হতাশা ও বিষণ্ণতার খোরাক বাড়িয়ে দিচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম

Teknologi Enkripsi
The concept of protecting personal data in the social network Facebook. Security social networks. Cheboksary, Russia. 4/22/2019

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর কল্যাণে আমরা এখন দুটো আলাদা জগতে আলাদা সত্তা ধারণ করে বাস করছি। একটা আমাদের বাস্তবের দুনিয়া, আরেকটা হচ্ছে তথাকথিত ভার্চুয়াল দুনিয়া। বর্তমানে প্রতিটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীই ভার্চুয়াল জগতে আরেকটি স্বতন্ত্র সত্তা ধারণ করেন। আর এই স্বতন্ত্র এতটাই যে অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবতার সঙ্গে তার বিন্দুবিসর্গ মিলও থাকে না। এই মাধ্যমগুলোর প্রতিটি প্রোফাইলই একেকটি আলাদা সত্তার বিমূর্ত রূপ।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর এই পরিমাণ ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় কী ধরনের পরিবর্তন সূচিত হয়েছে সেই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কারণ এসব মাধ্যমে মানুষ এত বেশি সময় ব্যয় করছে, এতটাই মগ্ন হয়ে পড়েছে যে কখনও কখনও তার বাস্তব জ্ঞান আর থাকছে না। বাস্তবতা তার কাছে নিরর্থক হয়ে মেকি ভার্চুয়াল দুনিয়াটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এতে করে মানুষের মনের ওপর স্বভাবতই চাপ পড়ছে, তার ভাবনা-চিন্তার পরিধি পাল্টে যাচ্ছে। বিশেষত ফেসবুক বর্তমানে তরুণ সমাজকে বেশি প্রভাবিত করছে। তরুণরা ফেসবুককে তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য উপাদান হিসেবে ধরে নিচ্ছে, তারা ফেসবুকের বিকল্প ভাবতে পারছে না। মেকি ভার্চুয়াল দুনিয়ায় এভাবে নিজেকে বিকিয়ে দেয়ার ফলে তরুণ সমাজ আজকে তাদের সমস্ত মানসিক উদ্যম হারিয়ে ফেলেছে। তারা হয়ে পড়েছে মানসিকভাবে অসুস্থ, অস্থিরচিত্ত, বিষণ্ণ। মানুষের সামগ্রিক মানসিক সুস্বাস্থ্যের পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো।

ফেসবুকের কল্যাণে আমরা এখন আমাদের বন্ধু বা চারপাশের মানুষজনের হাঁড়ির খবর জানতে পারছি। কিন্তু সমস্যা সৃষ্টি হয় তখন যখন আমরা তার সঙ্গে নিজেদের হাঁড়ির তুলনা শুরু করি। আর যখনই আমাদের হিসেব মেলে না তখনই যত ঝুট-ঝামেলা উঁকি দেয়। অন্যের সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে আমাদের অবস্থা হয়, ‘সবার অঙ্ক মেলে, আমার অঙ্ক মেলে না।’ কারণ আপনি যখন অন্যের সঙ্গে নিজের তুলনা করেন তখন সবসময় নিজের অবস্থাকে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরেন। আপনার বন্ধুর ট্যুরে যাওয়ার ছবি দেখে আপনার মনে হয়, ট্যুরে কেন আমি যেতে পারছি না। তখন আপনি নিজের ব্যর্থতার কারণ খুঁজতে গিয়ে বন্ধুর সঙ্গে নিজেকে তুলনা করা শুরু করেন। আর তখনই ঘটে যত বিপত্তি।

বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন তার আপেক্ষিকতা তত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কৌতুক করে বলেছিলেন, আপনার হাত গরম উনুনের ওপর এক মিনিট রাখুন, দেখবেন এক ঘণ্টা মনে হবে। সুন্দরী একটা মেয়ের পাশে এক ঘণ্টা ধরে বসে থাকুন, মনে হবে মাত্র এক মিনিট বসেছেন।

ফেসবুকে বসলে আমাদের আর সময় জ্ঞান থাকে না, এ এক অমোঘ সত্য। আমরা অল্প কিছুক্ষণের জন্য ফেসবুকে থাকব মনে করলেও নিজেদের অজান্তেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ফেসবুকে ব্যয় করি। কখনও নিউজফিডে অলস স্ক্রলিং আবার কখনও অপরিচিত ব্যক্তির প্রোফাইল ঘেঁটে দেখা (Stalking)- এসব কাজেই আমাদের মূল্যবান সময় অপচয় হয়। এ ছাড়া রয়েছে চ্যাটিংয়ের ব্যবস্থা। অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় হতে বাস্তবে অনেকেই অপছন্দ করলেও ভার্চুয়াল দুনিয়ায় তাতে মোটামুটি সবাই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে কারণ এখানে দায়বদ্ধতার বালাই নেই। সোজা কথায়, ফেসবুক আমাদের সময় ‘খেয়ে নেয়।

আজকালকার দুনিয়ায় প্রেম করার সর্বশ্রেষ্ঠ হাতিয়ার হচ্ছে ফেসবুক। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে প্রেমের সূচনাও হয় ফেসবুকে। ফেসবুকে ছবি দেখে প্রেম, তারপর বাস্তবের রূপ দেখে থ বনে যাওয়া- এ নিয়ে তো কত গল্প, কৌতুক প্রচলিত আছে। কিন্তু আসল কথা হলো, ফেসবুক প্রেমের আমেজ দিতে যতটুকু না সাহায্য করছে তার চেয়ে বেশি কষ্ট দিচ্ছে ব্রেকআপের পর। অধিকাংশ ব্যর্থ প্রেমিক/প্রেমিকাই প্রেম ভেঙ্গে যাওয়ার পরে প্রাক্তনের প্রোফাইল নিয়মিত ঘুরে বেড়ান। এতে যে দুঃখ বাড়ে তা হয়তো শতভাগ জোর দিয়ে বলা যায় না, কিন্তু সুখের মাত্রাটা যে ইতিবাচক রেখার দিকে বৃদ্ধি পায় না তা হলফ করে বলা যায়। ফলাফল আবারও বিষণ্ণতায় ডুবে যাওয়া। প্রাক্তন যদি নতুন প্রেমে পড়ে আর তার অভিসারের কর্মকান্ড ফেসবুকে প্রকাশ করে তাহলে তো একেবারে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। না পাওয়ার বেদনা করুণ কিন্তু যদি দেখা যায় সেই ঈপ্সিত বস্তু অন্য কেউ খুব সহজে অধিকার করে নিয়েছে তাহলে সেই কষ্ট অপার্থিব।