শরিয়াহ সম্মত ওয়েব পরিবেশ. আরওসন্ধানকরুন

স্ফুলিঙ্গ ছোটে আগুনপাখি আবদুল কালামের আদর্শে

বিশ্ব Tamalika Basu ১৬-জানু.-২০২০
Abdul Kalam
Abdul Kalam. Credit: Karthika devi srgm. CC BY

‘‘আমার মৃত্যুতে ছুটি ঘোষণা কোরো না। আমায় যদি ভালবাসো, মন দিয়ে কাজ করো সে দিন।’’

ভারতীয়দের কর্মে বীর ও লক্ষ্যে অবিচল থাকার এই মন্ত্রে আজীবন অনুপ্রাণিত করে গিয়েছেন দেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এপিজে আবদুল কালাম। শুধুমাত্র ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতি কিংবা ভারতীয় প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি খাতের একজন কিংবদন্তীই নন, আব্দুল কালাম ভারতীয় জনতার কাছে একজন সন্তের নাম, যিনি পুরো জীবনটাই ব্যয় করেছেন দেশের উন্নতির জন্য। ভারতীয়দের শিখিয়েছেন স্বপ্ন দেখতে, বিশ্বাস করতে। তার অসামান্য আধ্যাত্মিক চেতনার মাধ্যমে এক সুতোয় গেঁথেছেন নানা ধর্ম, মতে বিভক্ত ভারতীয়দের।

আব্দুল কালাম জন্মেছিলেন মাদ্রাজ রাজ্যের  অন্তর্গত রামেশ্বরমের এক তামিল পরিবারে। ১৫ অক্টোবর ১৯৩১।  পুরো নাম আবুল পাকির জয়নুল-আবেদিন আব্দুল কালাম। তার পিতা জয়নুল আবেদিন প্রথাগত শিক্ষা বা ধন সম্পত্তির দিক থেকে সমৃদ্ধ না থাকলেও সমৃদ্ধ ছিলেন সহজাত প্রজ্ঞা ও হৃদয়ের মহানুভবতার দিক থেকে। আর মা আশিয়াম্মাও ছিলেন তার যোগ্য সহকারী।

বাকি সাত ভাইবোনের জন্য কালামের মা শুধু ভাত রাঁধতেন। কিন্তু ছোট ছেলেটার জন্য করতেন বাড়তি কয়েকটা রুটি। ভোর চারটেয় উঠে পড়তে বসবে ছেলেটা। তখন খিদে পাবে তো। শুধু তা-ই নয়। দিন-আনি-দিন-খাইয়ের সংসারে নামমাত্র পুঁজি থেকে কিনতেন বাড়তি কেরোসিন। কত রাত পর্যন্ত ছেলে পড়াশোনা করবে কে জানে! লেখাপড়া শিখেই যে এই ছেলে অনেক দূর যাবে, ঠিক জানতেন মা। স্বপ্ন দেখতেন, তাঁদের বাড়ির খুব কাছেই যে বঙ্গোপসাগর, সেই বিশাল সমুদ্রও ছাড়িয়ে যাবে তাঁর ছেলে কালামের নাম়ডাক।

মায়ের সেই স্বপ্ন সত্যি করেছিলেন আব্দুল। তবে রাস্তাটা নেহাত সোজা ছিল না। সাধারণ মৎস্যজীবীর ঘরের ছেলে কালামকে স্কুলে পড়ার সময় থেকেই রোজগারের তাগিদে খবরের কাগজ বিক্রি করতে হতো। স্কুল পাশ করে কলেজে পড়ার জন্য একটা বৃত্তি পান তিনি। ভর্তি হন তিরুচিরাপল্লির সেন্ট জোসেফ কলেজে। ১৯৫৪ সালে সেখান থেকেই পদার্থবিদ্যায় স্নাতক। তার পর ফের স্কলারশিপ নিয়ে চেন্নাইয়ে। পড়তে শুরু করেন  এয়ারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং। তাঁর স্বপ্ন ছিল ভারতীয় বায়ুসেনায় বিমানচালক হবেন। শৈশবে রামেশ্বরমের ধূসর বিকেলে সামুদ্রিক চিল, সারস পাখিদের উড়তে দেখে রোমাঞ্চিত হতেন। অদ্ভুত রকমের লোভ হত আকাশে ওড়ার। আর সেই স্বপ্ন পূরণের জন্যই তো ফিজিক্সে বিএসসি শেষ করার পরও ভর্তি হয়েছিলেন এয়ারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিঙে।

১৯৫৮ সালের দিকের কথা। আব্দুল কালাম মাদ্রাজ ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি (এম.আই.টি) থেকে সদ্য এয়ারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিঙে গ্রাজুয়েশন শেষ করেছেন। গ্র্যাজুয়েট হয়ে বের হওয়ার পর তার সামনে দুটি চাকরিতে আবেদনের সুযোগ এলো। একটি বিমান বাহিনীতে, অন্যটি প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের অধীনে Directorate of Technical Development and Production – DTD & P(Air)-এ। আব্দুল কালাম দুটিতেই আবেদন করলেন। দুটিই তার বিমান ওড়ানোর স্বপ্নের সাথে সম্পর্কিত। তবে বিমান বাহিনীর চাকরিটি ছিল সরাসরি বিমানের পাইলট হিসেবে, আর অন্যটি বিমানের ইঞ্জিনিয়ারিং সংক্রান্ত কাজ। খুব স্বাভাবিকভাবেই তিনি বিমান বাহিনীর চাকরিটির জন্য অধিক আগ্রহী ছিলেন।

ইন্টার্ভিউ এর জন্য ডাক আসে দুই জায়গা থেকেই। দিল্লীতে DTD & P এর ইন্টার্ভিউ সম্পন্ন করে কালাম বিমান বাহিনীর ইন্টার্ভিউ এর জন্য দেরাদুন পৌঁছান। বিমান বাহিনীর ইন্টার্ভিউতে মেধার চাইতে “ব্যক্তিত্বের” উপর বেশী জোর দেয়া হয়। তারা শারীরিক সক্ষমতা সম্পন্ন ও চনমনে স্বভাবের কাউকে চাইছিলেন। তাঁর ক্লাসের প্রথম আট জনকে বায়ুসেনায় যোগ দেওয়ার জন্য নির্বাচন করা হয়েছিল। কালাম হয়েছিলেন নবম। সে-যাত্রায় তাই আর যুদ্ধবিমানের চালক হয়ে ওঠা হয়নি কালামের। প্রচণ্ড হতাশা ঘিরে ধরল তাকে, ভেবেছিলেন এ ব্যর্থতার সাথেই হয়তো ভেঙ্গে গেল আশৈশব লালিত স্বপ্ন।

হৃষীকেশে এক স্বামীজীর সান্নিধেধ্য এসে তিনি আবার ভরসা ফিরে পান। খুঁজতে থাকেন নিজের মধ্যকার আগুনপাখিকে। বিমানবাহিনীতে প্রবেশ করতে না পারার সমস্ত ক্ষোভ দূর করে দিল্লিতে তিনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের প্রযুক্তি বিষয়ক উন্নয়ন ও উৎপাদন দপ্তর DTD & P-তে সিনিয়র সায়েন্টিফিক অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে যোগ দেন।

নিজের অদম্য চেষ্টায় তিনি হয়ে উঠলেন ভারতের ‘মিসাইল ম্যান’। ১৯৯৮ সালে পোখরান বিস্ফোরণ পরীক্ষার অন্যতম কারিগর ছিলেন তিনি। পড়াশোনার জন্য এক বারই শুধু গিয়েছিলেন বিদেশে, ১৯৬৩-৬৪ সালে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র ‘নাসা’য়। যে বঙ্গোপসাগরের দিকে তাকিয়ে স্বপ্নের জাল বুনতেন মা, সেই সমুদ্রসৈকতেই দু’দশক ধরে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্রের সফল উৎক্ষেপণ করে গিয়েছেন ছেলে। রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে ছিলেন কর্তব্যরত ছিলেন প্রতিরক্ষার গবেষণা বিষয়ক দপ্তরে এবং ভারতের মহাকাশ গবেষণা বিষয়ক দপ্তরে। মহাকাশ ও পরমাণু গবেষণায় তাঁর অবদানের জন্য পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণ ও ভারতরত্নে সম্মানিত হয়েছিলেন আব্দুল কালাম। ২০০২ সালে ভারতের একাদশতম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন এপিজে। রাষ্ট্রপতি ভবনে ছিলেন ২০০৭ সাল পর্যন্ত। তাঁর সময়ে রাষ্ট্রপতি ভবনের দরজা সর্বসাধারণ, বিশেষ করে বাচ্চাদের জন্যখুলে দেওয়া হয়েছিল। ছেলে-বুড়ো,বিজ্ঞানী-শিক্ষক সকলের কাছেই তিনি ছিলেন ‘সর্বসাধারণের রাষ্ট্রপতি’।

রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর তিনি আবার ফিরে যান পড়াশোনার জগতে। শিলং, ইনদওর ও আমদাবাদের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট, তিরুঅনন্তপুরমের ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র,  বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় এবং আন্না বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি অধ্যাপক হিসেবে নিয়মিত পড়াতেন। এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মঞ্চেই বক্তৃতা দিতে দিতে তাঁর হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হওয়া তাই এক আশ্চর্য সমাপতন! যার জেরে ২৭ জুলাই, ২০১৫ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তী।

বিদ্বান কালাম একই সঙ্গে গড়গড় করে মুখস্থ বলতে পারতেন কোরান শরিফ ও ভগবদ্গীতা। সব সময় বলতেন, লেখাপড়ার কোনও বিকল্প হয় না। স্কুলপড়ুয়াদেরও বারবার অনুপ্রাণিত করে বলেছেন, নিজের ভবিষ্যতের কারিগর হতে গেলে মন দিয়ে পড়াশোনা করতে হবে। আর কখনও কাজে ফাঁকি দেবে না। নিজের জীবনেও এ কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে গিয়েছেন। কর্মজীবনে ঠিক দু’দিন ছুটি নিয়েছিলেন, মায়ের আর বাবার মৃত্যুদিনে।