স্বামী হিসেবে আপনার কর্তব্য কী কী?

সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, সমাজের ক্ষুদ্রতম অংশ হল পরিবার। একটি একটি পরিবার জুড়ে তৈরি হয় বৃহত্তর সমাজ। পরিবারের ইমান বজায় রাখলে সমাজেরও সার্বিক ইমান বজায় থাকে। এবার একটি পরিবার কী দিয়ে তৈরি হয়? মানুষের সঙ্গে মানুষের পারস্পরিক সুস্থ সম্পর্কের মাধ্যমে পরিবার তৈরি হয়। আর এই সম্পর্কে পরিবারের কর্তা হিসাবে পিতা বা স্বামীর গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

একজন স্বামীর যেমন প্রতিনিয়ত স্ত্রীর সাহচর্য দরকার, স্ত্রীও কিন্তু নিজ স্বামী ব্যতীত পরিপূর্ণ হতে পারেন না। সৃষ্টিগতভাবেই আল্লাহ মহান এদের একে অপরের জন্য সহায়ক মুখাপেক্ষী হিসাবে তৈরি করেছেন। একই ভাবে সন্তানকে বড় করে তোলায় যেমন পিতামাতার ভূমিকা রয়েছে, সেরকম পিতা মাতার খেয়াল রাখায় সন্তানের ভূমিকা রয়েছে। অর্থাৎ বলা যায়, প্রত্যেকটি মানুষের সৎ ইচ্ছে প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে পরিবার। তবে, পরিবারের কর্তার দায়িত্ব থাকে খানিক বেশি।

একজন সুখী আদর্শ পরিবারের কর্তা তথা স্বামী নিম্নলিখিত বিষয়গুলি খেয়াল রাখবেনঃ

১। সংসারের দায়িত্ব স্ত্রীর সঙ্গে ভাগ করে নেবেন। শুধুমাত্র প্রয়োজনেই যে করবেন তা নয়, অনেকসময় প্রয়োজন ছাড়াও দায়িত্ব ভাগ করে নিলে সংসারের চাকা মোলায়েম ভাবে এগিয়ে যায়। আপনার স্ত্রী সারাদিন সংসারের উন্নতিকল্পে নিজেকে নিয়োগ করেছেন, আপনি যদি স্ত্রীকে সাহায্য করেন তাহলে আপনাদের দুজনের বোঝাপড়াও বৃদ্ধি পাবে।

২। স্ত্রীর প্রতি স্নেহশীল যত্নশীল হোন। একইভাবে সন্তানদের প্রতি স্নেহশীল হোন। যে মুসলমান তার স্ত্রীকে যত্ন করে সেই মুসলমানের উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয়। যদি আপনি সংসারে সর্বদা কঠোর নিয়ম বজায় রাখতে চান তাহলে পরিবারের মানুষগুলোর পারস্পরিক বন্ধন দুর্বল হতে শুরু করে। বরং, ভালবাসা, স্নেহ , সহমর্মিতা দিয়ে আপনি নিয়ম অপেক্ষা অনেক বেশি সক্ষম হবেন পরিবারকে এক রাখতে।

৩। স্ত্রীকে সময় দিন। শুধুমাত্র শারীরিক সম্পর্কেই আবদ্ধ থাকবেন না। স্ত্রীর সঙ্গে সময় কাটান, তাকে কোথাও ঘুরতে নিয়ে যান। মনে রাখবেন, তার ইচ্ছাঅনিচ্ছার মর্ম কিন্তু আপনি ছাড়া কেউই বুঝবে না। ইসলামে বলাই রয়েছে, ইসলামের পক্ষে হারাম এমন কিছু ছাড়া স্ত্রীর সমস্ত অনুরোধই স্বামীর বিবেচনা করে দেখা উচিৎ। 

৪। স্ত্রীর প্রতি পারতপক্ষেও উগ্র ব্যবহার না করাই বাঞ্ছনীয়।  স্বামী হিসেবে সকলের জানা উচিত, নারীরা মর্যাদার সম্ভাব্য সবকটি আসনে অধিষ্ঠিত হলেও, পরিপূর্ণ রূপে সংশোধিত হওয়া সম্ভব নয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : “তোমরা নারীদের ব্যাপারে কল্যাণকামী। কারণ, তারা পাঁজরের হাড় দ্বারা সৃষ্ট। পাঁজরের উপরের হাড়টি সবচেবেশি বাঁকা। (যে হাড় দিয়ে নারীদের সৃষ্টি করা হয়েছে) তুমি একে সোজা করতে চাইলে, ভেঙে ফেলবে। আবার অবস্থায় রেখে দিলে, বাঁকা হয়েই থাকবে। তাই তোমরা তাদের কল্যাণকামী হও, এবং তাদের ব্যাপারে সৎউপদেশ গ্রহণ কর।” [বুখারি

৫। কোনও মানুষই নিখুঁত নয়। তাই একথা মেনে নেওয়াই উচিৎ যে স্ত্রীএর সবকিছু আপনার মনের মতো হবে না। অনেকসময় আপনার কোনও ব্যবহারও স্ত্রীর মনের মতো হবে না। এক্ষেত্রে স্ত্রীর অন্যান্য গুণের দিকে দৃষ্টিপাত করুন। মনে রাখবেন আল্লাহ আপনাদের এক করেছে এক মহান উদ্দেশ্য নিয়ে, ইসলামকে ইমানদার পরিবার প্রদান করা। আপনার স্ত্রী আপনার যোগ্য না হলে আল্লাহ আপনাদের এক করতেন না কিছুতেই।

৬। রমজানের সময় শারীরিক মিলন বন্ধ থাকলেও তাতে স্ত্রীর প্রতি ভালবাসা কমিয়ে ফেলার কোনও কারণ নেই। ভালবাসা শুধুই শরীর দিয়ে হয় না। বরং এই সময় স্ত্রীর সঙ্গে তার আপনার পছন্দ অপছন্দ নিয়ে কথা বলুন। সন্তানের ভবিষ্যত নিয়ে আলোচনা করুন। 

৭। স্ত্রীর প্রতি যথাসাধ্য কর্তব্য করুন। আপনার সাধ্যের মধ্যে তাকে পোশাক কিনে দিন। তার সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের দিকে নজর রাখুন।

৮। সব কাজে ভুল খুঁজবেন না। আপনার স্ত্রী যদি দেখে আপনি সব কাজে ভুল ধরছেন  তাহলে সে আস্তেআস্তে নিজেকে আপনার থেকে গুটিয়ে নেবেন। এই দূরত্ব আপনার দাম্পত্য জীবনকে কলুষিত করবে।

৯। অনর্থক শাসন করবেন না। স্ত্রী যদি কোনও ভুল করেও তাহলেও তাকে আড়ালে মৃদু তিরস্কার করুন। সকলের সামনে একেবারেই তাকে কোনও কথা শোনাবেন না। মনে রাখবেন, স্ত্রীর প্রতি স্নেহশীল হওয়া আপনার কর্তব্য। নবিজি (সা.) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে তারাই উৎকৃষ্ট, যারা তাদের স্ত্রীর কাছে উৎকৃষ্ট এবং আপন পরিবারপরিজনের প্রতি স্নেহশীল [তিরমিজি শরিফ]।  অপর এক হাদিসে রাসুল [সা.] বলেছেন, যে ব্যক্তি তার স্ত্রীর কষ্টদায়ক আচরণে ধৈর্য ধারণ করবে, মহান আল্লাহ তাকে হজরত আইয়ুব (.)-এর সমানসওয়াবদান করবেন।

১০। সম্পর্কের মধ্যে অল্প ঈর্ষা থাকা ভাল, তাতে ভালবাসা প্রকাশ পায়। কিন্তু অতিরিক্তি ঈর্ষান্বিত হওয়ার থেকে বিরত থাকুন, সম্পর্ক বিষাক্ত হয়ে যাবে।

১১। স্ত্রী যদি ইসলাম বিরোধী কোনও কাজ করে তবে অবশ্যই তাকে শাস্তি দিন। কিন্তু সেই শাস্তি যেন অত্যাচার না হয়ে যায়। প্রয়োজন হলে স্ত্রীর সঙ্গে শয়ন বা শারীরিক মিলন ত্যাগ করুন। কিন্তু কোনও অবস্থাতেই মারধোর, গালিগালাজ করবেন না। এছাড়া স্ত্রীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের বিষয়ে বাইরে বলে বেড়াবেন না, এটি ইসলামে নিষিদ্ধ। 

১২। কর্মক্ষেত্র থেকে ফেরার পর শান্তভাবে গৃহমধ্যে প্রবেশ করুন। বাড়ির লোককেসালামবলে অভিবাদন করুন, জিজ্ঞাসা করুন তাদের দিন কেমন গিয়েছে।

১৩। নিজের মুখ, শরীর শ্বাসপ্রশ্বাসের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন।

১৪। পরিবারের সঙ্গে সহজ ভাবে মিশলেও কোথাও কোথাও একটু গাম্ভীর্য্য অবলম্বন করুন। বেশি চটুল হলে আপনার গুরুত্ব খর্ব হবে।

১৫। স্ত্রীকে বিবাহের আগে দেয় কথা পূরণ করার চেষ্টা করুন। এছাড়া স্ত্রীর উপর প্রয়োজনের অতিরিক্ত কাজের ভার চাপাবেন না। একজন মানুষ কোন পরিবেশে বড় হয়ে উঠেছে তার উপর অনেক কিছু নির্ভর করে। তাকে আস্তেআস্তে মানিয়ে নিতে দিন। কোনও অবস্থাতেই  স্ত্রীর সম্পত্তির দিকে নজর দেবেন না। কোনও অবস্থাতেই স্ত্রীকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাইরে কাজ করতে পাঠাবেন না। 

উপরিউক্ত বিষয়গুলি একটি পরিবারের স্বামী মেনে চললে তবেই সেই পরিবার হয়ে ওঠে সহি ইসলামিক পরিবার। আল্লাহর কাছে এটাই প্রার্থনা করুন যেন আমাদের সকলের পরিবার সুখী পরিবার হতে পারে।