হাদিস শরীফ সংগ্রাহকদের জীবনী ও অবদান- ইমাম আবু ইউসুফ

dreamstime_s_175848431

জন্ম ও শৈশব

ইমাম আবু ইউসুফ ইরাকের কুফায় ১১৩ হিজরী আনুযায়ি ৭২৯ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহন করেন। তিনি ইমাম আবু হানিফার একজন শিষ্য ছিলেন। আবার হানাফি মাযহাবের একজন ইমাম ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তার নাম হচ্ছে ইয়াকুব। তার উপর নাম হচ্ছে আবু ইউসুফ। আর তার উপাধি হচ্ছে কাযিউল কুযাত। তিনি তার জীবনে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করার পর তিনি ফিক্বাহকে পছন্দ করেছেন। শিক্ষক হিসেবে প্রথমে তিনি আব্দুর রহমান ইবনে আবূ ই’লার কাছে ছাত্রত্ব গ্রহণ করেন। এর পর বেশ কিছু সময় ধরে তিনি ইমাম আবু হানিফার মজলিসে অংশগ্রহণ করে।

তার পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা ভাল ছিল না। পারিবারিকভাবে আর্থিক দারিদ্রতার কারণে তার পরিবার চাইত না যে তিনি শিক্ষা গ্রহণ করুক। তার পরিবার তার শিক্ষার ব্যাপারে আগ্রহী না হওয়ার কারণ ইমাম আবু হানীফা জানার পর তার শিক্ষার সকল ব্যবহার তিনি নিজে গ্রহণ করেন। শুধু তার শিক্ষার ব্যয় ভার নয় তার পরিবারের সকল ব্যবহার তিনি গ্রহণ করেন। ইমাম আবু ইউসুফ বলতেন-“আমাকে প্রয়োজনের কথা কখনো বলতে হতো না, সময়মতো উনি নিজেই টাকা পাঠিয়ে দিতেন, তাই আমাকে উপার্জন নিয়ে চিন্আর করতে হতো না।”।

মেধার পরিচয়

ইমাম আবু ইউসুফ ছিলেন অত্যন্ত মেধার অধিকারী। তিনি এতটাই মেধার অধিকারী ছিলেন যে তার ব্যাপারে অন্যান্য মনীষীদের উক্তি খুঁজে পাওয়া যায়। তার ব্যাপারে নূরুল আনওয়ারের লেখক মুল্লা জিউন বলেন- “তার বিশ হাজার মাওযু হাদীস মুখস্থ ছিল, তাহলে সহীহ হাদীস তা অনুমেয়” ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে মুঈন, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল এবং শায়েখ আলী ইবনে মুদিনী বলেন: “ইমাম আবু হানীফার ছাত্রদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে যোগ্য ছাত্র ছিলেন।” তুলাইহা ইবনে মুহাম্মদ বলেন: “তিনি তার যমানার সবচেয়ে বড় ফক্বীহ ছিলেন।” দাউদ ইবনে রুশদ বলেন: “ইমাম আবু হানীফার যদি একটি ছাত্রই তৈরী করতেন তাহলেও তার গর্ব করার জন্য যথেষ্ট ছিল।

ইমাম আবু ইউসুফ আরব্য ইতিহাস, এর সাহিত্য, তাফসীর সহ অন্যান্য বিষয়েও অত্যন্ত জ্ঞানী ছিলেন। তার জ্ঞান শুধুমাত্র হাদীসের জ্ঞান এর উপরেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এমনকি তার জ্ঞানের কারণে তাঁর সমসাময়িক অন্যদের থেকে তিনি আলাদা বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন। তার জ্ঞানের কারণে অন্যদের কাছ থেকে তিনি সমীহ সম্মান পেতেন। এমনকি ইমাম আবু হানিফা স্বয়ং নিজে বলতেন যে, “আমার ছাত্রদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জ্ঞান অর্জন করেছে আবু ইউসুফ”।

বাগদাদের বিচারক

ইমাম আবু ইউসুফ তার জীবনে বিচারক হিসেবে নিযুক্ত হন। ৭৮৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি বাগদাদে আসেন। ওই সময়ের খলিফা মুহাম্মদ আল-মাহদী ইবনে মানসুর তাকে বসরা বিচারক হিসেবে নির্বাচিত করেন। তিনি নিযুক্ত হল বসরার বিচারক হিসেবে। এরপর হাদী ইবনে মাহদী ইবনে মানসুরের সময়ও তিনি বিচারক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। ১৯৩ হিজরীতে/৮০৮ খ্রিস্টাব্দে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন খলিফা হারুনুর রশীদ।  ওই সময় তিনি তখন পুরো সাম্রাজ্যের প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। তিনি বিচারকার্য সততা এবং দক্ষতার সাথে পরিচালনার পাশাপাশি আল্লাহর ইবাদত বন্দেগিতে মশগুল ছিলেন।

তিনি নিজে বলেছেন, “ইমাম আবু হানীফার দরবারে আমি উনত্রিশ বছর ছিলাম এবং কখনো ফজরের জামাআত মিস হয়নি।” বশির ইবনে ওলীদ বর্ণনা করেন-“ তার ইবাদত বন্দেগী, প্রার্থনা , তাক্বওয়া এতোটাই বেশি ছিল যে, কাযী ও মন্ত্রিত্ব থাকাকালীন সময়েও দুইশ রাকাআত নফল নামাজ পড়তেন”। বিচারকার্যের পাশাপাশি তিনি শিক্ষক হিসেবেও কাজ করেছেন।  বহু ছাত্রের ভেতরে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হচ্ছে, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল, মুআল্লা ইবনে মানসুর, বাশার ইবনে ওলীদ, শফিক ইবনে ইবরাহীম বলখী, ইয়াহইয়া ইবনে মুনী’ ও অন্যান্য। ৫ রবিউল আওয়াল ১৮২ হিজরী / ২৬ এপ্রিল ৭৯৮ খ্রি. ইরাকের বাগদাদে বৃহস্পতিবার জোহরের সময় তিনি ইন্তেকাল করেন।