স্কুলে-কলেজে-অফিসে মশকরা, হেনস্থার শিকার? এই দুরবস্থা থেকে মুক্তির উপায় কী?

office pressure

মানসিক নির্যাতন বা বুলি (bully)-র শিকার ছেলেমেয়ে কিংবা ব্যক্তির জীবন যে কতটা যন্ত্রণাময় এবং কষ্টকর- সেই বিষয়ে অনেকেরই কোনও ধারণা নেই। যাঁরা প্রতিনিয়ত এই যন্ত্রণা সহ্য করছেন তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর মতো ছোট্ট একটা আশ্বাস বা একটু আশার আলোই তাঁদের জীবন বদলে দিতে পারে। এই লেখার মাধ্যমে আমরা সেই আশার আলো দেখানোর চেষ্টাই করব।

আমাদের একটা কথা সর্বদা মাথায় রাখতে হবে যে, আল্লাহের দেওয়া এই জীবন খুবই ছোট। খুবই অল্প সময়ের জন্য আমরা এই পৃথিবীতে থাকি। তাই এই সময়ে আমাদের নিজেদের আচরণ সম্পর্কে সংযত থাকা উচিত। এমন কোনও কাজ করা উচিত নয় কিংবা এমন কোনও কথা বলা উচিত নয়, যা অপর কোনও ব্যক্তির মনোকষ্টের কারণ হয়ে ওঠে। 

দুর্বলের উপর দলবদ্ধ আক্রমণ

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনও একজন-কে নিয়ে অনেকে দলবদ্ধ ভাবে মশকরা করে, যা সেই ব্যক্তিকে মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। এই ধরনের দলবদ্ধ আক্রমণের ক্ষেত্রে, একজন বিশেষ ব্যক্তি থাকে যে মূলত এই ধরনের মানসিক নির্যাতন করতে পছন্দ করে। তাকে এই ধরনের দলের নেতা বলা যেতে পারে। সেই দলের বাকি সদস্যরা, ওই নেতার কথায় অন্ধ ভাবে সায় দিতে থাকে। ফলে সেই দলনেতা ওই দুর্বল ব্যক্তিকে নিজের শিকার ভাবতে শুরু করে, এবং তাঁকে নানা ভাবে শায়েস্তা করে নিজেকে বড় বা উন্নত প্রমাণ করার অকারণ চেষ্টা করতে থাকে। এখানে সবার আগে বুঝতে হবে, কাউকে যখন বুলি করার জন্য বেছে নেওয়া হয় তখন সেই ব্যক্তি নয় বরং তাঁর দুর্বলতাকে মশকরার বিষয় হিসেবে নির্বাচন করা হয়। 

এখানে দুর্বলতার অর্থ শুধুই শারীরিক ভাবে দুর্বল হওয়া কিংবা দেখতে সুন্দর না হওয়া নয়। যে কোনও ধরনের দুর্বলতা- যেমন, আর্থিক সমস্যা, পারিবারিক কোনও সমস্যা, নিজের দেশ থেকে উচ্ছেদ হয়ে আসলে উদ্বাস্তু হওয়ার ক্লেশ, ধর্মীয় ভাবাবেগ বা অন্য যে কোনও ধরনের বিষয়কে এই ধরনের লোকেরা হেনস্থা করার বিষয় হিসেবে বেছে নিতে পারে।          

এই দলনেতারা সাধারণত নিজেদের কোনও দুর্বলতা ঢাকতে মূলত এই ধরনের আচরণ করে। কিন্তু অবাক লাগে, যখন বাকি সদস্যরা অন্ধ ভাবে সেই নেতাকে অনুকরণ করে। কেন তাঁরা এই ধরনের ঘটনায় অন্ধ অনুকরণ করে ? তারাও কি নিজেদের উন্নত প্রমাণ করার জন্য একজন দুর্বল ব্যক্তির অসহায়তার সুযোগ নিয়ে তাকে মানসিক নির্যাতন করে?

লজ্জিত না হয়ে রুখে দাঁড়ান

এই প্রসঙ্গে ইমাল আলীর প্রদান করা একটি উদাহরণের কথা বলতে হয়। তিনি বলেছিলেন, আল্লাহ তাঁর ফেরেশতাদের কামনা ব্যতীত শুধুমাত্র জ্ঞান প্রদান করেছিলেন, এরপরে তিনি প্রাণীদের শুধুমাত্র কামনা প্রদান করেছিলেন কিন্তু জ্ঞান প্রদান করেননি। কিন্তু আদমের সন্তানদের তিনি কামনা ও জ্ঞান- উভয় প্রদান করেছিলেন। এই কারণেই, যখন কোনও মানুষ তাঁর কামনাকে জয় করে শুধুমাত্র জ্ঞানের বিকাশে মনোনিবেশ করেন- তখন তাঁকে ফেরেশতাদের চেয়েও উন্নত বলে ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু যখন কোনও মানুষের কামনা তাঁর জ্ঞানকে পরাভূত করে ফেলে, তখন সেই মানুষ প্রাণীর চেয়েও অধমে পরিণত হয়।  

যে ধরনের ব্যক্তিরা বুলি বা মানসিক নির্যাতন করে, তারা মূলত অন্যকে হেনস্থা করার মাধ্যমে নিজেকে উন্নত প্রতিপন্ন করার কিংবা দুর্বলের উপরে নিজের ক্ষমতা জাহির করার কামনাকে চরিতার্থ করে। 

যখনই বুঝবেন, আপনার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কেউ বা কয়েক জন মিলে আপনাকে অকারণ হেনস্থা করার চেষ্টা করছে, তখনই রুখে দাঁড়ান। মানসিক অত্যাচার শারীরিক অত্যাচারের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ভয়ঙ্কর। কারণ এর আঘাত দৃশ্যমান হয় না, কিন্তু এর আঁচড় মনকে অনেক বেশি পীড়া দেয়। তাই এই ধরনের আঘাত পেলে কুঁকড়ে যাওয়ার বদলে রুখে দাঁড়াতে হবে। এর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আত্মবিশ্বাসের। আপনার যে দুর্বলতা নিয়ে মশকরা কিংবা হেনস্থা করার চেষ্টা করা হচ্ছে, সেটি নিয়ে লজ্জিত হওয়া বন্ধ করুন।

পৃথিবীতে কেউ নিখুঁত নয়, কেউ সমস্যার ঊর্ধ্বে নয়। আপনি নিজের দুর্বলতা কিংবা সমস্যা নিয়ে যত বেশি লজ্জিত হবেন, তত বেশি এই ধরনের বিকারগ্রস্তদের মানসিক উৎপীড়নের জালে জড়িয়ে পড়বেন। নিজের বিশ্বাসকে ভেঙে যেতে দেবেন না। দেখবেন, এই ধরনের লোকজন যখন দেখবে, তাদের কথা আপনাকে আঘাত করতে পারছে না, তারা কোনও ভাবেই হেনস্থা করে আপনার আত্মবিশ্বাস ভাঙতে পারছে না- তখন এরা আপনাকে আর নিজেদের শিকার বলে মনে করবে না। কারণ এরা নিজেদের উন্নত প্রতিপন্ন করার কামনাকে চরিতার্থ করতে চায়। আপনি নিজেই যদি এদের কথায় আত্মবিশ্বাস হারিয়ে এদের কথা বিশ্বাস করতে শুরু করেন, সেখানেই এদের উদ্দেশ্য সফল হয়ে যায়। কিন্তু যদি আপনি তা না করেন, তখন এদের উদ্দেশ্য কোনও ভাবেই সফল হবে না।