হাফসা বিনতে সীরিন (রহঃ)-নারী তাবেয়ী ও জগৎবিখ্যাত আলেমা (২য় পর্ব)

dreamstime_s_116699798

দ্বিতীয় পর্ব 

কেন তিনি ছিলেন মহীয়সী এক নারী ?

হাফসা বিনতে সীরিন(রহঃ) এর নিকট শরীয়তের এমন অগাধ জ্ঞান ছিল যে একজন বলেন, আমরা একবার তার নিকট যাই। এতে তিনি বড় ওড়না দিয়ে মুখমন্ডলসহ নিজেকে ঢেকে নেন। তখন তিনি ছিলেন বয়োবৃদ্ধা। আমরা তাকে বললাম কুরআনে তো আছে- “যেসব বয়োবৃদ্ধা নারী, যাদের বিবাহের বয়স শেষ, তারা যদি সৌন্দর্য প্রকাশ না করে তাদের অতিরিক্ত বস্ত্র খুলে রাখে তাতে কোনো দোষ নেই।” (আল কুরআন-২৪:৬০)

তিনি জবাবে বললেন, আয়াতের পরের অংশে কী আছে? আমরা বললাম, “তবে এ থেকে বিরত থাকাই তাদের জন্য উত্তম।” তিনি তখন বলে উঠলেন, “এজন্যই এ বড় ওড়না।”

তিনি তাঁর যুবক ছাত্রদেরকে উদ্দেশ্য করে বলতেন, “হে যুবকরা! আমল যা করার যৌবনেই করে নাও। কেননা আমার নিকট যৌবনের আমলই আমল এবং যৌবনে যত করা যায় পরে ততটুকু করা সম্ভবপর হয় না।”

মোটকথা, ইলম, ইবাদত, আখলাকসহ তিনি সকল ভাল গুণে গুণান্বিত ছিলেন। এসব গুণাবলীতে তিনি অনেক পুরুষকেও ছাড়িয়ে গেছেন।

গত পর্বে ইবনে সীরিন ও হাসান বসরীর মত তাবেয়ীর সাথে তাঁর তুলনার করা হয়েছে। ইসলামী ইতিহাসে বিচারক ইয়াজ ইবনে মুয়াবিয়া ছিলেন আরেক বিরাট ব্যক্তিত্ব। বিচারকার্যে তার দক্ষতা ও তার বুদ্ধির প্রখরতা প্রবাদতুল্য। বলা হয়ে থাকে, পূর্ণ বুদ্ধিমান ব্যক্তি প্রতি শতাব্দীতে একজন করে জন্ম নেয়। ইয়াজ তাদেরই একজন। এ ইয়াজ যখন বসরার বিচারক তখন তিনি বলেন, “আমি আমার জীবদ্দশায় যাদেরকে দেখেছি তাদের সবার মধ্য থেকে হাফসাকে শ্রেষ্ঠ দেখেছি।” তখন তাকে প্রশ্ন করা হল, ইবনে সীরীন, হাসান বসরীর থেকেও? তিনি বললেন, “হাঁ, তাদের থেকেও।” তিনি ছিলেন তার সময়কার উপমাহীন, দ্বীনী ইলমে অনন্য প্রাজ্ঞ, অনেক বড় মর্যাদার অধিকারীণী মহীয়সী এক নারী।

তাঁর পারিবারিক ইতিহাস

হযরত হাফসার পিতা হলেন সীরীন(রহঃ)। কূফাতে তাদের বাড়ী ছিল। তিনি অমুসলিম ছিলেন। হযরত আবু বকর(রাযিঃ) এর খেলাফতকালে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ(রাযিঃ) কূফা জয় করেন। তখন সীরীন যুদ্ধবন্দী হন। বন্দীদের মদীনায় নিয়ে আসা হয়। বণ্টনের সময় তিনি নবীজীর খাদেম হযরত আনাস(রাযিঃ) এর ভাগে পড়েন। হযরত আনাস(রাযিঃ) তাকে কিছু মুক্তিপণের বিনিময়ে মুক্ত করে দেন। এরপর তিনি মুসলমান হন। আল্লাহর মহিমা, এ গোলাম সীরীনের পরবর্তী যে কয়জন সন্তানই হয় সবাই ইলম, আমল, প্রজ্ঞা ও দুনিয়াবিমুখতা তৎকালীন যামানায় শীর্ষে পৌঁছে যান।

হাফসা বিনতে সীরীনের আলোচনা তো হল। মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন(রহঃ)-এর প্রসিদ্ধি তো জগৎজোড়া। কুরআন-হাদীসের ইলম, ইবাদত ও পরহেযগারী তো আছেই, স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রদানের ক্ষেত্রে তার পরে তার মত ২য় কোনো ব্যক্তি জন্ম নেয়নি। তাদের আরেক ভাই হলেন ইয়াহইয়া ইবনে সীরীন। তিনি মহামারীতে ভাই-বোনদের মধ্যে সর্বপ্রথম মারা যান। তিনি এত বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন যে, কারো কারো মতে, তিনি হাফসা ও ইবনে সীরীন থেকেও শ্রেষ্ঠ ছিলেন। তাদের আরেক ভাই হলেন আনাস ইবনে সীরীন। তিনিও অনেক বড় মুহাদ্দিস।

হাদীসের কিতাবে তার বর্ণনা পর্যাপ্ত। তাদের এক বোনের নাম কারীমা। তিনি বোন হাফসার মত এত ইবাদত করতেন যে, বোনের মত পনের বছর তিনিও তার নামাযের ঘর থেকে বিনা প্রয়োজনে বের হননি।

ইসলাম ও অন্য ধর্মের মাঝে পার্থক্য এখানেই। যে যুদ্ধবন্দি হত্যার উপযুক্ত, তাকে হত্যা না করে মুসলমানদের ঘরে আপন হয়ে থাকার সুযোগ, অতঃপর মুক্তি, এরপর ইসলামের মর্যাদার ক্ষেত্রে অপরাপর মুসলিমদের সমমান হতে হতে ইলম ও সম্মানের শীর্ষ চূড়ায়! সুবহানাল্লাহ! আজ যে ছিল লাঞ্ছিত, বন্দি। কিছুদিন পর সেই হয়ত মুসলামানদের ইমাম-রাহবার।

যথার্থ শিক্ষা

ইসলামের ছোঁয়ায় গোলামের ছেলে গোলাম না হয়ে সীরিনের সকল ছেলে-মেয়ে হয়ে যায় সে যুগের ও পরবর্তী যুগের অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব।

আমাদের জন্য রয়েছে এই মহীয়সীদের জীবননী থেকে এক বিশেষ বার্তা, যা কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

আর এ শুধু দু’একটি ঘটনা নয়; বরং ইসলামের ইতিহাসে এরকম বহু গোলাম মুসলিম সমাজে সম্মানের শীর্ষ চূড়ায় আরোহণ করেছেন। আজ আমরা তাদেরকে সর্বোচ্চ সম্মানের সাথে স্মরণ করি ও মেনে চলি। অন্য কোনো ধর্ম, অন্য কোনো জাতি তাদের ইতিহাস থেকে এমন নযীর পেশ করবে এটা খুবই দুরূহ ব্যাপার।

সুতরাং যুদ্ধবন্দি ও গোলাম-বাদীর বিষয়ে যারা ইসলাম ও মুসলিমকে বিভিন্ন মিথ্যা অপবাদ দেয়ার অপচেষ্টা চালায় তারা মুলত জ্ঞানপাপী ও মানবতার দুশমন। আল্লাহ আমাদেরকে এই মহান মনীষীদের জীবনী থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের দ্বীনের মূল্য বোঝার তাওফীক দান করুন। আমীন।

 

 (সমাপ্ত)