স্বামী এবং স্ত্রীর ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দাম্পত্যজীবনের প্রাণশক্তি

ID 40213434 © Wittybear | Dreamstime.com

প্রতি বছর ৮ই মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করা হয়। নারীদের পরিপূর্ণ অধিকারের বিষয়ে ইসলাম সবসময়ই সরব ছিল। ইসলাম নারীদের মা হিসেবে, বোন হিসাবে, আত্মীয় হিসেবে , স্ত্রী হিসেবে দিয়েছে তাদের ভিন্ন ভিন্ন আধিকার। ইসলাম একজন স্ত্রী কে তার অধিকার এবং মূল্যায়ন এর ব্যাপারে সবসময় অগ্রগামী।

ইসলামে স্বামীর অধিকার যেভাবে সংরক্ষিত হয়েছে, নারীর অধিকারও ঠিক তেমনি সংরক্ষিত হয়েছে। আমরা দেখতে পারি কোরআন ও হাদিসে স্বামী স্ত্রীর একে অন্যের প্রতি কর্তব্য ও অধিকার নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে । স্ত্রীকে সব সময় ইসলাম সর্বোচ্চ মাত্রায় মূল্যায়িত করেছে। কারণ স্বামী এবং স্ত্রীর ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দাম্পত্যজীবনের প্রাণশক্তি।

মহান রাব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআন শরীফে বলেনঃ “ তাদের সাথে সৎভাবে জীবনযাপন করবে। তোমরা যদি তাদের অপছন্দ করো তবে এমনও হতে পারে যে, আল্লাহ যেখানে অনেক কল্যাণ রেখেছেন তেমন কিছুকেই তোমরা অপছন্দ করছ। ” ( সুরাঃ নিসা, আয়াত ১৯)।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কোনো মুমিন পুরুষ মুমিন মহিলার ওপর রুষ্ট হবে না, কেননা যদি তার কোনো কাজ খারাপ মনে হয়, তাহলে তার এমন গুণও থাকবে, যার ওপর সে সন্তুষ্ট হতে পারবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৪৬৯) অন্য হাদিসে বলেছেন, ‘তোমরা নারীদের প্রতি ভালো আচরণের উপদেশ দাও।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫১৮৪) অন্য হাদিসে রয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক ভালো মানুষ তারাই, যারা তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১১৬২)

পূর্ণ মোহরানা আদায়

বিবাহের পর প্রথম যে কাজটি স্বামীর জন্য করণীয় তা হচ্ছে মোহরানা আদায় করা। বর্তমানে আমাদের সমাজে বেশিরভাগ বিয়েতে মোহরানা শুধু কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে। লোক দেখানো, সমাজে নিজের ইমেজ বৃদ্ধি করার জন্য, আরো বিভিন্ন কারণে এইরকম কাগজে কলমের মোহরানা আদায় করা হয়। আবার মেয়ের পক্ষ থেকে অধিক পরিমান মোহরানা লেখার একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে যদি সম্পর্ক ভেঙে যায় তাহলে অর্থনৈতিকভাবে যেন তারা নিরাপত্তা পায়। কিন্তু উভয় পক্ষই এটি ভুলে যায় শুধু কাগজে কলমের জন্য নয়, মোহরানা পরিপূর্ণরূপে আদায় করে নিতে হবে। মহান রাব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআন শরীফে এ বিষয়ে বলেনঃ “ আর তোমরা আনন্দিতচিত্তে (ফরজ মনে করে) স্ত্রীদের দেনমোহর আদায় করো। অবশ্য যদি তারা খুশিমনে দেনমোহরের কিছু অংশ ছেড়ে দেয়, তবে তোমরা তা স্বাচ্ছন্দ্যে ভোগ করো। ” (সুরা : নিসা, আয়াত : ৪)। তবে কেউ যদি নিতান্তই পরিস্থিতির শিকার হয়, এবং তার স্ত্রী অন্তর তাকে সময় প্রদান করে বা ছেড়ে দেয় তবে তা বিবেচনাযোগ্য।

স্ত্রীর ভরণ-পোষণ

ইসলামী শরীয়ত মতে বিবাহের পর থেকেই স্বামীর ওপর তার স্ত্রীর জন্য যে সমস্ত অধিকার হয় তার মধ্যে অন্যতম হলো স্ত্রীর ব্যয় ভার পরিপূর্ণরূপে বহন করা। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সন্তানের পিতার ওপর সন্তানের মায়ের জন্য অন্ন-বস্ত্রের উত্তম পন্থায় ব্যবস্থা করা একান্ত দায়িত্ব।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৩৩)।

হাদিস শরিফে স্ত্রীদের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) পুরুষদের নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তুমি যখন খাবে, তাকেও খাওয়াবে এবং তুমি যখন পরবে, তাকেও পরাবে। চেহারায় কখনো প্রহার করবে না, অসদাচরণ করবে না।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২১৪২, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ১৮৫০১)

স্ত্রীর মন প্রফুল্ল রাখার চেষ্টা করা

বৈধতার ভেতরে থেকে স্ত্রীর মনকে আনন্দ এবং প্রফুল্ল মনে রাখা স্বামীর প্রতি শরীয়তের নির্দেশ। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘মুসলমানের জন্য সব খেল-তামাশা নিষিদ্ধ, তবে তার ধনুক থেকে তীর চালনা, ঘোড়া চালনা, স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের রসিকতা, কেননা এগুলো ন্যায়সংগত।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১৬৩৭)

প্রয়োজনীয় খরচ স্ত্রীকে না দিলে তার করণীয়

স্বামী যদি কোন কারণ ছাড়া স্ত্রী সন্তানের অর্থাৎ সংসারের খরচ বহন না করে বা প্রয়োজনীয় খরচ প্রদান না করে এই বিষয়ে স্বামীর সম্পদ থেকে প্রয়োজন মতো স্ত্রী খরচ করতে পারবে। হাদিস শরিফে এসেছে, সাহাবিয়া হিনদ বিনতে উতবা (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! (আমার স্বামী) আবু সুফিয়ান সংসারের খরচে সংকীর্ণতাকারী, সে আমার ও আমার সন্তানের প্রয়োজন পরিমাণ খরচ দেয় না, তাহলে আমি কি তার অগোচরে তার থেকে কিছু নিতে পারি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, হ্যাঁ, তুমি তোমার ও তোমার সন্তানের প্রয়োজন পরিমাণ তার অগোচরে তার থেকে নিতে পারবে। (বুখারি : হাদিস : ৫২৬৪, বাদায়েউস সানায়ে : ২/২৭)

বাসস্থান

স্ত্রীর জন্য নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী স্বাস্থ্যসম্মত, প্রয়োজনীয় এবং ধর্মীয় শিক্ষায় চলাচলের উপযোগী বাসস্থান প্রদান করতে হবে। এক্ষেত্রে বলে রাখা ভাল অনেক স্বামীদের অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতার কারণে চাইলেও এ ধরনের আবাসস্থল প্রদান করতে পারে না। তবে আন্তরিক প্রচেষ্টা নিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া চাইতে হবে যেন তিনি তা করতে পারেন।

নিয়মিতভাবে হাতখরচ দেয়া

নিয়মিতভাবে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী হাত খরচ দিতে হবে। সেটা হোক না যত সামান্যই।

সদাচরণ করা

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কোনো মুমিন পুরুষ মুমিন নারীর ওপর রুষ্ট হবে না, কেননা যদি তার কোনো কাজ খারাপ মনে হয়, তাহলে তার এমন গুণও থাকবে, যার ওপর সে সন্তুষ্ট হতে পারবে।’ (সহিহ মুসলিম হাদিস : ১৪৬৯) অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা নারীদের প্রতি ভালো আচরণের উপদেশ দাও।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫১৮৪)

এছাড়াও প্রয়োজনমাফিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা, নেক আমলের প্রতি অর্থাৎ সৎকর্মের প্রতি প্রতিনিয়ত উৎসাহ প্রদান করা সহ তাকে তার পরিপূর্ণ মর্যাদা এবং হক আদায় করতে হবে।

বিয়ে একটি বৈধ চুক্তি হলেও শুধু আইন দিয়ে জীবন চলে না। স্বামী-স্ত্রীর মমতা, একজন আরেকজনের প্রতি বিশ্বাস, এবং সৎ কর্ম দ্বারা তারা ধীরে ধীরে ধাপে ধাপে নিজেদেরকে আদর্শ দৃষ্টান্ত করতে পারেন। আর এই আদর্শ পরিবার গঠনের ক্ষেত্রে স্ত্রীর সবসময় সঠিক মূল্যায়ন করতে হবে, যা ইসলামের সরাসরি নির্দেশ।