সৎকার সম্পর্কে ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি

muslim men at grave
Photo of the Young muslim man near the his father grave

বহু শতাব্দী ধরে হিন্দু সংস্কৃতি এবং অন্যান্য প্রাচীন পৌত্তলিক সংস্কৃতিতে প্রচলিত রয়েছে অগ্নিসৎকার রীতি। অর্থাৎ, মৃতদেহকে আগুনে পুড়িয়ে ছাই বানিয়ে ফেলার নিয়ম। ইসলামী শিক্ষা কখনও এটিকে সমর্থন করে না। বরং এর পরিবর্তে মৃতদেহ কবরস্থ করাকে সমর্থন করে।

কুরআন বলে, “তিনিই(আল্লাহ), যিনি মৃত্যু এবং জীবন সৃষ্টি করেছেন…” (আল কুরআন-৬৭:২) এই আয়াতে মৃত্যু কেবল ‘কোনো কিছুর সমাপ্তি’ বোঝায় না, বরং এটি একটি দীর্ঘপথের সূচনা মাত্র। বীজ যেমন বপন হয় করা হয়, তেমনি ফলন হয়। তেমনি দুনিয়াতে যারা সৎকর্ম করে কাটাবে তাঁদের আখিরাতের সূচনাটাও ভাল হবে। বারবার কুরআনে “যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে” তাদের প্রতি মনোনিবেশ করা হয়েছে; সুতরাং ঈমান পরিপূর্ণ হলে বাহ্যিক কর্মকান্ডও ভাল হয়ে যাবে।

বহু হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি যে, কবরের গভীরতা, এর আকার এবং মাটি থেকে এর উচ্চতা কতটুকু হওয়া উচিত। এছাড়া মৃতকে গোছল করানো ও কাফন পড়ানোর বিস্তারিত নিয়মও আমরা জানতে পারি।

একটি বিষয়টি লক্ষণীয় যে, ইসলামিক শিক্ষা অনুযায়ী মৃতের শরীরকে তিনবার ধৌত উচিতঃ প্রথমবার পানি ও বরই পাতার রস দিয়ে, দ্বিতীয়বার পানি ও কর্পূর দিয়ে এবং তৃতীয়বার বিশুদ্ধ পানি দিয়ে।

আল্লাহ বলেন, “প্রাণবন্ত সবকিছুকে আমি পানি থেকে সৃষ্টি করেছি” (আল কুরআন-২১:৩০)। সুতরাং নতুন দিগন্তের দিকে যাত্রার সময় একজন ঈমানদারের শরীরকে পানি দিতে ধৌত করা তার সত্তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

কুরআনে হাবিল কাবিলের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, যেখানে কাবিল অন্যায়ভাবে হাবিলকে হত্যা করেছিল এবং এ কারণে তাকে ‘ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভুক্ত’ বলা হয়েছে। কাবিল তার ভাইয়ের লাশকে কিভাবে লুকাবে সে নিয়ে চিন্তিত ছিল। সেসময় আল্লাহ একটি পাখি পাঠিয়ে দেন যেটি তাকে কবর দেওয়ার পদ্ধতি শিক্ষা দেয়। এরপর সে তার ভাইয়ের লাশকে দাফন করে। এটি ছিল মানবসৃষ্টির ইতিহাসে প্রথম কাউকে কবরস্থ করা।

নবীজী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, “অন্যায়ভাবে একটি মৃত কুকুরেরও অঙ্গহানি করা জায়েজ নয়”। এই হাদিস থেকে মুসলিম স্কলাররা এই মত ব্যক্ত করেছেন যে, ইসলামে একটি মৃত কুকুরকেও যেহেতু অঙ্গহানি করা হারাম তাই শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষেরও মৃত্যুর পর অঙ্গহানি করা নিঃসন্দেহে হারাম।

ধর্মতত্ত্ববিদরা বলছেন, এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য আরেকটি বিষয় কিয়ামতের দিন পুনরুত্থানের বিশ্বাসের সাথে সম্পর্কিত। কারণ ইসলামী বিশ্বাস সকল মৃতদেহ শেষবিচারের দিন পুনরুত্থিত হবে।

কবরস্থ করার রীতির পক্ষে ধর্মীয় মহলের দাবি, মৃতদেহেরও জীবিত দেহের ন্যায় সম্মান বাকি থাকে। মৃতদেহও আঘাত পেলে কষ্ট পায়। তাই ইসলাম জীবিতদের ন্যায় মৃতদেরকেও সম্মান দিয়েছে কবরস্থ করার মাধ্যমে এবং এটা নিছক কোনো মতবাদ নয় বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত বিধান।

এটা অবশ্য কারও যুক্তি হতে পারে যে, কুরআনে কোথাও সুস্পষ্টভাবে অগ্নিসৎকার নিষিদ্ধ হওয়ার কথা নেই এবং এমনকি এর কোনো আভাসও নেই। কিন্তু এক্ষেত্রে আমরা নবীজী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা পাই। তিনি সর্বদা মৃতদেরকে কবরে দাফন করেছেন এর ব্যতীত কখনও নবিজী থেকে ঘটেনি। আর নবীজীর সুন্নাহকে কুরআনে ‘উত্তম আদর্শ’ এবং ‘অনুকরণীয় বলে অভিহিত করা হয়েছে।

নবীজী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম মৃতকে গোছল করানো, কাফন-দাফন এবং জানাজা স্বয়ং আল্লাহর নির্দেশেই করেছেন। এবং সাহাবায়ে কেরামকে এভাবেই শিক্ষা দিয়ে গেছেন।  যেহেতু  “তিনি প্রবৃত্তির তাড়নায় কোনো কথা বলেন না। কুরআন ওহী, যা (তাঁর প্রতি) প্রত্যাদেশ হয়” (আল কুরআন-৫৩:৩-৪)। সুতরাং, এটি একটি স্বতঃসিদ্ধ রীতি এবং একটি মজবুত প্রথাগত রূপ যা শতাব্দীর পর শতাব্দী অবধি মুসলিমরা রক্ষা করে আসছে।