সেলফি-আসক্তি কি এক ধরনের একাকিত্বের লক্ষণ?

Selfie

মানুষের মন চিরকালই আত্মপ্রচারমুখী। এই সেলফি তাদেরকে প্রচারের আলোয় নিয়ে আসে। শুধু তাই নয় মানুষ তার রোজকার জীবনচর্চাও তার পরিচিতদের সঙ্গে শেয়ার করে করে এই সেলফির মাধ্যমে। আবার যেসকল মানুষ সারাদিন কর্মব্যস্ত থাকার দরুন পরিচিতদের সঙ্গে অবসর যাপনের সময় পাননা, তারাও এর মাধ্যমে নিজেকে প্রচার করে আত্মসুখ লাভ করেন। বর্তমানে প্রযুক্তিগত উন্নতির সাথে সাথে বিজ্ঞান মানুষকে নিয়ে যাচ্ছে আত্মকেন্দ্রিক জীবনের দিকে। সেলফি বা নিজস্বী বলতে বোঝায়, নিজের ছবি নিজে তোলা। শোনা যাচ্ছে যে নানান রকম সামাজিক মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে তিনশ মিলিয়ন সেলফি দেওয়া হয়। এতে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের সবটুকু বহির্বিশ্বের আঙিনায় এসে পরে, যা অনেক সময় জীবনকে করে তোলে দুর্বিষহ। সেলফি তুলতে তুলতে অদ্ভুত নেশাও পেয়ে বসে। আসক্তির চূড়ান্ত পর্যায় নির্ণীত হয় যখন দেখা যায় তা তুলতে গিয়ে বিপদসংকুল স্থানে মানুষ মারা যাচ্ছে।

সেলফি একটি মারণ রোগ একথা সম্পূর্ণভাবে মেনে নেওয়া যায় না। আধুনিক যন্ত্রসভ্যতায় মানুষ অনেকক্ষেত্রেই একা। নিজের ছবিটুকু তোলার জন্য অন্য কারোর উপর নির্ভর করা সম্ভব নয় সব সময়। সেলফি নিজের ছবি তোলার জন্য অন্য কারোর উপর নির্ভরতাকে একেবারে নস্যাৎ করে দেয়। সেলফি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় দিয়ে তা থেকে পাওয়া বাহবা মানুষের মনে তৃপ্তির অনুভূতি নিয়ে আসে। মনোবিদদের মতে, সেলফির মাধ্যমে মানুষ নিজের মানষিক ক্ষতির সাথে সাথে শারিরীক ভাবেও ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ক্যামেরার তীব্র ফ্ল্যাশ মুখে নিয়ে আসে বলিরেখা ও অকালবার্ধক্যের ছাপ। মনোবিদরা বলেন, মানুষের আত্মকেন্দ্রিকতার চরম উদাহরণ হলো সেলফির প্রতি আসক্তি। সেলফির মাধ্যমে আত্মপ্রচার করে যখন কোনো ব্যক্তি, সে আসলে পরিচয় দেয় তার একাকিত্বের। এই সীমাবদ্ধ জনশূন্য জীবন ক্রমশ মানুষকে ঠেলে দেয় অবসাদে। সেলফি-পূর্ববর্তি সময়ে ছবি তোলার জন্য প্রয়োজন হত দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তির, একাকিত্ব ও সীমাবদ্ধতা দুই প্রাচীরকেই লঙ্ঘন করতে পারত, কিন্তু তা বর্তমানে নেহাতই অপ্রচলিত। নিজের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ করে রাখায় অনেক সময়ই অপরাধের ছায়া নেমে আসার সম্ভবনা থাকে সুস্থ জীবনে। এবং তারা যেহেতু বহির্বিশ্বের থেকে নিজেকে আলাদা করে রেখে দেয়, ফলে তাদের সম্বন্ধে জানাও কঠিন হয় পড়ে।

প্রযুক্তিগত উন্নতির কারণে মানুষ হয়ে উঠেছে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। মানুষ নিজেকে বদ্ধ করে রাখার ফলে সে যে কতটা একা অনেক সময়ই সেলফি সেই বাস্তবতার প্রকাশ ঘটায়। তার আত্মকেন্দ্রিকতার ব্যথা প্রকাশ পায় এর মাধ্যমে। এই সেলফির মাধ্যমেই বর্তমান যুগের ছেলেমেয়েরা অন্যের কাছে নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করে ও আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর চেষ্টা করে। তা করতে গিয়ে নিজের বিপদও ডেকে আনে অনেক সময়। আত্মকেন্দ্রিক জীবনকে তুলে ধরতে গিয়ে অনেক সময়ই অন্য কারও লালসার শিকার হয়ে পড়ে অনেকে। আত্মকেন্দ্রিকতার অর্থ নিজের প্রতি নিজের প্রেম। অর্থাৎ কেউ নিজের জীবনে এতটাই মগ্ন যে বাইরের পৃথিবী বা সমাজ থেকে একেবারে বিচ্যূত হয়ে নিজের পৃথিবীর বাসিন্দা হয়ে গেছে তারা। কখনও সে তার একেবারে ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ছবি দিয়ে ডেকে আনছে চরম হতাশা ও সামাজিক লাঞ্ছনাও। আবার এই ভার্চুয়াল দুনিয়ার উপর নির্ভরতা সৃষ্টি করে অন্যরকমের চাহিদা যেমন, নেটিজেনদের অনেকেই নিজের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বিচারের মানদন্ড করে নেয়, তার পোস্টে আসা কমেন্ট ও রিয়্যাক্টে। সেই অবস্থান থেকে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে হতাশা গ্রাস করে তাদের। অনেকের সাথে ভাগ করে দুঃখ কমে ও আনন্দ বাড়ে, একথা আমাদের অজানা নয়। কিন্তু নেট দুনিয়া এই নিয়মের বাইরে চলে, তাই অনেকক্ষেত্রেই হিতেবিপরীত হয়ে যায়। অন্যের মতামতের উপর নিজের তুল্যমূল্য বিচারের এই প্রবৃত্তি, এবং প্রতিনিয়ত বদলাতে থাকা তথাকথিত ‘ট্রেন্ডের’ সাথে এঁটে উঠতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়াও অবিশ্বাস্য নয় আজ।

আত্মকেন্দ্রিকতার চরম পর্যায় এসে গেছে বলেই কোনো মানুষ তার সেলফি social media তে পোস্ট করে তার উপর ফিল্টারের পর ফিল্টার বসিয়ে নিজের শারিরীক বৈশিষ্ট্যকে ঢেকে নিজেকে পছন্দমতো ঐশ্বর্যায় পরিণত করে। এই প্রবৃত্তিকে বাহবা দেওয়ার জন্য তাই বাজারও ছেয়ে গেছে বিউটিফিকেশনের অ্যাপে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, মানুষ নিজেকে কোনো একটি বিশেষ জায়গায় গ্রহণযোগ্য বানাতে, নিজস্ব শারিরীক বৈশিষ্ট্য ও পারিপার্শ্বিককে অস্বীকার করতেও পিছপা হচ্ছে না। তাই একথা বলা ভুল হবে না যে মানুষ দিনের পর দিন ডুবে যাচ্ছে আত্মকেন্দ্রিকতার অতলে, যা পঙ্গু করে দিতে পারে মানবসমাজকে।