সূরা ফাতিহার আলোকে উৎপাদনশীল জীবন গঠন

আকীদাহ Contributor
Photo <a href=48249935 © - Dreamstime.com">

সূরা ফাতিহা মূলত একটি প্রার্থনা এবং একই সাথে এটি একটি অঙ্গীকারনামা। আবার এটি পবিত্র কুরআন মাজিদের ভূমিকা। এই প্রার্থনা, অঙ্গীকারনামা বা ভূমিকাটির তেলাওয়াতের মধ্য দিয়েই কুরআন পাঠ শুরু করতে হয়। এই সূরাটি এত গুরুত্বপূর্ণ যে, প্রতি নামাজে এটি পড়া বাধ্যতামূলক বা ওয়াজিব করা হয়েছে।  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা পাঠ করেনি তার নামাজ হয়নি।” (বুখারী) এ কারণে প্রতিদিন, প্রতি ওয়াক্ত নামাজের প্রতিটি রাকায়াতে আমরা সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত করে থাকি।

এই সূরার গুরুত্ব

কিন্তু আমরা আমাদের প্রতিদিনের নামাজে সূরা ফাতিহা তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে আমাদের রবের নিকট কী প্রার্থনা ও অঙ্গীকার করে থাকি তা কি আমরা জানি? সত্য কথা বলতে কি, আমাদের অধিকাংশই এই সূরার অর্থ, তাৎপর্য ও শিক্ষা সম্পর্কে সচেতন নই।

সূরা ফাতিহা সমগ্র কুরআনের নির্যাস এবং নীতিগতভাবে কুরআনের সমস্ত শিক্ষার সংক্ষেপ। বাকী সূরাগুলো প্রকারান্তে এ সূরারই বিস্তৃত ব্যাখ্যা। কারণ সমগ্র কুরআনই হল ইসলামের সকল কর্মসূচীর ভিত্তি। ইসলামী জীবন বিধানের গঠনতন্ত্র ঈমান ও নেক আমলের আলোচনাতেই কেন্দ্রীভূত। আর এ দুটো মূলনীতিই সূরা ফাতিহায় সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণনা করা হয়েছে।

এ সূরায় অনন্ত পরকালীন জীবনে মুক্তি ও সাফল্যের রাজপথের কথা বলা হয়েছে। এই রাজপথের নাম ঈমান ও নেক আমল। এই রাজপথের অপর নাম- ‘সিরাতুল মুস্তাকীম’। (সরল সোজা পথ) সিরাত বা পথ হলো ঈমান। আর মুস্তাকীম অর্থাৎ, সরল সোজা মানে- নেক আমল।

এ সূরার সারমর্ম হলো বান্দার সাথে আল্লাহর সম্পর্ক। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, জাতীয় কিংবা বৈশ্বিক সবখানেই বান্দার অবস্থান কোথায় তা জানা দরকার। বান্দার ভেতর থেকেই এর জবাব পাওয়ার চেষ্টা যদি থাকে তবে সূরা ফাতিহা এই জিজ্ঞাসার তৃষ্ণা মেটাতে মহাসমুদ্রের মতো তার সামনে এসে হাজির হয়।

এটি মূলত আল্লাহর দান। তাঁরই শিখিয়ে দেয়া একটি মানপত্র। যাতে আল্লাহর কাছে বান্দা তার চাওয়া-পাওয়ার কথা বলছে। একটা মানপত্রের মতো এতেও তিনটি অংশ। প্রথমেই যার কাছে চাওয়া হচ্ছে তাঁর গুণ ও প্রশংসা, তারপর যে বা যারা চাচ্ছে তার পরিচয়, সব শেষে বান্দার চাওয়া।

সাহায্য কামনা শুধু আল্লাহর কাছে

আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহ লাভে তাঁর দরবারে চাওয়াই হলো মুমিনের রীতি। প্রথমে তিনি দু’আর আদব শিখিয়েছেন, তারপর চাওয়ার বিষয়টিও শিখিয়েছেন। শুরুতে মহান আল্লাহ তা’আলার প্রশংসা ও রহমতের গুণগান, এরপর বলা হয়েছে, ‘হে মহান আল্লাহ আমরা শুধু আপনারই ইবাদত করি।’ এবং একমাত্র আপনার থেকেই সাহায্য কামনা করি।’ অর্থাৎ ইবাদতের লক্ষ্য যেমন একমাত্র আল্লাহ, তেমনি তিনিই সকল চাওয়া পাওয়া ও দু’আর লক্ষ্যও। আল্লাহ ভিন্ন অন্য কারও ইবাদত যেমন হারাম, তেমনি অন্য কারও কাছে চাওয়াটাও হারাম। এরপর উচ্চারিত হয়েছে কাঙ্ক্ষিত চাওয়ার চরম বিষয়টি। সেটি হলো- “আমাদেরকে সিরাতুল মুস্তাকীমের পথটি দেখান। তাদের পথ যাদের উপর আপনি অনুগ্রহ দান করেছেন। এবং তাদের পথ নয়, যাদের উপর আপনার ক্রোধ নিপতিত এবং যারা পথভ্রষ্ট।”

সিরাতুল মুসতাকীমের সন্ধান পাওয়া এবং পথভ্রষ্টতা থেকে বাঁচার আকুতি এটিই হলো দু’আর মূল বিষয়। সিরাতুল মুস্তাকীম পাওয়ার কামনা যেমন এখানে প্রবল, তেমনি অতি প্রবল হলো যারা পথভ্রষ্ট এবং যাদের উপর মহান আল্লাহর অভিসম্পাত বা আজাব তাদের থেকে দূরে থাকার ইচ্ছা। সম্পদলাভ, সন্তান লাভ, চাকুরী লাভ, সুস্থতা লাভ, পেশাগত সাফল্য লাভ, সম্মান লাভ, মানুষের জীবনে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অথচ আল্লাহ নির্দেশিত মুমিনদের সে চাওয়ার তালিকায় সেগুলো গুরুত্ব পায়নি। গুরুত্ব পেয়েছে সিরাতুল মুসতাকীম। গুরুত্ব পেয়েছে পথভ্রষ্টতা ও পথহারা মানুষের থেকে বাঁচবার বিষয়। সুতরাং, আল্লাহর কাছে এগুলিই হল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ভাববার বিষয়

কিন্তু প্রশ্ন হলো, আজকের মুসলমানদের চাওয়া পাওয়া ও চেতনায় মহান আল্লাহর শেখানো সে দু’আর প্রতিফলন কতটুকু? নামাজের প্রথম রাকায়াতে তিলাওয়াত ছাড়া মজলিস বা ব্যক্তিগত মুনাজাতে এ সর্বশ্রেষ্ঠ দোয়াটি কতটুকু গুরুত্ব পায়? চেতনা রাজ্যে সিরাতুল মুসতাকীমের বিষয়টি যে কতটা গুরুত্ব হারিয়েছে এটি কি তারই প্রমাণ নয়। এ জন্যই কি আজকের মুসলমানদের জীবনে এত পথভ্রষ্টতা? জীবনে সম্পদ, সন্তান, যশ খ্যাতি লাভ সত্ত্বেও যে জীবনে সিরাতুল মুসতাকীম নাই- তা কি সফল জীবন হতে পারে? মানব জীবনে এর চেয়ে বড় ব্যর্থতা আর কি হতে পারে?

তাই আসুন আমরা দু’আ করি আল্লাহ যেন আমাদেরকে সিরাতুল মুসতাকীমের উপর চলার তাওফিক দান করেন। আমিন।

Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.