হাজেরা ও ইসমাইল আ’লাইহিস সালামের ঘটনায় আমরা কী শিক্ষা পাই?

আকীদাহ ২৮ জুলাই ২০২০ Contributor
Silhouette of two men praying
Concept of the Islamic religion. Silhouette of two men praying on the background of the town hall at dawn

হাজেরা(আঃ) হযরত ইবরাহিম(আঃ) এর পুণ্যবতী স্ত্রী ও হযরত ইসমাইল(আঃ) এর মা। হযরত ইসমাইল(আঃ) তখন একবারে দুগ্ধপোষ্য শিশু।
এই সময় আল্লাহ
 তা’আলার ইচ্ছা হল, তিনি হযতর ইসমাইল(আঃ) এর সন্তানের হাতে মরুময় মক্কাকে আবাসযোগ্য বাসভূমিতে পরিনত করবেন।

তিনি হযরত ইবরাহিম(আঃ) কে হুকুম দিলেন, হাজেরা(আঃ) ও  ইসমাইলকে ভয়াবহ মরু ময়দানে একা রেখে আসতে। এ ছিল এক কঠিন পরীক্ষা!

 

কী পরীক্ষা?

একদিকে বৃদ্ধ বয়সে ইসমাইল(আঃ) কে সন্তানরূপে পেয়ে তাঁর অপত্য ছিল প্রবল। অন্যদিকে মক্কার মরুভূমিতে বসবাস ছিল কঠিন।  সেখানে না ছিল জনমানব, না ছিল খাদ্য পানীয়। তাও হযরত ইবরাহিম(আঃ) আল্লাহর আদেশ পালন করলেন। তাদেরকে এক মশক পানি ও এক থলি খোরমা দিয়ে সেখানে রেখে আসলেন।

আসার সময় হাজেরা (আঃ) তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে স্বামী, আমাদেরকে একাকী কোথায় ছেড়ে যাচ্ছেন?’
ইবরাহিম(আঃ) কোনো উত্তর দিলেন না।
হাজেরা (আঃ) কাতর স্বরে পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এটা
 কি আল্লাহর আদেশ?’
খালিলুল্লাহ বললেন, ‘হাঁ!’

এইকথা শোনার পর হাজেরা(আঃ) কিছুটা স্থিরচিত্ত হলেন। খোরমা আর পানি খেয়ে কয়েকদিন চলল।
অবশেষে একদিন
 এল যখন খোরমা ও পানি ফুরিয়ে গেল। দুজনেরই ক্ষুধা ও পিপাসা চরমে পৌঁছাল।
পিপাসার তাড়নায় মরুভুমির উত্তাপে শিশু ইসমাইল ছটফট করতে
 লাগলেন।
মা ও ছেলের প্রাণ ওষ্ঠাগত হওয়ায়
পানির সন্ধানে হাজেরা(আঃ) দৌড়াদৌড়ি করতে লাগলেন।

ছাফা পাহাড়ে উঠে চতুর্দিকে পানির সন্ধান করতে লাগলেন। কোথাও পানির লেশমাত্র দেখতে পেলেন না।
সেখান হইতে নেমে আবার
 মারওয়া পাহাড়ের দিকে ছুটলেন।  কিন্তু কোথাও বিন্দুমাত্র পানির সন্ধান পেলেন না।

পানির সন্ধানে দৌড়

উভয় পাহাড়ের মধ্যবর্তী এলাকা নিচু ছিল। যতক্ষণ এই সমতল ভূমিতে চলতেন, তখন ছেলেকে করুণ পরিস্থিতিতে দেখতে পেতেন। কিন্তু খাদে নামলে ছেলেকে আর দেখা যেত না। তাই তিনি ঐ স্থানটুকু ছুটে অতিক্রম করতেন।
এইভাবে হাজেরা(আঃ) এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে পানির সন্ধানে ছুটে যেতেন
। বর্তমানে উভয় পাহাড়ের মধ্যবর্তী নিম্নভূমিও সমতল ভূমি হয়ে গিয়েছে।

 বিবি হাজেরার এই দৌড়ানো আল্লাহ তা’আলার পছন্দ হল। তিনি হাজীদের উক্ত স্থানে সাতবার দৌড়ানো ইবাদতে পরিণত করে দিলেন!

অবশেষে হাজেরা(আঃ) মারওয়া পাহাড়ে চড়ে এক গায়েবী আওয়াজ শুনতে পেলেন।

পুনরায় ঐ আওয়াজ অস্পষ্টভাবে শুনতে পেলেন, কিন্তু কাউকে দেখতে পেলেন না।

তিনি বললেন, আমি আওয়াজ শুনিতে পাচ্ছি, যদি কেউ এমন বিপদের সময় আমাদেরকে সাহায্য করিতে চায়, তবে সে আগিয়ে আসতে পারে। তৎক্ষণাৎ বর্তমান যমযম কুপের জায়গায় একজন ফেরেশতাকে দেখা গেল।

ফেরেশতা মাটিতে আঘাত করায় মাটি ভেদ করে পানি উঠতে লাগল। মরুভুমিতে এভাবে পানি ওঠা দেখে তিনি বিস্মিত হলেন। 

 তারপর নিজে পানি পান করলেন, ছেলেকে পান করালেন, মশক ভরে পানি রাখলেন।

ফেরেশতা তখন বললেন, ‘আপনি চিন্তিত হবে না। এখানে আলাহর ঘর ‘খানায়ে কাবা’ রয়েছে। এই ছেলেই বড় হয়ে তাঁর পিতার সাথে মিলিত হয়ে এই ঘর মেরামত করবেন। এই ভয়াবহ  মরুভূমি আবাদি জমিতে পরিণত হবে।

বিশ্বাস ও ভরসার নিদর্শন

দেখতে দেখতে সবকিছুই বাস্তবায়িত হতে লাগল। এক মরু কাফেলা পানির সন্ধান পেয়ে সেখানে বসতি স্থাপন করল। যথাসময়ে ইসমাইল(আঃ) এর বিবাহ সম্পন্ন হল।

তখন আল্লাহর আদেশ প্রাপ্ত হয়ে হযরত ইবরাহীম(আঃ) সেখানে উপস্থিত হলেন। পিতা-পুত্র মিলে খানায়ে কাবা পুনঃনির্মান করলেন, যেহেতু নূহ(আঃ) এর সময়ের প্লাবনে তা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে গেছিল। যমযমের পানি ঐ সময় বিস্তৃত হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে তা কুপের আকার ধারণ করে।

হাজেরা(আঃ) এর আল্লাহর উপর ভরসা ছিল অপরিমেয়। তাই একাকী মরুভূমিতে অবস্থান আল্লাহর হুকুম জানতে পেরে তিনি একেবারে শান্ত  হয়ে গেছিলেন।

অবশেষে এই ভরসার বদৌলতে কত নিয়ামতই না জাহির হল। তাঁর  দৌড়াদৌড়িই হাজিদের জন্য ইবাদতে পরিণত হয়ে গেল।
মকবুল বান্দার অতি সাধারণ কার্যগুলিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে
 স্বীকৃত হয়। এর শত শত নজির ইতিহাসে বিদ্যমান আছে।
সুতরাং, সর্বাবস্থায় আমাদের উচিত
 আল্লাহর উপর নির্মল আস্থা ও ভরসা রাখা, নিরাশ না হওয়া।