হাদিসে বর্ণিত সাত জমিন বলতে কী বোঝায়?

আকীদাহ Contributor
মতামত
সাত জমিন
© Stevanzz | Dreamstime.com

রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লমের সুন্নাহ ও হাদিস হল ইসলামের ২য় উত্স। কুরআনের মতো সুন্নাহ ও হাদিসের মধ্যেও অনেক বৈজ্ঞানিক তথ্য রয়েছে। এই নিবন্ধে এমনই একটি তথ্য নিয়ে আলোচনা করা হবে। বিভিন্ন হাদিসে সাত আসমানের পাশাপাশি সাত জমিনের কথাও বলা হয়েছে। এর মধ্যে দুটি হাদিস নিম্নরূপঃ

১ম হাদীস

রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

“কেউ যদি অন্যায়ভাবে কারও এক বিঘত জমিও দখল করে থাকে, তবে কিয়ামতের দিবসে ঐ জমি বরাবর সাত তবক জমিন তার গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হবে।” (বুখারী)

২য় হাদীস

রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

“কেউ যদি অন্যায়ভাবে কারও এক বিঘত জমিও দখল করে থাকে, সে কিয়ামতের দিবসে ঐ জমি বরাবর সাত তবক জমিনের নিচে সে ডুবে যাবে।” (বুখারী)

এই হাদিসসমূহে অন্যায়ভাবে কারও জমি দখল করার ভয়াবহ পরিণতি উল্লেখিত হয়েছে।

কিন্তু হাদিসে সাত জমিন বলতে কি বোঝানো হয়েছে?

সাত জমিন প্রসঙ্গ নিয়ে বর্তমানকালে ভূতত্ত্ব এটি প্রমাণ করেছে যে, পৃথিবীর মাটি সাতটি স্তর দ্বারা গঠিত। এই সাতটি স্তরকে ভূতও্ববিদরা তিন ভাগে বিভক্ত করেছেন। ১) অশ্মমন্ডল ২) গুরুমন্ডল ৩) কেন্দ্র মন্ডল

অশ্মমন্ডল

পৃথিবীর অভ্যন্তরের উপরের অংশকে অশ্মমন্ডল বলে। এ স্তর নানা প্রকার শিলা, খনিজ পদার্থ দ্বারা গঠিত হয় বলে একে শিলামন্ডল-ও বলা হয়। এর গভীরতার স্থান বিশেষে ৩০-৪০ কি:মি: পর্যন্ত বলা হয়ে থাকে। যেসকল উপাদান দ্বারা এ স্তর গঠিত তার মধ্যে অক্সিজেন, সিলিকন,অ্যালুমিনিয়াম, লৌহ,ক্যালসিয়াম, সোডিয়াম, পটাসিয়াম প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

অশ্মমন্ডল দুটি স্তরে বিন্যস্ত। ১) ভূত্বক ও ২) ভূত্বকের বাইরের অংশ।

ভূত্বকঃ ভূমির উপরের কঠিন আবরণকে ভূত্বক বলে। এটি অশ্মমন্ডলের উপরিভাগ। এর গভীরতা ৩-৪০ কি:মি: পর্যন্ত এবং গড় গভীরতা প্রায় ১৭কি:মি:। এর আপেক্ষিক গুরুত্ব ২.৮-৩.৪। ভূত্বক নানা প্রকার শিলা ও খনিজ উপাদানে গঠিত এবং ভূত্বকের নিচের অংশ প্রায় একইভাবে সমসও্ব উপাদান দিয়ে গঠিত। শিলা গঠনের মূল উপাদান হলোঃ অক্সিজেন, সিলিকন, অ্যালুমিনিয়াম, লৌহ, ক্যালসিয়াম, সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম। শিলা গঠনকারী এ উপাদানগুলোর মধ্যে অক্সিজেন এবং সিলিকন প্রায় ৭৩% ও অন্যান্য উপাদান ২৭% বিদ্যমান।

ভূকম্পনীয় তরঙ্গের গতিবেগ লক্ষ্য করে ভূত্বক গঠনকারী শিলাকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে।

লঘু শিলাঃ এটি ভূত্বকের বাইরের স্তর। এ স্তরে গ্রানাইডের পরিমাণ বেশি। তাই একে গ্রানাইড শিলা স্তর ও বলা হয়। এর আপেক্ষিক গূরুত্ব ২.৭৫-২.৯৫। গ্রানাইডে সিলিকা এবং অ্যালুমিনিয়াম এর পরিমাণ বেশি। এর গড় গভীরতা ১২.৮কি:মি: প্রায়।

গুরু শিলাঃ এটি লঘু শিলার নিচের স্তর। এ স্তর ব্যসাল্ট জাতীয় শিলা দ্বারা গঠিত। এখানে সিলিকা ও ম্যাগনেসিয়াম এর পরিমাণ বেশি থাকে। তাই একে ‘সিমা’-ও বলা হয়। এ স্তরের আপেক্ষিক গুরুত বেশী বলে এর মধ্য দিয়ে তরঙ্গ প্রতি সেকেন্ডে ৭ কি:মি: বেগে প্রবাহিত হয়। এর গভীরতার স্থান ২০-৩২ কি:মি:।

অলিভিল শিলাঃ এ অংশে খনিজের পরিমাণ অনেক বেশি। এ স্তরে ভূতরঙ্গের গতিবেগ বৃদ্ধি পেয়ে সেকেন্ডে ৮ কি:মি: পর্যন্ত হয়ে যায়। অলিভিন খনিজ ম্যাগনেসিয়াম লৌহ, সিলিকেটের সমন্বয়ে গঠিত। এর আপেক্ষিক গুরুত্ব প্রায় ৩.৩।

গুরুমন্ডল

কেন্দ্রমন্ডল হতে উপরে প্রায় চতুর্দিকে ২৮৯৫কি:মি: পর্যন্ত বিস্তৃত মন্ডলটিকে গুরু মন্ডল বলা হয়। সিলিকন, ম্যাগনেসিয়াম প্রভৃতি ভারী ধাতুর সংমিশ্রনেই এ মন্ডলটি গঠিত। ঘনত্ব অনুসারে ধাতু গুলোর সংবিন্যাস নিচ হতে উপরের দিকে প্রায়ই ক্রমে গুরু হতে লঘু। এর উপরাংশ ১৪৪৮ কি:মি: ব্যাসাল্ট জাতীয় উপাদানে গঠিত। তাই একে ‘ব্যাসল্ট জোন’-ও বলা হয়। এ মন্ডলটি বেশ উওপ্ত। এর আপেক্ষিক গুরুত্ব প্রায় ৮। অনেক ভূত্ত্ববিদদের মতে প্রচন্ড চাপে এর উপাদানগুলো তরল ও কঠিন এর মধ্যবর্তী অর্থ্যাৎ কর্দমাক্ত অবস্থায় রয়েছে।

গুরুমন্ডল তিনটি স্তরে বিন্যস্ত। ১) উর্ধ্ব গুরুমন্ডল, ২) মধ্য গুরুমন্ডল ও ৩) নিম্ন গুরুমন্ডল

উর্ধ্ব গুরুমন্ডলঃ এ মন্ডল সাধারণত লোহা ম্যাগনেশিয়াম ও সমৃদ্ধ সিলিকেট খনিজ দ্বারা গঠিত। এতে অলিভিন ও পাইরক্সিন বিদ্যমান। এ স্তরের গভীরতা প্রায় ১০-১১ কি:মি: পর্যন্ত এবং তরঙ্গের বেগ প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৬.৯-৮.১ কি:মি:।

নিম্ন গুরুমন্ডল: এ মন্ডল ৭০০-২৮৮৫ কি:মি: বিস্তৃত। এ স্তর আয়রন অক্সাইড,ম্যাগনেসিয়াম অক্সাইড এবং সিলিকেট ডাই অক্সাইড খনিজ মিশ্রনে গঠিত। এখানে তরঙ্গের বেগ প্রতি সেকেন্ডে অরায় ১০.৭ কি:মি:।

কেন্দ্র মন্ডল

পৃথিবীর ব্যাসার্ধ প্রায় ৬৪৩৪ কি:মি:। পৃথিবীর কেন্দ্রের চারদিকে প্রায় ৩৪৭৫ কি:মি: ব্যাসার্ধের একটি গোলক অবস্থিত। এই গোলকটির নাম কেন্দ্রমন্ডল। এর আপেক্ষিক গুরুত্ব ১০-১৩.৬। এ স্তর লৌহ, নিকেল, পারদ, সিসা প্রভৃতির ন্যায় কঠিন ও ভারী পদার্থ দ্বারা গঠিত। এ স্তরে সবচেয়ে নিকেল ও লৌহের পরিমাণ বেশি থাকায় একে ‘নাইফ’ বলা হয়।

কেন্দ্রমন্ডল ২টি স্তরে বিন্যস্ত। ১) বাইরের অংশ ২) ভেতরের অংশ।

বাইরের অংশঃ কেন্দ্রমন্ডলের বাইরের অংশ তরল। এর বিস্তৃতি প্রায় ২২৫০ কিঃমিঃ। এ অংশের মধ্য দিয়ে ভূমিকম্পের তরঙ্গ ধীরগতিতে প্রবাহিত হয়।

ভেতরের অংশঃ কেন্দ্রমণ্ডলের ভিতরের অংশ কঠিন বলে অনুমান করা হয়। এ অংশটি পৃথিবী হতে প্রায় ১২২৫ কি:মি: ব্যাসার্ধের মধ্যে কঠিন অবস্থায় রয়েছে এবং তা নিকেল ও লৌহ দ্বারা গঠিত। কেন্দ্রমন্ডলের ধাতব প্রকৃতির উপরই পৃথিবীর চুম্বকত্ব বহুলাংশে নির্ভরশীল।

এই হচ্ছে আমাদের সাতটি স্তরে বিন্যস্ত পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠন! সুতরাং, হাদিসে যে সাত জমিনের কথা বলা হয়েছে তাতে এই সাত স্তরকেই উদ্দেশ্য করা হয়েছে, যা আজ থেকে প্রায় ১৪৫০ বছর আগে রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলে গেছেন।