স্রষ্টার সঙ্গে বন্ধন বাদে এই পৃথিবীতে সবই ক্ষণস্থায়ী

ID 178434979 © Elmirex2009 | Dreamstime.com

“উদারতা এবং ভ্রমণের সন্ধানে নিজের দেশ ত্যাগ করুন। ভ্রমণের পাঁচটি সুবিধা রয়েছে: বিপদ থেকে মুক্তি, জীবিকা নির্বাহ, জ্ঞান, শিষ্টাচার এবং মহৎ সাহচর্য। – ইমাম আস-শফী

আমি জন্মেছি এবং বেড়ে উঠেছি টেক্সাসের হিউস্টনের একটি ছোট শহরে, যা সুগার ল্যান্ড নামে পরিচিত, সেখানে আমি আমার জীবনের প্রথম উনিশ বছর কাটিয়েছি। ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে হাইস্কুল পাসের পরপরই আমি এবং আমার ছোট ভাই ওয়েস্ট ইন্ডিজের অপেক্ষাকৃত প্রত্যন্ত দ্বীপ সেন্ট কিটসে রওনা হলাম মেডিকেল কলেজের জন্য। এখানে প্রায় দুই বছর পরে, আমার শেষ সেমিস্টারের সমাপ্তি ঘটে এবং এই পর্যায়ের তিক্তমধুর অনুভূতিগুলি আমার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। আমি যে উপসংহারে পোঁছেছি তার প্রতিফলন থেকে কিছুতেই বের হতে পারি না।

আমার জীবনের প্রথম উনিশ বছর আমি যে বাড়ি, যে পরিবেশে বড় হয়ে উঠেছি সেখান থেকে চলে যাওয়া এবং একটি দেশ যা আমার কাছে সম্পূর্ণ অপিরিচিত তা আমাকে পরিবর্তন করতে পারে এই ভাবনা ভেবে এবং সমস্ত কিছু পুনরায় শুরু করতে হবে, নতুন বাড়ি, নতুন বন্ধু, নতুন স্মৃতি এই কঠোর বাস্তবতাকে সহ্য করতে কষ্ট হয়।

তবে প্রাথমিক দ্বিধাদ্বন্ধের পরে – আমরা অনিবার্যভাবে এগিয়ে যেতে শুরু করি। এটি মজার এবং একইসাথে কিছুটা ভীতিজনক হলেও আমরা আমাদের নতুন বাড়ীতে নতুন জীবন এবং আমাদের নতুন সম্প্রদায়ের নতুন বন্ধুদের সাথে এত দ্রুত স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করা শুরু করি যে, আমরা বুঝতেও পারি না যে আমরা যে জিনিসগুলির জন্য একসময় চেয়েছিলাম এবং হারাতে ভয় পেতাম তা অস্থায়ী ছিল।

আমরা ধিরে ধিরে বেদনা, দুঃখ, সুখ, আনন্দ, এবং জীবনের একটি বৃহত্তর পরিমাপের সাময়িক প্রকৃতি বুঝতে শুরু করি। বাবা মা ভাই বন মিলিয়ে আমার পরিবারে সদস্য সংখ্যা নয়। আমি এই বন্ধনটাকেই চিরস্থায়ী বন্ধন মনে করতাম, আমি যেখানে বড় হয়ে উঠেছি তা নিজের বলে জানতাম এবং টেক্সান বলে গর্ববোধ করতাম।

তবে এখন আমি সেন্ট কিটসে খুশি। বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার সময় আমার যে কষ্ট হয়েছিল তা যে ক্ষণস্থায়ী তা বুঝতে আমার দেরি হয়নি। যে সমস্ত বস্তুগত সম্পদ আমি সংগ্রহ করেছিলাম এবং ভাবতাম যে এগুলি ছাড়া বাঁচা সম্ভব না তাও ক্ষণস্থায়ী ছিল। এটা আমি এবং আমার ভাই বুঝতে শুরু করেছিলাম। আর যাদেরকে আমি আমার বন্ধু বা শত্রু বলে গণ্য করতাম তারাও ছিল স্বল্পস্থায়ী।

আমি ভাবতে শুরু করি যে সম্ভবত আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’লা তিনি আমাদের জীবনে এই সংক্ষিপ্ত পর্যায়গুলির পরিকল্পনা করেছেন। সুতরাং তিনি আমাদের কাছে একমাত্র সত্য ব্যাখ্যা করতে পারেন: যেমন এই সমস্ত সংক্ষিপ্ত পর্যায়, আবেগ এবং পরিচিতরা যেমন আসে এবং যায়, তেমনি আমরাও এসেছি, এবং আমরাও যাব। আল্লাহ আমাদের সকলকে রক্ষা করুন। আমরা এই পৃথিবীর জিনিসগুলিতে খাঁটি সুখ পাওয়ার আশা করতে পারি না কারণ শেষ পর্যন্ত, অবশ্যম্ভাবীভাবে “ভূপৃষ্টের সবকিছুই ধ্বংসশীল” (আল-কোরআন, ৫৫: ২৬)।

“ওহে মানুষেরা, যারা এই পৃথিবীতে আনন্দ নেয়, একটি বিবর্ণ ছায়ার প্রেমে পড়ে তারা বোকা। – আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু।

এখনই সময় আমরা সুখ, ভালবাসা, মানুষ, স্থান এবং পার্থিব বস্তুগুলাতে বিশ্বাস স্থাপন করা বন্ধ করি কারণ এইগুলা আমাদেরকে হতশাগ্রস্থ করবে। এখনি সময় আমরা সত্যকে উপলব্ধি করি এবং বুঝতে চেষ্টা করি যে কেবলমাত্র স্থায়ী বিষয়গুলি হ’ল সেই সমস্ত বিষয় যা আল্লাহ তায়ালার সাথে সংযুক্ত রয়েছে।

যখন আপনি আল্লাহর উপর ভরসা করেন এবং আপনার সমস্ত বিষয় তাঁর হাতে রাখেন তখন আপনি কখনই হতাশ হবেন না। যখন আপনি সত্যিকার অর্থে ” আমি মানুষ সৃষ্টি করেছি এবং তার মন নিভৃতে যে কুচিন্তা করে, সে সম্বন্ধেও আমি অবগত আছি। আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনী থেকেও অধিক নিকটবর্তী। ” (আল-কুরআন, ৫০:১৬) এর অর্থ বুঝার চেষ্টা করেন। যখন আপনি আল্লাহর সাথে আপনার সত্যিকারের সুখ এবং প্রশান্তি খুঁজে পাবেন, তখন আপনি বুঝতে পারবেন এটি স্থায়ী। “এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। যে কেউ আল্লাহ ও রসূলের আদেশমত চলে, তিনি তাকে জান্নাত সমূহে প্রবেশ করাবেন, যেগুলোর তলদেশ দিয়ে স্রোতস্বিনী প্রবাহিত হবে। তারা সেখানে চিরকাল থাকবে। এ হল বিরাট সাফল্য।” (আল-কোরআন, ৪:১৩)।

“এই পৃথিবীটি কি তবে একটি স্বপ্ন যা ঘুমন্ত ব্যাক্তি দেখে – সে এতে কিছু মুহুর্তের জন্য আনন্দিত হয় এবং তারপরে বাস্তবতার সম্মুখীন হয়”। – হাসান আল-বাসরী