হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এবং সত্যের উপলব্ধি

jake-givens-ocwmWiNAWGs-unsplash
Fotoğraf: Jake Givens-Unsplash

পর্ব-০১ 

রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে পুরো জাহানের জন্য হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এক রহমতস্বরূপ। ছোটবেলা থেকেই নবীজি তৎকালীন প্রচলিত ভ্রান্ত রীতি-নীতি অনুসরণ করতেন না। ফলে তার আশেপাশে মূর্তি, অর্থ, খ্যাতি বা মর্যাদা কোন কিছুই তার স্রষ্টা হতে পারেনি। বরং সত্যকে উপলব্ধি করার জন্য তিনি বারবার হেরা পর্বতের গুহায় চলে যেতেন।

৬১০ খ্রিস্টাব্দের রমজান মাস। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) প্রায় পুরোটা সময় তার কেটে যাচ্ছিল আত্মনিমগ্নয়। তখন তার বয়স ৪০ বছর ১১ দিন। তখনই ঘটলো এক ঘটনা। রমজানের শেষ দশকে সম্ভবত ২৭ তারিখে সামনে দেখা দিলেন এক অলৌকিক সত্তা। পরিচয় দিলেন নিজের- ‘আমি জিবরাইল’। মুহাম্মদ এর পরের ঘটনার বর্ণনায় বলেন –

‘জিবরাইল বলল, পড়ো!’ আমি জবাবে বললাম, ‘আমি পড়তে জানি না।’ তখন জিবরাইল আমাকে জাপটে বুকে চেপে ধরলে আমার মনে হলো আমি মরে যাচ্ছি। আবার বললাম, ‘আমি পড়তে জানি না।’। এইভাবে তিন বার বুকে চেপে ধরার পর আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, ‘কী পড়ব?’

জিবরাইল তখন বলল-‘পড়ো! তোমার সৃষ্টিকর্তা প্রভুর নামে।

যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন নিষিক্ত ডিম্ব থেকে

পড়ো! তোমার প্রতিপালক মহান দয়ালু।

তিনি মানুষকে জ্ঞান দিয়েছেন কলমের।

আর মানুষকে শিখিয়েছেন, যা সে জানত না।’ (সূরা আলাক : ১-৫)

আমি পড়লাম।

জিবরাইল আমাকে ছেড়ে চলে গেল। আমি অস্থির ভাবনায় ডুবে গেলাম।

উস্কোখুস্কো কবিদের আমার মোটেই পছন্দ না। আমার মনে হলো, কোরাইশরা সব শুনলে আমাকে ওদের (কবিদের) দলেই ফেলে দেবে। নানা ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়ে আমি পাহাড়ের ওপরদিকে উঠতে শুরু করলাম…

হঠাৎ ওপর থেকে শুনি শব্দ ভেসে আসছে–‘আমি জিবরাইল। মুহাম্মদ, আপনি আল্লাহর রসুল।’

আমি ওপরদিকে তাকালাম, আমি জিবরাইলকে দেখলাম মানুষের রূপে–পা মাটিতে আর দেহ দিগন্তবিস্তৃত।

সে আবার বলল, ‘মুহাম্মদ, আপনি আল্লাহর রসুল। আর আমি জিবরাইল।’ আমি স্থাণুর মতো তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।

নড়ার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেললাম। দৃষ্টি ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু যেদিকে তাকাই দিগন্তবিস্তৃত তাকেই দেখতে পাই।

একসময় সে দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেল। আমি ঘরে ফিরে এলাম।’

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এই ঘটনার পর হেরা গুহা থেকে কাঁপতে কাঁপতে ঘরে ফিরে এলেন। তিনি তার স্ত্রী খাদিজা (রাঃ) কে বললেন ‘ আমাকে কম্বল দিয়ে ঢেকে দাও।’ খাদিজা তাকে কম্বল দিয়ে ঢেকে দিলেন। অনেকক্ষণ পর হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর কাঁপুনি থেমে আস্তে আস্তে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলেন। এরপর তিনি বিস্ময়ের সাথে তার স্ত্রী খাদিজা কে জিজ্ঞেস করলে ‘ আমার কি হয়েছে?’ তিনি পুরো ঘটনাটি সবিস্তারে খাদিজাকে বর্ণনা করলেন, এবং তিনি বললেন, ‘ আমার ভয় হচ্ছে’। খাদিজা উত্তরে বললেন, ‘আপনার ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আপনি বিশ্রাম নিন। আল্লাহ আপনার কোনো অমঙ্গল করতে পারেন না। কারণ আপনি সত্যবাদী, দানশীল, অতিথিপরায়ণ ও ভালো কাজে এবং অন্যের প্রয়োজনে সাহায্যকারী। আপনি ঠিক দেখেছেন। আমি বিশ্বাস করছি, আপনি আল্লাহর রসুল।’

এরপর স্ত্রী খাদিজা হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কে নিয়ে মক্কায় গেলেন। সেখানে খাদিজা তার চাচাতো ভাই প্রাজ্ঞ ওয়ারাকা ইবনে নওফেলের কাছে গেলেন। মুহাম্মদের জবানিতে সব কথা শুনে বর্ষীয়ান অন্ধ ওয়ারাকা বললেন, ‘নিঃসন্দেহে তুমি তওরাত ও বাইবেলে উল্লেখিত সেই প্রতিশ্রুত রসুল! । এই বাণীই মুসার ওপর নাজিল হয়েছিল। বড় ইচ্ছা হয়, আমি যদি তরুণ হতাম তাহলে এই নগরের অধিবাসীরা যখন তোমাকে নগর থেকে বের করে দেবে, তখন আমি তোমার পাশে থাকতাম।’ বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে তিনি ওয়ারাকাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘নগরবাসীরা আমাকে বের করে দেবে কেন?’ ওয়ারাকা বললেন, ‘আসলে শত্রুতার মুখোমুখি না হয়ে কোনো নবীই সত্যবাণী প্রচার করতে পারে নি। আমি যদি ততদিন বেঁচে থাকি আমি অবশ্যই তোমাকে সমর্থন করব।’ কিন্তু কয়েকদিন পরই ওয়ারাকা মারা গেলেন।

(চলবে)