হাদিস শরীফ সংগ্রাহকদের জীবনী ও অবদান- ইমাম বুখারী

dreamstime_s_121666937

জন্ম ও শৈশব

ইমাম বুখারী ছিলেন একজন বিখ্যাত হাদিসবেত্তা। তার পুরো নাম হচ্ছে, মুহাম্মদ বিন ইসমাইল বিন ইবরাহীম বিন মুগীরাহ বিন বারদিযবাহ। তার জন্মঃ ১৯৪ হিঃ, এবং মৃত্যুঃ ২৫৬ হিঃ। তার রচিত বুখারী শরীফ হাদিস সংকলনের একটি সর্বোত্তম গ্রন্থ বলে বিবেচিত হয়। মুসলমানদের কাছে নবীজি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামেরজীবনাচরণ অর্থাৎ হাদিস সংকলনের যে কয়েকটি গ্রন্থ সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য তার ভেতরে বুখারী শরীফ অন্যতম। পশ্চিম উজবেকিস্তানের বোখারা প্রদেশের রাজধানী হচ্ছে বুখারা শহর। তিনি এই শহরে জন্মগ্রহণ করেন। বুখারায় তার জন্মস্থান বলে তাকে বুখারী বলা হয়।

ইমাম বুখারীর বাবার নাম হচ্ছে ইসমাইল ইবনে ইব্রাহিম। তার দাদার নাম হচ্ছে ইব্রাহিম। ইতিহাস পাঠ করে তার দাদার সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য পাওয়া না গেলেও তার বাবার সম্পর্কে কিছু তথ্য পাওয়া যায়। আর তা থেকে আমরা জানতে পারি যে তার বাবা ইসমাইল মুসলিম বিশ্বে একজন পরিচিতি ব্যক্তি ছিলেন তিনি নিজেও ছিলেন একজন হাদীসবিদ। তিনি ছিলেন অত্যন্ত জ্ঞানী শিক্ষিত এবং যোগ্যতা সম্পন্ন একজন মানুষ। ইমাম বুখারীর ছোটবেলায় তিনি তার বাবাকে হারান। তার শৈশব বয়সেই তার বাবা মারা যান। বাকি সময়টুকু তিনি তার মায়ের কাছে লালিত পালিত হয়। তার বাবা মারা যাওয়ার সময় প্রচুর ধন-সম্পদ রেখে যান। পৈতৃক সূত্রে ধনসম্পত্তি প্রাপ্তি ফলে ইমাম বুখারীকে কোন প্রকার অর্থনৈতিক সংকটের মোকাবেলা করতে হয়নি।

শিক্ষা ও মেধা

তার মা তার শিক্ষা-দীক্ষার সমস্ত ভার গ্রহণ করেন। আর ইমাম বুখারীর ছোটবেলা থেকেই শিক্ষা-দীক্ষার অর্থাৎ জ্ঞান চর্চার প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল। তিনি প্রথমে কোরআন পাঠ শুরু করেন। সৃষ্টিকর্তার রহমতে তার বয়স যখন মাত্র ৬ তখন তিনি কুরআন মুখস্ত করেন। তার বয়স যখন ১০ তখন থেকেই তিনি হাদিস মুখস্ত করতে শুরু করেন। মাত্র তার বয়স যখন ষোল, সেই বয়সেই তিনি আব্দুল্লাহ বিন মুবারক এবং ওয়াকীর পান্ডুলিপি সমূহ মুখস্ত করে ফেলেন। কারণ রব্বুল আলামিনের রহমতে তার ছিল প্রখর স্মরণশক্তি। ইমাম বুখারীর বয়স যখন ১৮ তখন তিনি হজ্ব পালনের উদ্দেশ্যে মক্কায় গমন করেন। মক্কায় যাবার পর তিনি হাদীস চর্চা শুরু করেন।

তিনি হাদীস চর্চাকে আরো সমৃদ্ধ করার জন্য এবং হাদিস সংগ্রহের জন্য অন্যান্য দেশে ভ্রমণ করা শুরু করেন এবং এক হাজারেরও অধিক সংখ্যক মুহাদ্দিসের নিকট থেকে হাদীস সংগ্রহ করেন। খোরাসানের বিভিন্ন অঞ্চলে তিনি ভ্রমণ করেছেন। এর বাইরে তিনি মক্কা-মদিনা ইরাক সিরিয়া মিশর সহ আরো অনেক শহর ভ্রমণ করেন। কঠোর পরিশ্রম এবং গভীর আগ্রহ নিয়ে তিনি রাত জেগে জেগে তার জ্ঞান চর্চা করতেন। আমরা আগেই জেনেছি যে মহান আল্লাহ তায়ালার রহমতে তার স্মৃতিশক্তি ছিল খুবই শক্তিশালী। কথিত আছে তিনি যে কোন বইয়ের যেকোনো লেখাতে একবার দৃষ্টি দিয়েই তা মুখস্ত করে ফেলতে পারতেন।

অবিস্মরণীয় অবদান

ইমাম বুখারী তার জীবনের যত কাজ করেছেন সেই কাজগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠতম কাজ হচ্ছে হাদিস গ্রন্থের রচনা। আমরা বুখারী শরীফ নামে যে গ্রন্থের সাথে পরিচিত তা ইমাম বুখারীর জীবনের শ্রেষ্ঠতম কাজ। তার শিক্ষক থেকে এই গ্রন্থ রচনার জন্য উৎসাহ পান। একদিন তাঁর শিক্ষক আশা প্রকাশ করেন যে এমন একটি গ্রন্থ পাওয়া যাবে বা থাকবে যাতে শুধুমাত্র সহি হাদিস সমূহ লিপিবদ্ধ থাকবে। ছাত্রদের মাঝখান থেকে তখন ইমাম বুখারী এই কাজ করার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং এই কাজে তিনি অগ্রসর হন। মাত্র ২৩ বছর বয়সে ২১৭ হিজরী সনে তিনি মক্কার হারাম শরীফে এই গ্রন্থ সংকলন এর জন্য কাজ শুরু করেন। হাদিস সংগ্রহের সময় তিনি সবসময় রোজা রাখতেন।

প্রতিটি হাদিস গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করার আগে তিনি গোসল করে পাক-পবিত্র হয়ে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করতেন এবং এরপর ধ্যান বা মুরাকাবার মাধ্যমে হাদিসের সত্যতা এবং বিশুদ্ধতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতেন। তার গ্রন্থে আমরা যত হাদিস পেয়ে থাকি বাস্তবে তিনি এর থেকেও আরো অনেক বেশি হাদিস সংগ্রহ করেছিলেন কিন্তু তিনি সকল হাদিস এই গ্রন্থ সংকলন করেন নি। হাদিস সংগ্রহের জন্য তিনি যে মানদণ্ড ব্যবহার করতেন সে মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হলেই সেই হাদীসগুলো তিনি লিপিবদ্ধ করতেন। তার প্রায় ছয় লক্ষ হাদিস মুখস্ত ছিল। ক্ষণজন্মা কালজয়ী এই হাদিস সংগ্রাহকের কারণে আজ আমরা সহি হাদিস থেকে জ্ঞানচর্চা করতে পারছি। রব্বুল আলামীন তাকে তার সকল সৎ কর্মের জন্য উত্তম পুরস্কার প্রদান করুক।