স্থাপত্য শিল্পের অনন্য নিদর্শন আবু ধাবির শেখ জায়েদ মসজিদ

যুগ বদলেছে আর তার সঙ্গে পাল্লা  দিয়ে গড়ে উঠছে আরও চমক লাগানো নানা সব সুন্দর স্থাপত্য। পৃথিবীতে নানা ধর্মের  মানুষ বসবাস করে, আর তাদের এই ধর্মকে ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে মন্দির, মসজিদ, গির্জা। দর্শনীয় স্থানের জন্য গীনেজ বুকে বেশ নাম করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। আরবের এই রাজধানীতে গড়ে উঠেছে আবু ধাবির শেখ জায়েদ মসজিদ। যখন এই আরব দেশে ঠান্ডা মরশুম বিরাজ করে, তখন ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন কোন থেকে দলে দলে পর্যটকরা এখানে এসে ভিড় জমায়। ধর্মীয় স্থান শুধু কি স্থাপত্য! শিল্পে এটিকে পাঠশালা হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়। আরো আছে, স্থাপত্য শিল্পের শিক্ষার্থীরা জ্ঞান ও বিদ্যা অর্জন করতে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে এখানে আসে। দুশো বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও শিল্পচর্চার নিদারুণ নমুনা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই মসজিদে। এর ক্যালিওগ্রাফির কথা ভাষায় বোঝানো অসম্ভব, এতটাই সুন্দর যে তুলনাই হয় না।

আকৃতির দিক থেকে পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম মসজিদ আবু ধাবির শেখ জায়েদ মসজিদ। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল-নাহিয়ান এই মসজিদ নির্মাণ করেন। ২০০৪ সালে তিনি ইন্তেকাল করলে তাকে এই মসজিদ প্রাঙ্গণেই দাফন  করা হয়। মসজিদটি তার নামেই নামকরণ করা হয়েছে। শেখ জায়েদ চেয়েছিলেন মসজিদটি সমুদ্রসীমা হতে ১১ মিটার উপরে এবং সড়কসীমা হতে ৯.৫ মিটার উর্ধ্বে নির্মাণ করতে। এতে মসজিদটি আবুধাবীর সব দিক থেকেই দেখা যায়।

১৯৯৬ সাল হতে মসজিদটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। এই বিখ্যাত নির্মাণকর্মে ৩৮ টি প্রখ্যাত ঠিকাদারি কোম্পানির ৩০০০ হাজার দক্ষ কর্মী বাহিনীকে কাজে লাগানো হয়। ওই রকম একটা সময়ে ইতালি, জার্মানি, মরক্কো, পাকিস্তান, ভারত, তুরস্ক, মালয়েশিয়া, ইরান, চীন, যুক্তরাজ্য, নিউজিল্যান্ড, গ্রিস ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সহ অনেক দেশ থেকে কাঁচামাল আরবে আনা হয়। সেই সমস্ত কাঁচামাল দিয়েই নির্মিত করা হয় এই মসজিদ। শেখ জায়েদ মসজিদের এই নকশায় পাকিস্তান, ভারত ও মরক্কের প্রভাব যে কতটা,তা স্পষ্ট রয়েছে। এই মসজিদ নির্মাণে খরচ হয়েছে ৫৪.৫ কোটি মার্কিন ডলার,যার পুরোটাই এসেছে সরকারি কোষাগার থেকে।

মসজিদে যে প্রধান প্রার্থনা কক্ষ আছে সেই ঘরটি ইরানের কার্পেট কোম্পানিল তৈরি যা ইরানী শিল্পী আলী খালিদির ডিজাইনে বিশ্বের বৃহত্তম গালিচা হিসেবে পরিচিত। এই গালিচা ৬০৫৭০ বর্গ ফুট এবং এই কার্পেট এর ওজন ৩৫ টন। নিউজিল্যান্ড এবং ইরানের উল থেকে তৈরি করতে প্রায় দুই বছর সময় লেগেছিল। দিনের বেলা সাদা আলোয়, আর রাতের মায়াবি রূপময়তা যেন লোকজনদের আবেশিত করে। চারিপাশ আলোর রোশনিতে ঝিলমিল করে ওঠে।

মসজিদটিতে ছোট-বড় মিলিয়ে সাত আকারের ৮২টি গম্বুজ আছে, যা পুরোটাই নির্মাণ করা হয়েছে শ্বেত মার্বেল দিয়ে। মসজিদের বৃহত্তম গম্বুজের উচ্চতা ২৭৯ ফুট। তাছাড়া পুরো ডিজাইন এ ইতালি,জার্মানি, মরক্কো, পাকিস্তান, ভারত, তুরস্ক, মালয়েশিয়া, ইরান, চীন, যুক্তরাজ্য, নিউজিল্যান্ড, গ্রিস ও সংযুক্ত আরব সহ এর কারিগর কে কাজে লাগানো হয়েছে।মসজিদটির আঙিনা ১৭ হাজার বর্গমিটার মার্বেল মোজাইকের। এটি পৃথিবীর সর্ববৃহৎ আয়তনের মার্বেল মোজাইক।

স্ফটিক সচ্ছ লক্ষ পাথরের তৈরি পৃথিবীর বৃহত্তম ঝাড়বাতিটির অবস্থান  এই মসজিদে। জার্মানির তৈরি ঝাড়বাতিটির ব্যাস ১০ মিটার (৩৩ ফুট) এবং উচ্চতা ১৫ মিটার (৪৯ ফুট) দ্বিতীয়, তৃতীয় বৃহত্তম ঝাড়বাতি ও এই মসজদেরই শ্রী বাড়াচ্ছে।প্রার্থনা হল ও আঙ্গিনা মিলিয়ে ৪০,০০০ মানুষ নামাজ পড়তে পারে। জুম্মা ও ঈদে সর্বমোট দেড় থেকে দুই লাখ মুসল্লি নামাজ আদায় করেন।হলের ধারন ক্ষমতাও প্রচুর।

নারীদের নামাজ পড়ার জন্য মসজিদে আলাদা ব্যাবস্থা রয়েছে। মসজিদ আঙিনায় অন্য ধর্মাবলম্বী নারীদের প্রবেশে বাধা থাকলেও বোরকা পরে মসজিদের মসজিদের অপরূপ কারুকাজ ও সৌন্দর্য দেখতে যাওয়াতে তাদের আপত্তি নেই । মসজিদটির পাশেই আমিরাতের জনক শেখ জায়েদ বিন আল নাহিয়ানের মাজার। যা দেখতেও পর্যটকরা ভিড় জমায়। প্রতিদিন শত শত প্রবাসী বাংলাদেশিসহ হাজার হাজার পর্যটক তাঁর মাজার জেয়ারত করেন এবং প্রশংসায় মুখর হন।এই মসজিদে এসে তারা বারংবার ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন। চারিপাশে সবুজের সমারোহ মনের সাথে শরীরে আলাদা একটা আমেজ আনে, ওখান থেকে আসতে যেন ইচ্ছেই হয় না। পার্কিং, পানি সমস্ত রকমের ব্যবস্থাও খুব ভালো।