সৃষ্টি সম্পর্কে কুরআন আমাদেরকে কী শিক্ষা দেয়?

dancing-rain-in-the-autumn-_KPuV9qSSlU-unsplash
Fotoğraf: Dancin Rain in the Autumn-Unsplash

একটি গভীর প্রশ্ন রয়েছে, যা আমাদের প্রত্যেকের জীবনের কোনো না কোনো সময় অন্তরে জাগ্রত হয়।

“আমি কেন পৃথিবীতে আছি, এখানে আমার উদ্দেশ্য কী?”

কুরআন আমাদের উত্স সম্পর্কে একটি সহজ কিন্তু শক্তিশালী যুক্তি উপস্থাপন করেঃ

তারা কি আপনা থেকেই সৃষ্টি হয়ে গেছে, নাকি তারা নিজেরাই নিজেদের সৃষ্টিকর্তা?” (আল কুরআন-৫২:৩৫)

এটি কুরআনের একটি অনন্য বর্ণনাভঙ্গী। কুরআন আমাদেরকে প্রশ্ন করে প্রশ্নের উত্তর সহজে পেতে সাহায্য করে। মানুষ যেহেতু নিজেকে নিজে সৃষ্টি করেনি তাই স্বাভাবিক ভাবেই এটি স্বীকার করতে হবে যে, তার একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন। আর সমগ্র কুরআন জুড়েই এই সৃষ্টিকর্তার পরিচয় মানুষের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। তার ইবাদতের গুরুত্ব মানুষকে বোঝানো হয়েছে।

দুনিয়াতে মানুষের আগমন ও জীবনযাপনের লক্ষ একটাই। আর তা হল, আল্লাহর বিধি-বিধানের বাস্তবায়ন তথা তাঁর ইবাদত-বন্দেগি করা। এটাই বিভিন্ন ভাবে আল্লাহ আমাদেরকে বুঝিয়েছেন। আল্লাহ তা’আলা কুরআনে মানুষ সৃষ্টির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সুষ্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরে বলেছেন, “আমি জিন ও মানবজাতিকে শুধুমাত্র আমার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি।” (আল কুরআন ৫১:৫৬)

এই আয়াতে উঠে এসেছে মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও ইবাদতের গুরুত্ব। সুতরাং, মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্যই হলো আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি করা। আর ইবাদত বলা হয় আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশিত পথে জীবন পরিচালনা করাকে। আল্লাহ নির্দেশিত পথে জীবন পরিচালনা করলে মানুষ তার সৃষ্টির উদ্দেশ্য পূরণ করল। আর মানুষ যখন কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশ পালন করে ইবাদত করতে ব্যর্থ হয় তখন বুঝতে হবে দুনিয়াতে তার সৃষ্টির উদ্দেশ্য পূরণে সে ব্যর্থ হল।

ইবাদতের অর্থ

ইবাদত অর্থ হলো- আল্লাহর গোলামি বা বন্দেগি করা। আর দুনিয়াতে যে ব্যক্তি আল্লাহর গোলামি করবে, সেই প্রকৃত সফলকাম।

ইবাদত সম্পর্কে মানুষের কিছু ভুল ধারণা

মানুষ মনে করে কুরআনের নির্দেশ পালন করে সালাত আদায় করা, সিয়াম ও হজ্জ্ব পালন করা, জাকাত দেওয়া, তাসবিহ-তাহলিল, যিকির-আযকার, কুরআন তেলাওয়াত করার নামই ইবাদত। কিন্তু মিথ্যা বলা, সুদ-ঘুষে জড়িত থাকা, লোক দেখানো ইবাদত করা, বেহায়ানাপনা, চোগলখুরি, হিংসা-বিদ্বেষ ও মুনাফেকির মধ্যে লিপ্ত থেকেও শুধুমাত্র নামাজ রোজার মতো কিছু আমল করার নামই মনে হয় ইবাদত। না, ইবাদত শুধু এতটুকুতে সীমাবদ্ধ নয়।

কুরআন সুন্নাহর নিষেধগুলো পরিত্যাগ করে আদেশ পালন করাই হলো ইবাদত তথা বন্দেগি। কারণ ইবাদত হলো আল্লাহর হুকুম-আহকাম যথাযথভাবে পালন করা। এ কারণেই আল্লাহ তা’আলা কুরআনে নির্দেশ প্রদান করেছেন- “রাসুল তোমাদেরকে যা দেন তা গ্রহণ করো এবং যা থেকে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তিদানের ব্যাপারে কঠোর” (আল কুরআন ৫৯:৭)

সুতরাং, মনের রাখতে হবে, যে ব্যক্তি নামাজ পড়ে এবং মিথ্যাও বলে; যাকাত দেয় আবার সুদও গ্রহণ করে; হজ্জ্ব করে আবার বেহায়াপনায়ও লিপ্ত থাকে, সিয়াম পালন করে আবার ঘুষও খায়। সে ব্যক্তির নামাজ, রোজা, হজ্জ্ব ও যাকাতসহ ইত্যাদি ইবাদত আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য হয় না। আর এরূপ ত্রুটিপূর্ণ ইবাদতের জন্য তাকে সৃষ্টিও করা হয়নি।

মানুষ সৃষ্টির মৌলিক উদ্দেশ্য মূলত তিনটি 

মানুষ হিসেবে পৃথিবীতে আগমনের কারণে যেভাবে ইবাদত তথা সৃষ্টির উদ্দেশ্য সফল হবে তা হলো- প্রথমত আল্লাহ তা’আলাকে রব হিসেবে মেনে নেওয়া এবং তাঁর দাসত্বকে পুরোপুরি স্বীকার করা। দ্বিতীয়ত, আল্লাহ তা’আলার নির্দেশ মেনে তাঁর পরিপূর্ণ আনুগত্য স্বীকার করা এবং তৃতীয়ত, সর্ব বিষয়ে আল্লাহ তা’আলার সম্মান ও সম্ভ্রম রক্ষা করা অর্থাৎ আল্লাহ তাআলাকে রব বলে স্বীকার করা; অন্য কাউকে তাঁর সাথে শরীক না করা।

আল্লাহর সকল হুকুম-আহকাম তথা হালালকে হালাল আর হারামকে হারাম বলে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মেনে নেওয়া। শুধুমাত্র আল্লাহর সম্মান ও সম্ভ্রমের প্রতি লক্ষ্য রেখে শুধুমাত্র তাঁর সামনে মাথা নত করা বা সিজদা করা।

পরিশেষে বলা যায়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যাবতীয় কাজ-কর্মে আল্লাহর হুকুম আহকাম মেনে চলাই হলো মানব সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য। আর তার হুকুম-আহকাম পালনের নামই হলো ইবাদত। কুরআনে পাকের ঘোষণাও এ রকমই।

আল্লাহর দরবারে আমাদের একটাই আবেদন, “হে আল্লাহ! আপনাকে রব বলে স্বীকার করে, আপনার হুকুম-আহকাম যথাযথ মেনে মানুষ সৃষ্টির যথাযথ হক আদায় করে শুধুমাত্র আপনার সম্মানে সিজদায় মাথা নত করার তৌফিক দান করুন। ইসলামের সকল বিধান পরিপূর্ণ পালনে সকল মুসলিমকে কবুল করুন এবং সর্বোপরি দুনিয়ার সকল মানুষকে কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক আপনার দাসত্ব বা গোলামি করার জন্য কবুল করুন। আমিন।”