স্বাধীনতা সংগ্রামে খিলাফত আন্দোলনের গুরুত্ব কোথায় ছিল?

ID 144886023 © Nikolay Antonov | Dreamstime.com

স্বাধীনতার জন্য কত সব যুদ্ধ! সব যুদ্ধের অবসান ঘটল ১৯৪৭ এ দেশভাগের মধ্য দিয়ে। সেই সময় যারা এই স্বাধীনতা সামনাসামনি দেখেছিলেন, তারা যে ইতিহাস পাঠ করতেন সেখানে সামাজিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ও সাহিত্যক্ষেত্রে মুসলমানদের যে অবদান তা লেখা থাকত। কিন্তু সময় বদলেছে, ইতিহাস বারবার পুর্নলিখিত হচ্ছে। সিলেবাস বদলে যাচ্ছে সময়ে সময়ে তাই এসব কথা আর লেখাও থাকে না আর জানাও হয় না। ফলে একপ্রকার ধামাচাপা পড়ে গেছে এই মুসলমানদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও অবদানের অনেক কথাই।আর যারা জানত তারাও চর্চার অভাবে সবই ভুলে যেতে বসেছে। কারোর কারোর স্মৃতি থাকলেও সেটা আবছা অথবা অস্পষ্ট। ভারতের স্বাধীনতার আগে বা পরে এবং এখনো পযর্ন্ত মুসলমানদের অবদান অনস্বীকার্য।

তুরস্কের অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ (১৮৭৬-১৯০৯)। তিনি পশ্চিমা জগতের আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে এবং নিজের দেশে পশ্চিমা গণতন্ত্রবাদী বিরোধী দলকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে একটি বিশ্ব-ইসলামী ঐক্যজোট বা প্যান-ইসলামিক প্রোগ্রাম স্থাপন করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তুরস্ক মিত্রশক্তির (আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, রাশিয়া) বদলে অন্য দলে (জার্মানি, জাপান ইত্যাদি) দলে যোগ দিয়েছিল এবং পরাজিত হয়েছিল।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে  তিনি ভারতের মুসলমানদের কাছে দূত হিসেবে জালালুদ্দিন আফগানি কে দল বাড়ানোর জন্য পাঠিয়েছিলেন। বহু মুসলিম ধর্মীয় নেতা খলিফার এই পরিকল্পনার সাফল্যলাভ চিন্তা করে জনসাধারণের মধ্যে প্রচার ছড়িয়ে দেন ও  মুসলিম নেতা মৌলানা মেহমুদ হাসান অটোমান সম্রাটের সাহায্যে একটি জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ করার উদ্যোগে সামিল হন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে। কিন্তু এরপর সুলতানের বিরুদ্ধে এক গণঅভ্যুত্থানের ফলে খলিফার যে ক্ষমতা সেটা তুর্কি যুবশক্তির কাছে চলে আসে।

আদর্শ নিয়ে মতের অমিল দেখা যায় খিলাফত আন্দোলনের লোকেদের মধ্যে, সেই কারণে তিন দলে বিভক্ত হয় আর একদল খিলাফতের সঙ্গে থাকে, একটি পক্ষ চলে যায় কংগ্রেসে ও বাকি অন্য পক্ষ মুসলিম লীগে যোগদান করে। ফলে ক্রমশ দুর্বল হয় যায় এই খিলাফত আন্দোলন। শেষ ধাক্কাটা খোদ তুরস্ক দেয়, কামাল আতাতুর্কের বাহিনী স্বাধীন তুরস্ককে একটি উন্নয়নশীল গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে গড়ে ওঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কাজে লেগে পড়ে আর আতাতুর্ক তুরস্ক থেকে খলিফার পদের অবসান ঘটান এবং ভারতীয়দের সাহায্য অপ্রয়োজনীয় বলে দেন।

১৯১৯ সালের ভার্সাই চুক্তি সাধিত হয়। ফলে তুরস্কের রাজনৈতিক প্রাধান্য ও রাজ্যের পরিসীমা অনেকটাই সীমিত হয়ে গেছিল। সেইসময় পশ্চিমা দেশগুলো অটোমান সুলতানের ‘খলিফা’ পদবির মর্যাদা রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে অস্বীকার করে। শুধু তাই নয় তার জায়গায় ‘সেভরেস’ চুক্তি করে তুরস্কের অটোমান সাম্রাজ্যের কাছ থেকে ফিলিস্তিন, সিরিয়া, লেবানন, ইরাক ও মিশর ছিনিয়ে নেয়।

সৈয়দ আতাউল্লা শাহ বুখারি ও চৌধুরী আফজাল হকের সহায়তায় ‘মজলিস-এ-আহরার-এ-ইসলাম’ নামে একটি দল গড়ে ওঠে। অন্যদিকে ড. আনসারী, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, হাকিম আজমল খান মহাত্মা গান্ধী ও ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের একনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে শক্ত অবস্থানে রয়ে যান। আলী ব্রাদার্স- মোহাম্মদ আলী ও শওকত আলী মুসলিম লীগে যোগ দিয়ে গড়ে তোলেন পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র। অবশ্য খলিফা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎের জন্য ১৯৩১ সালে জেরুজালেমে একটি দুর্বল সভা হয়েছিল, যার কোন ভবিষ্যৎ নির্দেশনা ছিল না।

আবার পাকিস্তানপন্থী ও মুসলিম লীগরা মনে করেছেন একটি পৃথক মুসলিম রাষ্ট্রের জন্য খিলাফত আন্দোলন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন। সেইজন্য আলী ভাতৃদ্বয়কে যেমন পাকিস্তানের স্থাপতি হিসেবে দেখা হয়, তেমনি ড. আনসারী, মৌলানা আজাদ ও হাকিম আজমল খানকে ভারতে ‘ন্যাশনাল হিরো’ হিসেবে সম্মান করা হয়।

ভারতের খিলাফত আন্দোলন নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মতবাদ আছে। খিলাফত আন্দোলনের বিপক্ষে যারা আছেন সেই সব সমালোচকদের মতে, এটি একটি মুসলিম-সর্বস্ব, মৌলবাদীদের কর্মসূচি—যেটি ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের কর্মসূচি থেকে বহুলাংশে আলাদা। শুধু তাই নয় তারা এটাও বলেছেন যে কংগ্রেসের সঙ্গে খিলাফতের আঁতাত আসলে পরস্পর সুবিধাভোগীদের একটি সন্ধি—অ্যা ম্যারেজ অব কনভেনিয়েন্স। খিলাফত আন্দোলনের পক্ষ অবলম্বন করা সমালোচকরা  মত প্রকাশ করেছেন যে, খিলাফত আন্দোলন ছিল আগুনের প্রথম একটি স্ফুলিঙ্গ, যেটি অসহযোগ আন্দোলনের দিকে চালিত হয়েছে এবং হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের উন্নতির চরম পরাকাষ্ঠা তৈরি করতে সাহায্য করেছে।