SalamWebToday নিউজলেটার
Sign up to get weekly SalamWebToday articles!
আমরা দুঃখিত কোনো কারণে ত্রুটি দেখা গিয়েছে:
সম্মতি জানানোর অর্থ, আপনি Salamweb-এর শর্তাবলী এবং গোপনীয়তার নীতি মেনে নিচ্ছেন
নিউজলেটার শিল্প

স্ট্রোকের আগাম লক্ষণ কী কী?

শারীরিক স্বাস্থ্য ০৯ ফেব্রু. ২০২১
জানা-অজানা
স্ট্রোকের

কলেজের সেমিনারে লেকচার দিচ্ছিলেন অধ্যাপক খান। আচমকাই দেখলেন, বোর্ডে ডায়াগ্রাম আঁকতে গিয়ে কিছুতেই মার্কার পেনটা ভাল করে ধরতে পারছেন না, হাতে যেন সাড় নেই। সেটি উপেক্ষা করে ডায়াসে দাঁড়িয়ে লেকচার দিতে লাগলেন তিনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই জড়িয়ে যেতে লাগল কথা, বেঁকে গেল মুখের একদিক। বিপদ বুঝে তড়িঘড়ি যখন ছাত্রছাত্রী আর সহকর্মীদের সহায়তায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল, জানা গেল স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন অধ্যাপক খান। ডাক্তারদের তৎপরতায় সে যাত্রা প্রাণে বাঁচলেও চিরকালের মতো প্যারালাইসিস হয়ে গেল তাঁর বাঁদিকটায়। বোঝা সহজ না হলেও স্ট্রোকের মতো প্রাণঘাতী অসুখকে আগাম চেনার ক্ষেত্রে বেশ কিছু লক্ষণ রয়েছে, যেগুলির দিকে খেয়াল রাখলে স্ট্রোকে প্যারালাইসিস বা প্রাণহানিকে রুখে দেওয়া সম্ভব। আজ আমরা সেগুলি নিয়ে আলোচনা করব।

স্ট্রোকের সংজ্ঞা ?

স্ট্রোক আর হার্ট অ্যাটাককে অনেকেই গুলিয়ে ফেলেন। হৃদপিণ্ডে কোনও কারণে রক্ত চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হলে হার্ট অ্যাটাক হয়। আর মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে তাকে বলে স্ট্রোক। অক্সিজেনযুক্ত রক্ত যখন ধমনীর সাহায্যে মস্তিষ্কে পৌঁছতে পারে না, তখন মস্তিষ্কের কোষগুলি মারা যেতে শুরু করে। যেহেতু আমাদের সমস্ত দেহের কার্যকলাপ মস্তিষ্ক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, ফলে মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে তা প্রভাব ফেলে গোটা শরীরেই। কখনও-কখনও এর ফলে চিরকালের মতো কোনও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সাড় হারিয়ে ফেলে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে মানুষ, আবার হতে পারে মৃত্যুও।

‘টাইম ইজ ব্রেন’: আগে থেকে বুঝুন স্ট্রোকের লক্ষণ 

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্ট্রোক হানা দেয় নিঃশব্দে। তারপর আমরা যখন তার উপস্থিতি বুঝতে পারি, তখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়া ছাড়া আর কিছু করার থাকে না। অনেকে আবার বুঝতে পারলেও স্ট্রোকের লক্ষণগুলি উপেক্ষা করেন। অন্য কোনও সাধারণ অসুখের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন তাকে। এর জন্য সাধারণভাবে অজ্ঞতাই দায়ী। স্ট্রোক হলে সাধারণভাবে যে আগাম লক্ষণগুলি দেখা যায়, সেগুলি হল–

আচমকা বিভ্রান্তি

স্ট্রোক হলে বেশিরভাগ মানুষই বিভ্রান্তির শিকার হন। ধরুন, কথা বলছেন বা লিখছেন, স্ট্রোক হলে এই কাজগুলি করতে আপনাদের সমস্যা হবে। হাত বা মুখ অসাড় হয়ে যাবে। যাদের স্ট্রোক হয়, তাঁদের কথা জড়িয়ে যায়।

চোখে ঝাপসা দেখা

একটা বা দুটো চোখেই আচমকা ঝাপসা দেখা স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে। হঠাৎ করেই আপনি চোখের দৃষ্টি পুরোপুরি হারিয়ে ফেলতে পারেন, চোখে অন্ধকার দেখতে পারেন বা সামনে থাকা কোনও জিনিস দু’টি করে দেখতে পারেন।

মাথায় ব্যথা

মাথা ব্যথা হলে আমরা বেশিরভাগ সময়েই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া নিজেরা ওষুধ খেয়ে ফেলি। এই মাথাব্যথা কিন্তু স্ট্রোকের আগাম লক্ষণ হতে পারে। এছাড়া কোনও কারণ ছাড়া আচমকা তীব্র মাথাযন্ত্রণা এবং বমি হলে, ঝিমুনি আসলে স্ট্রোক হতে পারে। যদি আপনার সাইনাস বা মাইগ্রেনের সমস্যা থেকে থাকে, তাহলে অবশ্য এই মাথাব্যথার উপসর্গটি আপনার বুঝতে অসুবিধা হতে পারে। ঘনঘন মাথাব্যথা করলে ডাক্তার দেখান।

ব্যালান্স হারিয়ে ফেলা

স্ট্রোক হলে মানুষের একদিক কমজোরি হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে আপনার হাঁটতে বা সেদিকের হাত-পায়ের সাহায্যে কোনও কাজ করতে অসুবিধা হবে। দাঁড়িয়ে থাকলে ব্যালান্স হারিয়ে পড়ে যাওয়াও এক্ষেত্রে বিচিত্র নয়।

এগুলি ছাড়া ক্লান্তি, অবসন্নতা, স্পর্শ বা বাহ্যিক উদ্দীপনার প্রতি অসংবেদনশীলতা, ঢোঁক গিলতে সমস্যা ইত্যাদিও স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে।

স্ট্রোকের লক্ষণগুলি আচমকা যেমন হতে পারে, তেমনই আস্তে-আস্তেও সেই উপসর্গগুলি আপনার দেহে ফুটে উঠতে পারে। বড় স্ট্রোকের আগে আপনার কিছু মিনি স্ট্রোক বা ট্রানসিয়েন্ট ইস্কেমিক অ্যাটাক (টিআইএ) হতে পারে, যা বড় স্ট্রোকের আগাম সম্ভাবনা তৈরি করে। এই টিআইএ-র লক্ষণগুলি তাৎক্ষণিক হয় এবং দ্রুত ঠিকও হয়ে যায়। এক্ষেত্রেও উপরের লক্ষণগুলি আপনি অনুভব করতে পারবেন। এরকম কোনও কিছু হলে সেটি সেরে গেলেও অবজ্ঞা করবেন না, ধমনীর মধ্যে রক্ত জমাট বেঁধে থাকার ফলে এগুলি হয়, তাই ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ খাওয়া জরুরি।

এছাড়া স্ট্রোক হয়েছে কিনা, তা বোঝার ক্ষেত্রে ‘FAST’ নিয়ম মেনে চলা জরুরি।

এই FAST হল- FACE (আক্রান্ত ব্যক্তিকে হাসার চেষ্টা করতে বলুন, মুখ বেঁকে গেলে বুঝবেন স্ট্রোক হয়েছে), ARMS (হাত তুলতে বলুন, হাত তোলার ক্ষেত্রে অসুবিধা স্ট্রোকের লক্ষণ), SPEECH (কথা জড়িয়ে গেলে স্ট্রোক হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায়), TIME (সময় এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। স্ট্রোক হয়েছে বুঝলে তৎক্ষণাৎ অ্যাম্বুলেন্সে ফোন করুন)।

স্ট্রোক হলে গোল্ডেন আওয়ার

স্ট্রোক হলে কী করবেন বা কী করা উচিত, কোন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া উচিত, কোন নম্বরে ফোন করে অ্যাম্বলেন্স ডাকা উচিত, ইত্যাদি ভাবতে-ভাবতেই কেটে যায় সময়। পেরিয়ে যায় স্ট্রোক পরবর্তী সাড়ে চার ঘণ্টার ‘গোল্ডেন আওয়ার’! স্ট্রোকের ক্ষেত্রে একটা কথা প্রচলিত রয়েছে, ‘টাইম ইজ ব্রেন’। এর অর্থ হল, টাকা নয়, স্ট্রোকের চিকিৎসায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল সময়। আর এই সময়ে হাসপাতালে পৌঁছলেই স্ট্রোকের ক্ষেত্রে অর্ধেক সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। সাধারণত মস্তিষ্কে রক্ত না পৌঁছলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই মস্তিষ্কের কোষগুলির মৃত্যু হতে শুরু করে। তাই স্ট্রোক হওয়ার তিন-চার ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসা শুরু করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

স্ট্রোক এড়াতে সুস্থ থাকুন

ওয়র্ল্ড স্ট্রোক অরগানাইজেশনের হিসেব অনুযায়ী, ২৫ বছরের উপর প্রতি চারজনের মধ্যে একজন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। সারা পৃথিবীতে প্রায় ১.৩৭ কোটি মানুষ গতবছর স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন, যার মধ্যে ৫৫ লক্ষ মানুষ মারা গিয়েছেন। ফলে স্ট্রোক এড়াতে সুস্থ থাকা কিন্তু অত্যন্ত জরুরি। ধূমপান, মদ্যপান ছেড়ে দিন। ফাস্টফুড, ভাজাভুজি খাওয়া ত্যাগ করুন। স্বাস্থ্যকর খাওয়াদাওয়ার মাধ্যমে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন। আর প্রতিদিন নিয়ম করে ব্যায়াম করলেই স্ট্রোকের মতো মারণরোগকে দূরে রাখতে সক্ষম হবেন।