হাদিস শরীফ সংগ্রাহকদের জীবনী ও অবদান- ইমাম মুসলিম

dreamstime_s_117530280

জন্ম ও শৈশব

ইমাম মুসলিম বিশুদ্ধ হাদিস নিরূপণে এক নির্ভরতার নাম। বিশুদ্ধ হাদিস সংগ্রহ, গবেষণা, বিশুদ্ধতা ইতিহাসে যে কয়েকজন মহামানব অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন ইমাম মুসলিম। তার জন্ম তারিখ নিয়ে মতভেদ রয়েছে।বিভিন্ন জনের মতে ২০২/৮১৭ অথবা ২০৬/৮২১ অথবা ২০৪/৮১৯ সনে তার জন্ম হয়েছে বলে বিভিন্ন জন মত প্রকাশ করেছেন। তবে তার জন্ম খুরাসানের নিশাপুরে। এখানে তিনি ও তার পরিবার পারিবারিকভাবে আদি বাসস্থান হিসেবে ব্যবহার করছিলেন। ছোটবেলা থেকেই তার জ্ঞানচর্চার প্রতি আগ্রহ জন্মেছিল। তখন থেকেই তিনি হাদিস শিক্ষায় নিজেকে নিয়োজিত করেন।

ইমাম মুসলিমের বয়স যখন ১৪ তখন থেকেই তিনি হাদিস শিক্ষায় গভীর মনোনিবেশ করেন। তিনি তার জন্মস্থান নিশাপুরের বিভিন্ন বিখ্যাত মুহাদ্দিসের কাছ থেকে হাদীস সংগ্রহ করতে থাকেন।  শুধু নিশাপুর থেকে হাদীস সংগ্রহ করেই ক্ষান্ত হননি তিনি, বরং হাদিস সংগ্রহের জন্য তিনি ইলমে হাদীসের সব কেন্দ্রে অক্লান্তভাবে ছুটে বেড়িয়েছেন। আত্মস্থ করেছেন হাদিসের এক বিশাল ভান্ডার। এজন্য তিনি বেশ কয়েকবার বাগদাদে ভ্রমণ করেছিলেন।

ইমাম বুখারীর সাহচর্য

২৫৯ হিজরী সনে তিনি শেষবারের মতো বাগদাদ সফর করেন। ইমাম বুখারীকে তিনি তার ওস্তাদ হিসাবে গ্রহণ করেন।  হাদিস সম্পর্কিত ইমাম বুখারীর বিশাল জ্ঞান ভান্ডার তাকে আকৃষ্ট করে। তার এই বিশাল জ্ঞান ভান্ডার থেকে তিনি হাদিস বিষয়ক জ্ঞান লাভের জন্য যথেষ্ট মাত্রায় আগ্রহী ছিলন। ইমাম বুখারীর বিরুদ্ধে নেতিবাচক অপপ্রচার করা শুরু হয়। ইমাম মুসলিম তখন তার ওস্তাদ ইমাম বুখারীর পক্ষ অবলম্বন করেন। বলা হয়ে থাকে ইমাম মুসলিম ছিলেন ইলমে হাদীসের এক শক্তিশালী এবং গভীরতম উৎস। তাকে ইলমে হাদীসের এক বিশাল সাগর হিসেবেও অভিহিত করা হয়।

সারা পৃথিবীর হাদিস বিষয়ক বিশারদগণ তাকে একজন শ্রেষ্ঠ ইমাম বলে ঐক্যমত পোষণ করেছেন। তার সময়ে অনেক বড় বড় মুহাদ্দিসগণ তার নিকট হাদিস শিক্ষা করতেন। তার নিকট হতে শিক্ষা গ্রহণ করতেন এমন দের মধ্যে রয়েছেন, ইবরাহীম ইবনে আবী তালিব, ইবন খুযাইমা, সাররাজ, আবু আওয়ানা, আবু হামেদ ইবনে শারকী, আবু হামেদ আহমাদ ইবনে হামাদান, ইবরাহীম ইবনে মুহাম্মাদ, মাককী ইবনে আবাদান, আব্দুর রাহমান ইবনে আবি হাতেম, মুহাম্মাদ ইবনে মাখলাদ, ইমাম তিরমিযী, মুসা ইবনে হারুন, আহমেদ ইবনে সালমা, ইয়াহইয়া ইবনে সায়েদ সহ আরো অনেকে।

হাদিস সংকলন ও সাধনা

ইমাম মুসলিম মুসলিম শরীফ সংকলন করার জন্য তার জীবনের দীর্ঘ ১৫ বছর সাধনা করেছেন। এই ১৫ বছরে তিনি প্রায় তিন লাখ হাদিস সংগ্রহ করেন।  এর থেকে যাচাই-বাছাই করে তিনি ‘ সহিহ্ মুসলিম শরীফ’ সংকলন করেন। ইমাম মুসলিমের সারগেদ আহমদ ইবনে সালাম বলেন, ‘আমি মুসলিমের সঙ্গে তার আসসহিহ প্রণয়নকালে পনের বছর লেখালেখির কাজ করেছি (তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ)। ইমাম মুসলিম (রহ.) শুধু সহিহ হাদিসের সমন্বয়ে এ মহান গ্রন্থখানা রচনা করেছেন। তাই এর নামকরণ করেছেন ‘আস্ সহিহ। ’ বাস্তবে ইমাম মুসলিম ছিলেন একজন জ্ঞানী ও সত্যবাদী।

এমনকি তাঁর মৃত্যুর পর দীর্ঘ বারোশো বছরের বেশি সময় কেটে গেলেও মুসলিম শরীফ গ্রন্থর এর মানের সমকক্ষ দ্বিতীয় কোন গ্রন্থ রচনা করা কোন ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব হয়নি। রাব্বুল আলামিনের রহমতে তিনি তীক্ষ্ণ স্মৃতি শক্তির অধিকার হওয়ার পরেও মুসলিম শরীফ রচনায় তিনি শুধু নিজের স্মৃতিশক্তির উপরেই নির্ভর করেননি। তিনি তার সময়ের শ্রেষ্ঠ ভবনের সামনে তার রচনা পেশ করেছিলেন। তাদের সাথে পরামর্শ করে তাদের প্রদানকৃত পরামর্শ গ্রহণ করেই তিনি তার রচনাটির চূড়ান্ত কাজ সমাধান করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি এ গ্রন্থখানা আবু জুরআ আর-রাজির কাছে পেশ করেছি। তিনি যে যে হাদিসের সনদে দোষ আছে বলে ইঙ্গিত করেছেন, আমি তা পরিত্যাগ করেছি, আর যে যে হাদিস সম্পর্কে মত দিয়েছেন যে এগুলো সহিহ, আমি সেগুলো গ্রন্থে সন্নিবেশিত করেছি। ’

সহি হাদিস সংগ্রহ গবেষণা ও লিপিবদ্ধ করার এই ক্ষণজন্মা মহান সাধক ২৬১ হিজরীর ২৫ রজব রবিবার মোতাবেক ২৮০ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন। মারা যাওয়ার সময় তার বয়স হয়েছিল মাত্র ৫৭ বছর। মহান রাব্বুল আলামিন তার সকল কাজগুলোকে সৎকর্ম হিসেবে কবুল করুক।