হাফসা বিনতে সীরিন (রহঃ)-নারী তাবেয়ী ও জগৎবিখ্যাত আলেমা (১ম পর্ব)

dreamstime_s_91775973

খোলাফায়ে রাশেদীনের জামানায় ইসলামের ব্যপক প্রচার প্রসারের পর মক্কা, মদীনা, কুফার পাশাপাশি বসরা নগরীও ছিল দ্বীনের দূর্গ। এ উর্বর ভূমিতে জন্ম নিয়েছেন ইসলামী ইতিহাসের হাজারো আলেম, মুহাদ্দিস, ফকীহ, ক্বারী, আরবী ব্যাকরণবিদ সহ অসংখ্য আবেদ ও যাহেদ। পুরুষদের পাশাপাশি মহিলারাও এসব দিক থেকে পিছিয়ে ছিলেন না। হাসান বসরী(রহঃ), মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন(রহঃ), রাবেয়া বসরী(রহঃ), মু’আয আল-আদাবিয়া(রহঃ), ইয়াস ইবনে মুয়াবিয়া(রহঃ) এর ন্যায় মহান মনীষীগণ ছিলেন এ বসরা নগরীর-ই সন্তান। হাফসা বিনতে সীরীনও ছিলেন তাদের মধ্যকার একজন। নারী তাবেয়ীদের মধ্যে তিনি ছিলেন একেবারে প্রথম সারির।

কে ছিলেন হাফসা বিনতে সীরীন?

তিনি ইলম, ইবাদাত-বন্দেগী, পরহেযগারী ইত্যাদিতে হাসান বসরী(রহঃ) ও আপন ভাই মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন(রহঃ) এর সমকক্ষ ছিলেন। নবীজীর একান্ত খাদেম হযরত আনাস(রাযিঃ) এর সাথে ছিল তার পারিবারিক সম্পর্ক। তাঁর কাছ থেকে হাফসা বিনতে সিরীন সহ তাঁর সকল ভাই-বোন ইলম, আমল, আখলাক শেখেন।

নুসাইবা বিনতে কাব(রাযিঃ) নাম্নী একজন নারী সাহাবী ছিলেন। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে অনেক জিহাদের ময়দানে তিনি শরীক ছিলেন। সেখানে তিনি অসুস্থদের সেবা করতেন, আহতদের চিকিৎসা করতেন। নবীজীর কন্যা ইন্তেকাল করলে তিনিই তাঁকে গোসল করান। তিনি নারী সাহাবীদের মধ্যে উপরের তবকার সাহাবিয়া ছিলেন।

হাফসা বিনতে সীরীন(রহঃ) এ মহান সাহাবিয়া থেকেও ইলম(জ্ঞান) অর্জঞ্জ করেন এবং তাঁর আমল ও আখলাক দ্বারা আলোকিত হন।

তাঁর শিক্ষা অর্জন

বসরাতে বসবাস করতেন আরেক মহান তাবেয়ী আবুল আলিয়া ইবনে মেহরান(রহঃ)। তাবেয়ীদের মধ্যে তিনি ইলম, আমল ও প্রজ্ঞায় অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ছিলেন। আবু বকর ইবনে আবু দাউদ(রহঃ) তাঁর সম্পর্কে বলেন, “সাহাবীদের পর কুরআন সম্পর্কে আবুল আলিয়া থেকে বেশি জ্ঞানী কেউ নেই।” হাফসা বিনতে সীরীন(রহঃ) এ মহান তাবেয়ী থেকেও ইলম অর্জন করেন।

এছাড়াও বসরার অন্যান্য আলেম থেকেও তিনি ইলম অর্জন করেন। পরবর্তীতে অসংখ্য ছাত্র তার থেকে ইলম আহরণ করে। ঐ যুগের অনেক বড় বড় আলেম তার থেকে ইলম অর্জন করতে আসেন। আইয়ূব আস-সাখতিয়ানী, খালিদ আল-হাযযা, আছিম আল-আহওয়াল, আবদুল্লাহ ইবনে আওন, কাতাদা, মুহাম্মদ ইবনে সীরীন, হিশাম ইবনে হাসসান, কাযী ইয়াজ ইবনে মুয়াবিয়া সহ ঐ যুগের বিদগ্ধ আরও অসংখ্য আলেম, মুহাদ্দিস সকলেই হাফসা বিনতে সীরীন (রহঃ) এর ছাত্র। তাঁর কাছ থেকে তাঁরা হাদীসের ইলম অর্জন করেন।

সম্ভবত হাদীসের এমন কোনো কিতাব পাওয়া যাবে না, যেখানে হাফসা বিনতে সীরীন (রহঃ) এর থেকে বর্ণিত হাদীস নেই। হাদীসশাস্ত্রে যেসব ব্যক্তি শীর্ষে উন্নীত, যাদের হাদীস গর্ব সহকারে সকল হাদীস বিশারদগণ বর্ণনা করেছেন, হযরত হাফসা বিনতে সীরিন (রহঃ) ছিলেন তাদেরই অন্যতম।

কুরআন অনুরাগী

হাদীসের ক্ষেত্রে তিনি যেমন বিদগ্ধ পন্ডিত ছিলেন তেমনিভাবে তাঁর অগাধ জ্ঞান ছিল কুরআনের বিষয়েও। কুরআন পাঠের অনেক নিয়মনীতি আছে। আছে অনেক কায়দা-কানুন। আবার কুরআনের অসংখ্য শব্দ এমনও রয়েছে, যা বিভিন্নভাবে পড়া যায়, যাকে ইলমি পরিভাষায় কেরাত বলা হয়। এটা স্বতন্ত্র এক বিরাট ও জটিল শাস্ত্র। হযরত হাফসা(রহঃ) এ শাস্ত্রেও পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। মাত্র বার বছর বয়সেই তিনি কেরাত শাস্ত্র আয়ত্ব করেন।

হাফসা বিনতে সীরিন(রহঃ) হলেন বিখ্যাত তাবেয়ী মুহাম্মাদ ইবনে সীরীন(রহঃ) এর আপন বোন। ইবনে সীরীন (রহঃ) ইবাদাত-বন্দেগীসহ যাবতীয় বৈশিষ্ট্যে সর্বশ্রেষ্ঠ তাবেয়ী হাসান বসরী(রহঃ) এর সমকক্ষ। দু’জন একই সময়ের এবং একে অপরের বন্ধু ছিলেন। এই ইবনে সীরীনের মত মহান আলেমও কুরআনের কোনো কোনো বিষয়ে তাঁর বোন হাফসার নিকট শরণাপন্ন হতেন। কুরআনের পাঠরীতির কোনো বিষয়ে ইবনে সীরীনের কাছে খটকা লাগলে তিনি বলতেন, “যাও তোমরা হাফসাকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করো। আর সে কীভাবে পাঠ করে তা মনোযোগ দিয়ে শোন।”

অসামান্য নিবেদিত প্রাণ

আর ইবাদত-বন্দেগীতে তিনি এমন ছিলেন, যা আমাদের কাছে শুনতেও অবিশ্বাস্য মনে হবে। তিনি নামাযের জন্য যোহরের সময় প্রবেশ করতেন; আর সেখানে আসর, মাগরিব, এ’শা ও ফজর পড়ে যখন ভালোভাবে সূর্য উদিত হত তখন নামায পড়ে বের হতেন! এসময় অযু, গোসল ও ঘুম সেরে নিতেন। এরপর যখন যোহরের সময় হত তখন পুনরায় নামাযঘরে চলে যেতেন। তিনি তার নামাযের ঘরে ত্রিশ বছর ছিলেন; কোনো প্রয়োজন ছাড়া সেখান থেকে বের হত না।

তার বাদীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তুমি তোমার মুনীবকে কেমন পেয়েছ? বাদী ছিল সহজ-সরল তাই উত্তর দিয়েছিল, “তিনি তো অনেক নেককার। তবে মনে হয় তিনি বড় কোনো গুনাহ করেছেন। তাই সারা রাত শুধু কাঁদেন আর নামায পড়েন।”

তিনি খুব বেশি রোযা রাখতেন আর প্রতি রাতে পনের পারা কুরআন তিলাওয়াত করতেন।

 

(চলবে)