হাতির দাঁতের শিল্পদ্রব্যের জন্য ঐতিহাসিকদের চোখের মণি নিমরুদ

সংস্কৃতি Contributor
জানা-অজানা
হাতির দাঁতের
LONDON, UK, BRITISH MUSEUM - Ivory back-rest from Nimrud, 8th century BC. Photo: Dreamstime

সালটা ১৮৪৫, উত্তর ইরাকের বিভিন্ন অঞ্চলে খননকার্য চালাতে শুরু করেছেন বিখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ অস্টেন হেনরি লেয়ারেড। উদ্দেশ্য, মেসোপটেমিয়া সভ্যতার নিদর্শন খুঁজে বের করা। আসলে, লেয়ারেডের উদ্দেশ্য ছিল বাইবেলে বর্ণিত নিনেভে শহর খুঁজে বের করার। কিন্তু তিনি জানতেন না, নিনেভে শহরের বদলে তিনি আবিষ্কার করবেন অ্যাসিরীয় সভ্যতার অন্যতম কৃষ্টি ও সংস্কৃতিপূর্ণ শহর কালহু, আধুনিক সময়ে যাকে বলা হয় নিমরুদ। যে শহর ক্রমে পরিচিত হয়ে উঠবে তার হাতির দাঁতের অনবদ্য কারুকার্য ও শিল্পের জন্য।

অ্যাসিরীয় সভ্যতার পতন হয় খ্রিস্টের জন্মের প্রায় ৬১২ বছর আগে, নিমরুদও একই সময়ে তলিয়ে যায় কালের গর্ভে। হারিয়ে যায় মেসোপটেমিয়া সভ্যতার অজস্র নিদর্শন। ১৮৪৯ সালে, শতবর্ষের বালির তলা থেকে পুনরায় খুঁজে পাওয়া যায় এই শহর।

নিমরুদের আবিষ্কার ও হাতির দাঁতের কারুকার্যের ইতিহাস

লেয়ারেড প্রাথমিকভাবে নিমরুদের কিছুটা আবিষ্কার করলেও, বাকি খননকার্যের দায়িত্ব পড়ে আরেক প্রত্মতাত্ত্বিক উইলিয়াম কে লোফতাসের উপর। তিনি ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে পুনরায় কাজ শুরু করেন উত্তর ইরাকের ঐ নির্দিষ্ট অঞ্চলে। জানা যায়, এই খননকার্যের ফলেই আবিষ্কৃত হয় হাতির দাঁতের অজস্র শিল্প। যে শিল্পের জন্যই নিমরুদ ঐতিহাসিক, প্রত্নতাত্ত্বিক ও শিল্প ব্যবসায়ীদের নয়নের মণি।

ইতিহাস থেকে যানা যায়, প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় নিমরুদের নাম ছিল কালহু বা কালেহ। সম্রাট দ্বিতীয় অসুরনাসিরপালের সময়, অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব ৮৮৪ সনে এই শহর ছিল অ্যাসিরীয় সভ্যতার রাজধানী। পরবর্তীতে রাজধানী আসুরে স্থানান্তরিত হলেও, কালহু বা নিমরুদ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র।

শহরের সৌন্দর্য ছিল অসামান্য। প্রাসাদ ও অন্যান্য উপাসনাগৃহ গুলি সোনার পাতে মোড়া ছিল, তার সঙ্গে নানা দামী রত্ন ছিল অলংকরণে। বিশেষ করে, হাতির দাঁতের ব্যবহার ছিল বহুলাংশে।

কথিত আছে, নিমরুদের শাসকদের পাদুকাদানিও নাকি হাতির দাঁতের উপর সোনার গিলটি করে তৈরি করা হত।

হাতির দাঁতের এই অনুপম কাজ সারা বিশ্বের কাছে এখন নিমরুদ আইভরি নামে পরিচিত হয়ে রয়েছে।

নিমরুদ আইভরির গুরুত্ব

নিউ ইয়র্কের মেট্রোপলিটান সংগ্রহশালার ঐতিহাসিক ও কিউরেটর জোন লাইনস জানালেন,

“নিমরুদ আইভরির সবচেয়ে উল্লেখ্য বিষয় হল এর অপূর্ব সূক্ষ্ম কারুকাজ। এত নিখুঁত ও পুঙ্খানুপুঙ্খ কারুকাজ থেকে সহজেই অ্যাসিরীয় সভ্যতার বিষয়ে নানা কিছু জানা যায়। ধারণা করা হচ্ছে, মূলত প্রাসাদ গাত্রের টালি থেকে আরম্ভ করে সিংহাসন, কেদারা, টেবিল, বিছানা ও গয়নার বাক্স পর্যন্ত সবই হাতির দাঁতের তৈরি ছিল। হাতির দাঁত ছিল রাজকীয়তার প্রতীক।”

এই হাতির দাঁত আসত মূলত সিরিয়া থেকে, সেখানে নয়ের শতকের আগে পর্যন্ত হাতি দেখা যেত। তারপর অবশ্য বিলুপ্ত হয়ে যায়। অবশ্য, অনেক সময় অন্য রাজ্য থেকে উপহার হিসাবে হাতির দাঁতের কারুকাজ করা দ্রব্য সামগ্রী পাঠানো হত সম্রাটদের কাছে।

লেয়ারেড ও লোফতাসের খননকার্যের ফলে অজস্র এরকম হাতির দাঁতের শিল্প দ্রব্য আবিষ্কৃত হয়। এর ফলে ঐতিহাসিকদের গবেষণায় প্রভূত সাহায্য হচ্ছিল। কিন্তু, কিছু সরকারি সমস্যার জন্য নিমরুদের খননকার্য বহুদিন বন্ধ রাখতে হয়।

খননকার্যের পুনরায় সূচনা

১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে, ঐতিহাসিক ম্যাক্স ই ম্যালোয়ান পুনরায় নিমুরুদের খননকার্য শুরু করেন। তিনি ছিলেন বিখ্যাত রহস্য ঔপন্যাসিক অগাথা ক্রিস্টির স্বামী। তিনি ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত খনন চালান। নিমরুদ প্রত্নতাত্বিক অঞ্চলের শ্রেষ্ঠতম নিদর্শনগুলি তিনিই আবিষ্কার করেছেন। তাঁর আবিষ্কারের মধ্যে উল্লেখ্য ‘পোড়া প্রাসাদ’ ও ‘মোনালিসা’।

পোড়া প্রাসাদ আদতে একটি সম্পুর্ণ হাতির দাঁত দিয়ে তৈরি প্রাসাদ, যা আগাগোড়া সোনার পাতে মোড়া ছিল। আর তার কাছেই একটি কুয়ো থেকে পাওয়া হাতির দাঁতে-র নারী মূর্তি মোনালিসা, এত অপূর্ব তার কারুকাজ যে দেখলে সত্যি মানুষ বলে ভ্রম হয়।

খ্রিস্টপূর্ব ৬১২ সনে অ্যাসিরীয় সভ্যতার পতন ঘটে। ব্যাবিলোনিয় ও পারসিকরা যথেচ্ছ লুঠপাট চালায় বিভিন্ন শহর জুড়ে। প্রাসাদের গা থেকে সোনার পাত খুলে নিয়ে বহুক্ষেত্রেই প্রাসাদ জ্বালিয়ে দেওয়া হত। হাতির দাঁত লুঠ করা হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা নষ্ট করে দেওয়া হত। ঐতিহাসিক জোন লাইনসের মতে ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত, কারণ তখনও হাতির দাঁতে-র মূল্য ছিল অপরিসীম।

কোথায় রয়েছে এখন নিমরুদের হাতির দাঁতের শিল্পদ্রব্য?

বর্তমানে বিশ্ব জুড়ে নানা সংগ্রহশালায় গেলে পাওয়া যাবে এই হাতির দাঁতের শিল্পকর্মগুলি। বিশেষ করে ইরাকের সুলাইমানিয়া সংগ্রহশালা, বাগদাদের জাতীয় সংগ্রহশালা, লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়াম ও নিউ ইয়র্কের মেট্রোপলিটান সংগ্রহশালা এর মধ্যে উল্লেখ্য। নিমরুদের হাতির দাঁতের কারুকাজ আসলে আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখায়, মানুষের রুচি ও সৌন্দর্য বোধ ঠিক কতটা উচ্চতায় পৌঁছতে পারে।

Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.