SalamWebToday নিউজলেটার
Sign up to get weekly SalamWebToday articles!
আমরা দুঃখিত কোনো কারণে ত্রুটি দেখা গিয়েছে:
সম্মতি জানানোর অর্থ, আপনি Salamweb-এর শর্তাবলী এবং গোপনীয়তার নীতি মেনে নিচ্ছেন
নিউজলেটার শিল্প

সূরা হুদ আমাকে বৃদ্ধ বানিয়ে দিয়েছে

আকীদাহ ১৭ ফেব্রু. ২০২১
ফোকাস
সূরা হুদ
File ID 110809945 | © Jahmaican | Dreamstime.com

এই নিবন্ধটির শিরোনামটি নেওয়া হয়েছে একটি হাদিস থেকে। আমরা কিভাবে কুরআনের সাথে সম্পর্ক গড়ব এবং আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্কের প্রকৃতি কেমন হওয়া উচিত তারই সারসংক্ষেপ উল্লেখিত হয়েছে হাদিসটিতে।

হাদিসটি আমাদের সামনে কঠিন কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করে। সেগুলি হলো-

১। আমাদের বাস্তব জীবনের উপর কুরআনের কি প্রভাব রয়েছে?

২। আমরা কি কুরআনের জন্য পর্যাপ্ত সময় ব্যয় করি?

৩। কিভাবে আমরা কিতাবুল্লাহর সাথে আরও গভীর সম্পর্ক গড়তে পারি?

৪। আমরা নিজেদের সুবিধামত কুরআন পড়ি, নিজেদের মত করে বুঝি এবং কিছু কিছু অংশ মুখস্ত করি। কিন্তু এগুলো কী আমাদের জীবনে আদৌ কোনো প্রভাব ফেলছে?

সূরা হুদ সংক্রান্ত হাদিস 

যখন আমরা কুরআনের সাথে নিজেদের সম্পর্কের কথা বিবেচনা করব আর তা রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের কুরআনের সাথে সম্পর্কের সাথে তুলনা করব, তখন দুইয়ের মধ্যে আকাশ-পাতাল বৈপরীত্য দেখতে পাব। কিছু বর্ণনা এমন পাওয়া যায় যা থেকে বোঝা যায় যে, কুরআন এই প্রবন্ধের উদ্দিষ্ট পাঠকদের তুলনায় কত ব্যাপক পরিসরে নবীজী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনে পরিবর্তন এনেছিল। এই পরিবর্তন শুধুমাত্র চারিত্রিক এবং আধ্যাত্মিকতারই ছিল না, বরং শারীরিক পরিবর্তনও এনেছিল!

হাদিসে এসেছে, একদিন আবু বকর(রাযিঃ) নবীজী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট আসলেন এবং বললেন যে, তাকে বৃদ্ধ দেখাচ্ছে। হাদিসে উল্লেখিত শব্দটি ছিল ‘শাইব’ যা এমন অবস্থাকে বোঝায় যখন কারও চুল ধূসর ও সাদা হয়ে যায়। এই বর্ণনা থেকে সাহাবীদের ভেতরের অবস্থা বোঝা যায় যে, তারা কিভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সূক্ষ থেকে সূক্ষ বিষয়ের দিকেও নজর রাখতেন। সাহাবীরা শুধুমাত্র নবীজীর কথা এবং কাজকেই আত্মস্থ করেননি, বরং তারা তার সূক্ষাতিসূক্ষ পরিবর্তনের দিকেও নজর রেখেছেন। এই পর্যবেক্ষণের আশ্চর্যজনক দিক হলো, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মৃত্যুর সময় তাঁর ২০টির অধিক চুল ও দাঁড়ি পাকা ছিল না। অথচ এই সামান্য কয়টি সাদা চুলও সাহাবীদের নজর এড়াতে পারেনি।

দায়িত্বভারে ন্যুব্জ 

আরেকটি আকর্ষণীয় বিষয় হল, আবু বকর(রাযিঃ)-এর এই কথাটি ছিল খুবই সাধারণ একটি উক্তি। আমরা এ ধরণের কথা প্রায়ই আমাদের পরিবার-পরিজন ও বন্ধু বান্ধবদের বলে থাকি, বিশেষত দীর্ঘদিন পর সাক্ষাত হলে। উত্তরে সাধারণত সে জবাব দিবে যে, কি কারণে তাদেরকে বুড়ো কিংবা ভিন্নরকম দেখাচ্ছে। হয়ত সে কাজের চাপে জর্জরিত, কিংবা তার শারীরিক কোনো সমস্যা হয়েছে কিংবা স্ত্রী-সন্তানদের কারণে তার উপর ধকল যাচ্ছে ইত্যাদি।

কিন্তু নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জবাব এমনটি ছিল না। আমরা যদি নিষ্ঠার সাথে চিন্তা করি, তাহলে দেখতে পাব যে, তার জীবনে কত ধরণের চাপ ছিল। তিনি ছিলেন একাধারে একজন রাসূল, স্বামী, পিতা, ইমাম, এবং সেনাপতি। অর্থাৎ, সবকিছুর দায়ভার তার উপরেই ন্যস্ত ছিল। তাকে জুমার দিন খুতবা দিতে হত, সালাতের ইমামতি করতে হত, লোকজনের নানবিধ বাক-বিতন্ডার সমাধা করতে হত। এরপরও তিনি যখন ঘরে ফিরে আসতেন তখন নিজ পরিবারের ভরণপোষণ করতেন, নাতিদের সাথে খেলাধুলা করতেন এবং নিজ স্ত্রীদেরকে মনোরঞ্জন দিতেন। তিনি বৃদ্ধ ও অসুস্থদের দেখতে যেতেন, সাহাবীদেরকে সময় দিতেন, দরিদ্রদের খাবার খাওয়াতেন। এরপর তাকে কুরাইশ এবং অন্যান্য শত্রুদের মোকাবেলায় নিজের বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিতে হত, সেসময়কার রাজনৈতিক বিষয়গুলো সামলানো সহ আরো অগণিত কাজ করতে তাঁকে হত।

কিন্তু এতকিছুর কোনোটিই তিনি তাঁর বৃদ্ধ হয়ে যাবার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেননি। বরং তিনি জবাব দিলেন, “সূরা হুদ এবং তার অনুরূপ সূরাগুলো আমাকে বুড়ো বানিয়ে দিয়েছে।” আরেকটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, তিনি সবগুলো সূরার নাম উল্লেখ করে বলেছেন, “সূরা হুদ, ওয়াকিয়া, নাবা এবং তাকাছুর আমাকে বুড়ো বানিয়ে দিয়েছে।”

সূরা হুদ সংক্রান্ত হাদিস থেকে আমরা যে শিক্ষাগুলো পাই সেগুলি হল

প্রথমত, এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, কুরআনের সাথে নবীজী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সম্পর্ক কেমন ছিল। তিনি যখন উপোরোল্লিখিত সূরাগুলো পড়তেন যার মধ্যে পূর্ববর্তী জাতিদের ওপর আপতিত শাস্তি, বিচার দিবস এবং জাহান্নামের বর্ণনা রয়েছে, তখন তিনি সেই আয়াতগুলোকে অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করতেন এবং নিজেকে সেই জায়গায় নিয়ে কল্পনা করতেন।

দ্বিতীয়ত, কুরআনের সাথে আমাদের ভাসা ভাসা সম্পর্ক হলে চলবে না। কুরআনের সাথে আমাদের সম্পর্ক কেবলমাত্র একটি অনুপ্রেরণামূলক বয়ান কিংবা সুন্দর তেলাওয়াত শোনাতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবেনা। কুরআনের দাবি এই যে, আমরা এর বাণীকে অন্তরে ধারণ করব এবং সর্বত্র তা বাস্তবায়ন করব। এজন্য দরকার কঠোর পরিশ্রম, আত্মনিয়োগ এবং অধ্যবসায়।

তৃতীয়ত, বিষয়টি এমন মনে হচ্ছে যেন এক একটা প্রজন্ম পার হচ্ছে আর আমরা ধীরে ধীরে কুরআন থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। আমাদের সমাজের ভবিষ্যত নির্ধারণের জন্য বর্তমানের শিশু ও তরুণদের সাথে কুরআনের সাথে সুদৃঢ় বন্ধন তৈরি হওয়া অতীব জরুরী। তা অর্জন করা আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব।

আমরা যদি আমাদের মানসিকতা না পাল্টায়, তবে আমরা এমন এক ঝুঁকিতে পড়ব যেখানে কুরআন আমাদের কাছে একটি শুধুমাত্র কিতাব হয়ে যাবে যাকে আমরা সম্মান করব ও ভালোবাসব, কিন্তু যার কথাগুলো আমরা বুঝব না। এর শিক্ষা, শব্দাবলি এবং আয়াতগুলো আমাদের কাছে রহস্যময়ই থেকে যাবে, এর রত্ন ও মনি-মুক্তাগুলো এর ভেতরেই থেকে যাবে এবং এর কল্যাণ থেকে আমরা বঞ্চিত থেকে যাব।