স্বপ্ন: বাস্তবতা ও মায়াজালের মাঝামাঝি একটি স্তর

sea of dreams
ID 181520338 © Doual Brandon | Dreamstime.com

মানুষের দক্ষতা এবং ক্ষমতা নিয়ে অধ্যয়ন করা সহজ কাজ নয়। মানুষ অত্যন্ত জটিল একটি প্রাণী; তার শারীরিক দক্ষতা থেকে শুরু করে তার চিন্তার শক্তি এবং তার আত্মার অনুষদ পর্যন্ত সকল বিষয়ে অনেক জটিলতা রয়েছে। রহস্যময় মানব রাজ্যের একটি আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হল তার স্বপ্নের জগত।

ইসলামী ঐতিহ্য অনুসারে স্বপ্নেরও কিছু বিশেষত্ব রয়েছে। কুরআনের হযরত ইউসুফ(আঃ) এর ঘটনা বর্ণনার সময় একটি বিশেষ ও অর্থবহ অবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছেপবিত্র কুরআনে একটি স্বপ্নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে; যেটি ইউসুফ(আঃ) তাঁর পিতা ইয়াকুব(আঃ) এর সাথে আলোচনা করেছিলেন এবং ইয়াকুব(আঃ) তাঁকে এই স্বপ্ন তাঁর ভাইদের কাছে প্রকাশ না করার জন্য বলেছিলেন। কারণ এটি শুনলে তারা তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে। কুরআনে হযরত ইউসুফ(আঃ) স্বপ্ন ব্যাখ্যা করার সক্ষমতার কথাও বর্ণিত আছে, যেখানে তিনি তাঁর দুই সহকর্মী ও মিশরের বাদশার স্বপ্ন ব্যাখ্যা করেছিলেন।

ইউসুফ(আঃ) এর ঘটনা থেকে আমরা এটি শিখেছি যে, কখনও একটি ছোট বাচ্চার স্বপ্নও সত্য হতে পারে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের শিক্ষা এখানে আছে তা হল-আমাদের স্বপ্নগুলি যেন যথেচ্ছভাবে যে কারও কাছে প্রকাশ করা না হয়, বিশেষত যদি তাদের পক্ষ থেকে বিরুদ্ধাচরণ করার সম্ভাবনা থাকে। বরং স্বপ্ন এমন কারও কাছে প্রকাশ করতে হবে যে সৎকর্মশীল। যেমনটি কুরআনে এসেছে, “আমাদেরকে এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলে দাও, আমরা দেখছি তুমি একজন সৎকর্মশীল লোক” (আল কুরআন-১২:৩৬)

এছাড়াও হাদিসে এসেছে, “সত্য স্বপ্ন নবুয়তের ছেচল্লিশ ভাগের একভাগ”কুরআনে ইবরাহীম(আঃ) এর স্বপ্নও বর্ণিত হয়েছে, “ইবরাহীম (আঃ) বলল, ‘বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে যবেহ করছি, এখন বল, তোমার অভিমত কী? সে বলল, ‘হে পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে আপনি তাই করুন, আল্লাহ চাইলে আপনি আমাকে ধৈর্যশীলই পাবেন।” (আল কুরআন-৩৭:১০২)

রাসুল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এর স্বপ্নের কথাও কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, “আল্লাহ তাঁর রসূলকে প্রকৃত সত্য স্বপ্নই দেখিয়েছিলেন। আল্লাহর ইচ্ছায় তোমরা অবশ্য অবশ্যই মসজিদুল হারামে প্রবেশ করবে নিরাপদে” (আল কুরআন-৪৮:২৭)

‘সত্য স্বপ্ন’ এই কথাটি থেকে বোঝা যায় যে, সমস্ত স্বপ্ন আসলে সত্য হয় না। বরং কিছু স্বপ্ন আছে যেগুলি অনর্থক – মনের চিন্তাচেতনারই প্রতিফলন, আর কিছু আছে যেগুলি শয়তানের পক্ষ থেকে আসে আর সেগুলি মানুষকে উদ্বিগ্ন ও দুশ্চিন্তাগ্রস্থ করে তোলে।

সুতরাং, আমরা বলতে পারি স্বপ্ন আসলে অন্য জগতের সাথে আমাদেরকে যুক্ত করে এবং আমাদের আত্মার মধ্যে বিদ্যমান কিছু সুপ্ত বাস্তবতাকে আমাদের সামনে নিয়ে আসেএটি সত্য যে আত্মার সাথে অন্য জগতের সম্পর্ক কেবল স্বপ্নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় তবে এর অর্থ এই নয় যে স্বপ্নকে বাতিল করে দিতে হবে এবং অযোগ্য বা কোনো অর্থহীন ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

‘মাজমাউল বায়ান’ গ্রন্থের একটি অনুচ্ছেদে আল্লামা তাবরিসি একটি ঘটনা এনেছেন যেখানে নবীজীর একজন সাহাবী উবাদা ইবনে সামেত(রাযিঃ) তাঁকে এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “যারা ঈমান আনে আর তাকওয়া অবলম্বন করেতাদের জন্য সুসংবাদ দুনিয়ার জীবনে আর আখেরাতেও”তখন নবীজী বলেছিলেন যে, এটি ভাল স্বপ্নের একটি রেফারেন্স। 

‘আল-ইখতিসাস’ গ্রন্থের লেখক শায়খ মুফিদ ইমাম জাফর সাদিকের একটি উক্তি বর্ণনা করেছেন, “যখন কোন বান্দা আল্লাহর অবাধ্য হয় এবং আল্লাহ তার মঙ্গল চান, তখন তিনি স্বপ্নে তাকে ভয় দেখান, যাতে সে তার গুনাহ বন্ধ করে দেয়” । এই সমস্ত উদাহরণ এই সত্যটি নির্দেশ করে যে, নির্দিষ্ট কিছু স্বপ্ন এবং আধ্যাত্মিক জীবনের মধ্যে একটি সংযোগ রয়েছে।

বর্তমান যুগেও স্বপ্নের ব্যাখ্যার বিষয়টি কিছু অধার্মিক চেতনাতেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ইসলামী স্কলাররা বাস্তব এবং মায়াময়ী স্বপ্নের মধ্যে পার্থক্য করার জন্য অনেক উপায় চালু করেছেন; তবে সংক্ষিপ্ততার জন্য, এখানে এটুকু বলা যথেষ্ট যে, বিশ্বস্ত ব্যক্তির কাছ থেকে আসা কোনো স্বপ্ন যখন পরিষ্কার হয় তখন এটি সত্য স্বপ্ন হিসাবে বিবেচিত হতে পারে এবং যদি এটি অস্পষ্ট হয় তবে ব্যাখ্যার প্রয়োজন হতে পারে।

সত্য স্বপ্ন আমাদেরকে অনেক গোপন ও অর্থবহ বিষয় সম্পর্কে সচেতন করতে পারে যা আমরা খুব বেশি চিন্তা করি না। এ কারণেই আমরা মাঝে মাঝে স্বপ্নের দ্বারাও অনুপ্রেরণা পাই এবং কোনোসময় সেগুলিতে প্রদর্শিত ভবিষ্যতের ঘটনার বাস্তবতাও দেখতে পাই। যদিও সঠিক-বেঠিক বোঝার জন্য পার্থক্য করার মত জ্ঞানের প্রয়োজন, তবে সামগ্রিকভাবে এসকল ঘটনাকে অবমূল্যায়ন করা উচিত নয়।