হজ্জের প্রতিটি পদক্ষেপে যেন আমরা আল্লাহর নিকটবর্তী হই

ID 32350544 © Hikrcn | Dreamstime.com

হজ্জ্বে আমরা আমাদের ইতিহাসকে শিখি। আদম(আঃ), হাওয়া(আঃ), হাজেরা(আঃ), ইবরাহিম(আঃ) এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘটনাগুলি যেন এখনও জীবিত রয়েছে। হজ্জ্বের সফরে আমরা যেন আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য তাদের সংগ্রামগুলিকেই দেখতে পাই। তাদের জীবনের কিছু প্রতিচ্ছবি যেন আমাদের সামনে ভেসে ওঠে। 

আমরা প্রতি পদে তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করি এই আশায় যে, যাতে আমাদের ইবাদত আরও গ্রহণযোগ্য ও প্রাণবন্ত হয়।

হজ্জ্বে আমরা আমাদের আমাদের বিচারের দিবসের অনুশীলন করি। পথভ্রষ্টতা ও দুর্ভাগ্য থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আমরা আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি।

আমাদের অতীত এবং আমাদের ভবিষ্যত হজ্জ্বে এসে একত্রিত হয়।

আমরা যখন আমাদের বাড়ি ছেড়ে হজ্জ্বের পথে রওয়ানা করি তখন আমরা অন্যায় ছেড়ে ধার্মিকতার দিকে যাত্রা করি। প্রতিটি পদক্ষেপে যেন আমরা আল্লাহর নিকটবর্তী হই। যখন আমরা আমাদের সাধারণ পোশাকগুলি খুলে ইহরাম পরিধান করি, তখন আমরা অহংকারকে সরিয়ে নম্রতার বেশ ধারণ করি।

“হজ্জ্ব হয় কয়েকটি নির্দিষ্ট মাসে, অতঃপর এ মাসগুলোতে যে কেউ হজ্জ্ব করার মনস্থ করবে, তার জন্য হজ্জ্বের মধ্যে স্ত্রী সম্ভোগ, অন্যায় আচরণ ও ঝগড়া-বিবাদ বৈধ নয় এবং তোমরা যে কোনো সৎ কাজই কর, আল্লাহ তা জানেন এবং তোমরা পাথেয়ের ব্যবস্থা করবে আর তাক্বওয়াই শ্রেষ্ঠ পাথেয়। হে বুদ্ধিমানরা! আমাকেই ভয় করতে থাক।” (আল কুরআন-২:১৯৭)

আমরা যখন কাবাকে তাওয়াফ করি তখন তা আমাদেরকে দুনিয়াতে আমাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য স্মরণ করিয়ে দেয়।

“এবং স্মরণ কর যখন আমি কাবাগৃহকে মানুষের জন্য মিলনকেন্দ্র এবং নিরাপদস্থল করলাম এবং বললাম, ‘মাকামে ইবরাহীমকে সলাতের স্থান হিসেবে গ্রহণ কর’ এবং ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে বলেছিলাম, ‘আমার গৃহকে তাওয়াফকারী, ই’তিকাফকারী এবং রুকূ ও সাজদাহকারীদের জন্য পবিত্র রাখবে।” (আল কুরআন-২:১২৫)

আমরা যখন সাফা এবং মারওয়াহর মধ্যে দৌড়াদৌড়ি করি তখন আমরা স্বীকার করি যে, হাজেরা(আঃ) এর মতো আমরাও আল্লাহ তা’আলা যা কিছু আমাদেরকে অনুগ্রহ দান করেছেন তার জন্য মরিয়া হয়ে পড়েছি।

“তোমাদের উপর তোমাদের পালনকর্তার অনুগ্রহ অন্বেষন করায় কোন গুনাহ নেই।” (আল কুরআন-২:১৯৮)

আমরা যখন মানবতার সমুদ্র দ্বারা বেষ্টিত আরাফাতে দাঁড়িয়ে থাকি, তখন তা আমাদেরকে হাশরের ময়দানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং এতে আমরা আল্লাহর নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করতে থাকি। এই একই জায়গায় আমাদের আদি পিতা ও মাতা আদম(আঃ) ও হাওয়া(আঃ) এর পৃথিবীতে সাক্ষাৎ ঘটেছিল।

“অতঃপর তওয়াফের জন্যে দ্রুতগতিতে সেখান থেকে ফিরে আস, যেখান থেকে সবাই ফিরে। আর আল্লাহর কাছেই মাগফেরাত কামনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাকারী, করুনাময়।” (আল কুরআন-২:১৯৯)

আমরা যখন মিনা ও মুজদালিফায় অবস্থান করি তখন তা আমাদেরকে আমাদের সীমাবদ্ধতা ও আমাদের রবের সীমাহীনতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং আল্লাহ আমাদের যে অনুশাসন দিয়েছেন তার জন্য আমাদেরকে কৃতজ্ঞ হতে সাহায্য করে।

“তোমরা নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহকে স্মরণ করবে; অতঃপর যে ব্যক্তি তাড়াতাড়ি ক’রে দু’দিনে চলে যায় তার প্রতি কোন গুনাহ নেই এবং যে ব্যক্তি অধিক সময় পর্যন্ত বিলম্ব করবে, তার প্রতিও গুনাহ নেই, এটা তার জন্য যে ব্যক্তি তাকওয়া অবলম্বন করবে এবং আল্লাহ্কে ভয় করতে থাকবে এবং জেনে রেখ, তোমরা সকলেই তাঁরই দিকে একত্রিত হবে।” (আল কুরআন-২:২০৩)

যখন আমরা জামারাতকে পাথর মারি, যেমন ইবরাহিম(আঃ) করেছিলেন, তখন আমরা শয়তানের দ্বারা বিপথগামী হওয়ার ক্ষমতা স্বীকার করি এবং সত্য নির্দেশনা পাওয়ার জন্য আমাদের আকাঙ্ক্ষা ও আন্তরিকতাকে আরও গভীর করি।

হজ্জ্বের সমস্ত ইবাদতই বাহ্যিকভাবে শারীরিক মনে হলেও প্রতিটা ইবাদতরেই কিছু আধ্মাতিক দিক রয়েছে।

“আল্লাহর কাছে ওগুলোর না গোশত পৌঁছে, আর না রক্ত পৌঁছে বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।” (আল কুরআন-২২:৩৭)

এই আয়াত হজ্জ্বের সারমর্মকে ফুটিয়ে তোলে। এটি আমাদের পালনকর্তার সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে শারীরিক কিছু ইবাদত পালন।

হজ্জ্বের মাধ্যমে এটি ফুটে ওঠে যে, আল্লাহকে পাওয়ার জন্য আমরা যেকোনো কষ্ট স্বীকার করতে রাজি আছি।

হজ্জ্বের সফরে শারীরিক কষ্ট হলেও প্রতিটা হজ্জ্বযাত্রীর মধ্যে একটি আলাদা আধ্মাতিক অনুভূতি জাগ্রত হয়ে ওঠে, যেটির স্বাদ অন্য কোনো ইবাদতের মাধ্যমে অর্জন করা যায় না।

এই আধ্যাত্মিক যাত্রার ফলাফল, এই আন্তরিক অভিপ্রায় এর সম্মানে আল্লাহ মকবুল হাজ্জ্বীদের জন্য জান্নাতের ওয়াদা করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, “কবুল হজ্জ্বের পুরষ্কার জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়।” (বুখারী)

আল্লাহ আমাদের সবাইকে হজ্জ্ব করার তাওফিক দান করুন। আমীন