শরিয়াহ সম্মত ওয়েব পরিবেশ. আরওসন্ধানকরুন

সৌন্দর্য ত্বরান্বিত করে সুবাসিত সুরভি

সেন্স Tamalika Basu ০৫-ফেব্রু.-২০২০
rose ittar

পৃথিবীর প্রায় সব ধর্মের আচার-অনুষ্ঠানে সুগন্ধি ব্যবহারের রীতি দেখা যায়। এই হিসাবে বলা যায়, ধর্মের ইতিহাসের মতো সুগন্ধির ইতিহাসও অত্যন্ত প্রাচীন। পৃথিবীর প্রাচীনতম ধর্মগ্রন্থগুলোর বর্ণনায় সুগন্ধি ব্যবহারের কথা জানা যায়। চার হাজার বছর আগে সুগন্ধি ব্যবহার করত উচ্চ শ্রেণির মানুষ। হিসাব কষে দেখা যায় এখনো সুগন্ধির ব্যবহার বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এত বছর পরেও মানুষের অভ্যাস বা রুচির কিন্তু তেমন পরিবর্তন হয়নি।
সুগন্ধি বা সুরভির প্রতি মানুষের আকর্ষণ সহজাত। আবহমান কাল থেকে মানুষ সুরভির প্রতি তাড়িত। প্রাচীন যুগ থেকে মানুষ প্রাকৃতিক উৎসের মাধ্যমে সুগন্ধি তৈরি করে ব্যবহার করছে। সুগন্ধির প্রতি অনুরাগ নবী-রাসুলদের আদর্শ। সুগন্ধি ও সুরভির ব্যবহার রাসুল (সা.)-এর সুন্নতও বটে। বিভিন্ন উপলক্ষে ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সুগন্ধি-আতর গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আতর-সুরভিকে পবিত্রতার প্রতীক মনে করা হয়।
সুগন্ধি প্রতি প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রচণ্ড অনুরাগ ছিল। মহানবী (সা.) নিজও ছিলেন সুগন্ধির আকর। তিনি রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে গেলে সুগন্ধির ঝরনা বয়ে যেত। লোকেরা বুঝতে পারত, নবী করিম (সা.) এ রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেছেন। পাশাপাশি সুগন্ধি ও আতর রাসুল (সা.)-এর অত্যন্ত প্রিয় ছিল। সুগন্ধিপ্রিয়তা নবী-রাসুলদের আদর্শ। হজরত আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘চারটি বস্তু সব নবীর সুন্নত—আতর, বিয়ে, মেসওয়াক ও লজ্জাস্থান ঢেকে রাখা।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২২৪৭৮)। মহানবী(সা.) সুগন্ধির প্রতি খুবই অনুরাগী ছিলেন। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের দুনিয়া থেকে আমার কাছে তিনটি জিনিস অধিক প্রিয়। নারী, সুগন্ধি আর আমার চক্ষু শীতল হয় নামাজের মাধ্যমে। ’ (নাসায়ি শরিফ, হাদিস : ৩৯৩৯)
ইংরেজিতে পারফিউম, ফারসিতে পাফাম, বাংলায় সুগন্ধি নামে পরিচিত। কবে কোথায় কখন এর উৎপত্তি—এ নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে এর উৎপত্তিস্থল হিসেবে মেসোপটেমিয়ার (বর্তমান ইরাক, কুয়েত ও সৌদি আরব) নামই পাওয়া যায় বেশি। সাইপ্রাসে চার হাজার বছর আগে প্রতিষ্ঠিত সুগন্ধির কারখানার সন্ধানও পাওয়া গেছে। বিশ্বের প্রথম নারী রসায়নবিদ তাপ্পুতির কথা রয়েছে সুগন্ধির বিভিন্ন ইতিহাসে। ইতিহাসে আরো রয়েছে, প্রাচীন মেসোপটেমিয়া ও মিসরে সুগন্ধি তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়। পরে রোমান ও পারসিয়ানরা সুগন্ধি বানানোর প্রক্রিয়া আরো আধুনিক করে তোলে।
কস্তুরী বা মৃগনাভি, আগর এবং ফুল ও ফলের নির্যাস থেকেই তৈরি হয় পৃথিবীর বিখ্যাত সব আতর। নির্যাসের হিসাবে সুগন্ধির নামও ভিন্ন ভিন্ন হয়; যেমন—ফুল থেকে তৈরি সুগন্ধিকে ‘জাহরা’ এবং ফল থেকে তৈরি সুগন্ধিকে ‘ফাওয়াকি’ বলা হয়। তবে এর মধ্যে সুগন্ধিরাজ হলো কস্তুরী। পার্বত্য অঞ্চলের বিশেষ এক ধরনের হরিণের নাভি এর উৎস। একটি পরিপক্ব মৃগনাভি থেকে মাত্র ৬০ থেকে ৬৫ গ্রাম কস্তুরী পাওয়া যায়।
মিশ্রণ ভেদে কস্তুরীর নামও ভিন্ন হয় তখন; যেমন—সামমাতুল আম্বার, মেশক আম্বার ইত্যাদি। কস্তুরীর সঙ্গে চন্দন মেশালে হয় ‘সামামাতুল আম্বার’ আর সামামাতুল আম্বারের সঙ্গে আবার চন্দন মিশিয়ে হয় মেশক আম্বার। এরপর বলি আগরের কথা। পাহাড়ি গামারি ধরনের গাছ হচ্ছে আগর। আগরগাছের কষ থেকেই তৈরি হয় আতর। এক ধরনের দূর্বাজাতীয় ঘাসের মোথা ও শিকড়ের নির্যাস থেকেও তৈরি হয় সুগন্ধি।
সুগন্ধযুক্ত সব ফুলের নির্যাস থেকেই আতর হয়। এর মধ্যে গোলাপ ও রজনীগন্ধার চাহিদাই বেশি। গোলাপের আতরের জন্য বিখ্যাত বুলগেরিয়া। দ্বিতীয় স্থানে তুরস্ক। তার পরই ভারত। আবার বিভিন্ন ফুলের মিশেলেও আতর তৈরি হয়; যেমন—‘আলফ জাহরা ‘।
মিসরীয় ফারাও রাজারা যে কি পরিমাণ সুগন্ধি ব্যবহার করতেন তার একটি জাজ্বল্যমান প্রমাণ মেলে ফারাও রাজা তুতানখামুনের মমি আবিষ্কারের সময়। তুতানখামুন জন্মেছিলেন খ্রিস্টপূর্ব ১৩২৩ অব্দে। ১৯২২ সালে ব্রিটিশ পুরাতাত্ত্বিক হাওয়ার্ড কার্টার পিরামিডের ভিতর যখন তুতানখামুনের সমাধিস্থল আবিষ্কার করেন তখন সেখানে স্বাভাবিকভাবেই সোনা, রুপা, হিরা, জহরতসহ পাওয়া যায় অনেক মূল্যবান বস্তু। তবে লোকজন সবচেয়ে বেশি আশ্চর্যান্বিত হন এটা দেখে যে, তখনো তীব্র ও ঝাঁজালো সুগন্ধ বের হচ্ছিল মমিটির শরীর থেকে। চিন্তা করেই অবাক হতে হয় কী পরিমাণ অমূল্য ও ব্যতিক্রমী সুগন্ধি ঢালা হয়েছিল মমিটার শরীরে, যে তিন হাজার বছর পরও এর সৌরভ এতটুকু ক্ষুণ হয়নি। ফারাও যুগে সুগন্ধি অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহার হতো মোমের মাধ্যমে। সুগন্ধি ফুল, লতাপাতার নির্ঝাস মোমের মধ্যে মিশিয়ে তা শরীরে মাখা হতো। পিরামিডে আঁকা চিত্র দেখে ধারণা করা যায় যে ফারাও রাজা ও রানীরা এক ধরনের মোম মাথায় সেঁটে রাখতেন। প্রচণ্ড রোদের তাপে মোম গলে সমস্ত শরীরের কোষে কোষে সেই সুগন্ধ ছড়িয়ে দিত। তবে ফারাও রাজা-রানীদের মধ্যে কুইন ক্লিওপেট্রা বোধকরি ছিলেন খোশবাইয়ের সবচেয়ে বড় সমঝদার। তিনি তার ব্যক্তিগত সৌগন্ধিকদের নির্দেশ দেন একেক সময় একেক রকম সুগন্ধি তৈরি না করে উৎকৃষ্ট ধরনের একটি নির্দিষ্ট সেন্ট পুনরায় তৈরি করতে।
ফকিহ বা ইসলামী আইনজ্ঞরা বলেন, অ্যালকোহলযুক্ত যেসব সুগন্ধি বা পারফিউম পাওয়া যায়, তা ব্যবহার না করাই উত্তম ও শ্রেয়। পারফিউম বা স্প্রে ব্যবহার করতে চাইলে অ্যালকোহলমুক্তটাই ব্যবহার করা চাই। তবে এটাও ঠিক, সব অ্যালকোহল ইসলামী শরিয়তে নিষিদ্ধ নয়। যেসব অ্যালকোহলের উৎস সম্পর্কে শরিয়তের নিষেধাজ্ঞা নেই তা ব্যবহার করা বৈধ। বর্তমান বিশ্বের অন্যতম মুসলিম স্কলার মুফতি তাকি উসমানি লিখেছেন, ‘বর্তমা নে বিশ্বে বিভিন্ন উদ্দেশ্যে অ্যালকোহল ব্যবহার করা হচ্ছে। বিভিন্ন ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। রাসায়নিক বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। বহু শিল্প-কারখানা অ্যালকোহলের ব্যবহার করা ছাড়া চালানো সম্ভব নয়। এককথায় বর্তমান সময়ে বহু মানুষ এর সঙ্গে জড়িত এবং এর প্রচণ্ড প্রয়োজনয়ীতা রয়েছে। এখন আমাদের দেখার বিষয়, যদি এসব অ্যালকোহল আঙুরের কাঁচা রস থেকে তৈরি না হয়, তাহলে তা বৈধ কাজে ব্যবহার করা ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে বৈধ।
তবে, আমরা যেহেতু সুনির্দিষ্টভাবে জানি না সুগন্ধিতে ব্যবহৃত অ্যালকোহল কোন জিনিস দিয়ে তৈরি, তাই তাকওয়ার (আল্লাহভীতি) দাবি হলো, সতর্কতা মূলক অ্যালকোহলযুক্ত সুগন্ধি ও বডি স্প্রে পরিহার করা।
উল্লেখ্য, যদি কোনো অ্যালকোহলের ব্যাপারে প্রমাণিত হয় যে তা আঙুর ও খেজুর থেকে তৈরি, তাহলে তা ব্যবহার করা যাবে না। অন্যদিকে সেন্ট, পারফিউম ও বডি স্প্রে ইত্যাদিতে কোনো ধরনের নাপাক বস্তু মিশ্রিত থাকলে তা ব্যবহার করা নাজায়েজ। (তুহফাতুল আহওয়াজি : ৮/৭১)