উল্লেখ করতে হবে তৎকালীন ভারতের বেকারত্বের সমস্যার প্রতি তিনি বিশেষভাবে নজর দিয়েছিলেন। তিনি বেকার সমস্যা সমাধানের জন্য দিল্লিতে একটি কর্মনিয়োগ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই সংস্থার প্রাথমিক কাজই ছিল বেকার যুবকদের একটি তালিকা প্রস্তুত করা এবং যোগ্যতা অনুযায়ী তাঁদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।

বেকার সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি তিনি দরিদ্র ব্যক্তিদের সাহায্য করার জন্য দেওয়ান-ই-খয়রাতনামে একটি দপ্তর প্রতিষ্ঠা করেন। এই দপ্তরের প্রধান কাজই ছিল দরিদ্র, অনাথ, বিধবা ও মুসলিম ফকিরদের সাহায্য করা।

তিনি সমগ্র দেশের স্বাস্থ্য পরিষেবার সুষম বণ্টনের জন্য দিল্লিতে দার-উল-সাফানামে একটি চিকিৎসালয় স্থাপন করেন। এই দপ্তরে বিনামূল্যে চিকিৎসা পরিষেবার পাশাপাশি ওষুধ দেওয়ারও সুব্যবস্থা ছিল।

এর পাশাপাশিই অর্থনীতি তথা দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উন্নতির জন্য তিনি বহু প্রকল্প গ্রহণ করেছিলেন, সেই প্রকল্পের মধ্যেই ছিল দেওয়ান-ই-ইস্তিহকনামে একটি সরকারি বিভাগ তৈরি করে যোগ্য ব্যক্তিদের অর্থসাহায্য করা। এই প্রসঙ্গে অবাক করার মতোই একটি তথ্য আমাদের কাছে উঠে আসে। ঐতিহাসিক তথ্যানুসন্ধানের মাধ্যমে জানা গেছে এই দপ্তর থেকে প্রতিবছর প্রায় ৪,২০০ জন ব্যক্তি ৩৬ লক্ষ টাকা সাহায্য পেতেন।

শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিও তাঁর দূরদর্শী ভূমিকার কথা অবশ্যই উল্লেখযোগ্য। শিক্ষাবিস্তারের জন্য তিনি অনেক মক্তব এবং মাদ্রাসা স্থাপন করেছিলেন। ভারতীয় প্রাচীন সংস্কৃতির প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ তাঁকে ৩০০ সংস্কৃত পুথি ফারসিতে অনূদিত করতে অনুপ্রাণিত করেছিল। একথা বিশেষভাবেই স্পষ্ট যে সাম্রাজ্য বিস্তারের পাশাপাশি তিনি প্রজাহিতৈষী একজন শাসক ছিলেন। 

তাঁর সাম্রাজ্যে কৃষিকাজেরও প্রভূত উন্নতিসাধন ঘটেছিল। তিনি অনেক পতিত জমিকে কৃষির উপযোগী করেন এবং জলসেচ ও পানীয় জলের জন্য পঞ্চাশটি বাঁধ, প্রায় দেড়শতাধিক কূপ ও পুষ্করিণী খনন করেন। এছাড়া তিনি প্রায় ৪০টি মসজিদ, ১০০টি চিকিৎসালয়, ২০০টি শহর এবং অসংখ্য বাগান তৈরি করেন।

সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা, সাম্রাজ্যের পরিসর বৃদ্ধির পাশাপাশি আক্ষরিক অর্থেই তিনি ছিলেন একজন প্রজাহিতৈষী, জনদরদী সুলতান। তিনি প্রায় ৩৭ বছর দিল্লির শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করেছিলেন। তিন দশকেরও বেশি সময় জুড়ে তাঁর রাজত্বে জনগণ সুখ এবং শান্তিতে তাঁদের জীবন অতিবাহিত করেছিলেন… কার্যত প্রজারা সর্বোতভাবে ছিল সমৃদ্ধ… এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে হয় ঐতিহাসিক আফিফকের কথা উদ্ধৃত করেই বলতে হয়, তখন প্রজাদের গৃহ শস্য, সম্পদ এবং দামি আসবাবপত্রে পরিপূর্ণ থাকত…

সুতরাং, তুঘলক শাসনের ইতিহাসে এই সুলতানি শাসকের নাম যে বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য তা বলাইবাহুল্য.