হারিশা থেকেই কি উৎপত্তি হালিমের?

halim

 

হালিমের ইতিহাস

যে কোনও দেশেরই খাদ্যসংস্কৃতি গড়ে ওঠার পিছনে তার একটা ঐতিহাসিক সংযোগসূত্র থাকে। ভারতবর্ষে একটা দীর্ঘ সময় ব্যাপী ইসলামী শাসনের প্রভাবে এই দেশের খাদ্যসংস্কৃতিতেও একধরনের প্রভাব লক্ষ করা গিয়েছে। বলা যায়, এই প্রভাবের সূত্রেই ভারতের ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির সঙ্গে রক্ষা পেয়েছে তার সমন্বয়ী রেখাটি। রমজান মাস জুড়ে কিংবা ইফতার পার্টিতে পরিবেশিত একটি জনপ্রিয় পদ হল ‘হালিম’। আমরা কম-বেশি প্রত্যেকেই হালিম খেয়েছি, কখনও কখনও নিজেদের পছন্দের খাবারের তালিকাতেও রেখেছি এটিকে।

হালিম কী? এই প্রশ্নের খুব সহজ একটা উত্তর হতে পারে… হালিম একটি খাবার, যা বিভিন্ন রকমের ডাল, গম, মাংস, এবং গরম মশলা একসঙ্গে ভাল করে মিশিয়ে অনেক জল দিয়ে, একইসঙ্গে ভাল করে সেদ্ধ করে প্রস্তুত করা হয়। জল কমে এলে ঘন থকথকে যে মিশ্রণ পাওয়া যায়। তাকেই বলে হালিম। বিভিন্ন মসলা এবং ডাল এর অনুপাত এর জন্য স্বাদ বিভিন্ন হয়। রমজানের সময়েই যে হালিম খেতে হবে, এমন কোনও বাধ্যবাধকতা অবশ্য নেই, যেমন-রয়েছে নিহারীর ক্ষেত্রে। গরমকালে নিহারী হজম করতে পারেন না অনেকেই, তাই অনেকেই নিহারী গরমকালে খাওয়া পছন্দ করেন না।

ফিরে আসা যাক হালিমের প্রসঙ্গে। একথা কথা আমরা প্রত্যেকেই জানি যে নবাবি আমলের বেশিরভাগ খাবারই এসেছে মোঘল সাম্রাজ্যের হাত ধরে। মূলত পারস্য থেকে। হালিম এসেছে ভারতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। মধ্যপ্রাচ্যে যা ‘হারিস’ নামেই বিশেষ পরিচিত। রন্ধন ইতিহাসবিদ ক্লডিয়া রডেনের মতে উপমহাদেশের হালিম মধ্যপ্রাচ্যের হারিশা নামক এক ধরনের ডাল ও মাংসের মিশ্রণ জাতীয় খাবার থেকে উৎপত্তি হয়েছে। হারিশা ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, ইয়ামেন ও আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সকলের কাছে উপাদেয় একটি পদ। একটা ধারণা প্রচলিত রয়েছে যে হালিম ভারতে বিশেষ করে হায়দরাবাদে বিশেষভাবে প্রচলিত হয়েছিল নিজামদের হাতে… হারিস বদলে নাম হয় তখন হালিম।

এবার একটু ফিরে যাওয়া যাক ইতিহাসের কাছে, Margaret  Skahida-এর মতে ষষ্ঠ শতকে পারস্যের রাজা খুশরোর সময় থেকে হালিম চলে আসছে। সপ্তম শতকে মুসলমানরা যখন পারস্য আক্রমণ করে তখন তারা এই জনপ্রিয় পদটি সম্পর্কে জানতে পারে। আবার দশম শতকের একেবারে দোড়গোড়াতে Saif-al-Dawlah Al-Hamdani-এর লেখা ‘Kitab-al-Tabikh’-তে  হালিমের রন্ধনপ্রণালী সম্পর্কে জানতে পারা যায়। সে যাই হোক ভারতে হালিমের আবির্ভাব কিন্তু মোঘল শাসকদের হাত ধরেই। বিশেষ করে মোঘল সম্রাট আকবরের প্রচেষ্টাতে হালিমের জনপ্রিয়তা উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে। আইন-ই-আকবরী-তে এর উল্লেখ রয়েছে সে কথা বলাই বাহুল্য।

ঐতিহাসিক বৈচিত্রতার পাশাপাশিই হালিমের উপকরণের মধ্যেও একধরনের বৈচিত্রতা লক্ষ করা যায়… মাংস হিসেবে হালিমে গরু, মোরগ এবং খাসির মাংস ব্যবহার করা হয়ে থাকে। উপকরণের ভিত্তিতে এর নামকরণেও দেখা যায় বিভিন্ন বৈচিত্র যেমন- গোস্ত হালিম, মোরগ হালিম এবং মটন হালিম। উপকরণকত বৈচিত্রের সূত্র ধরেই আমরা দেখতে পারি এর সাংস্কৃতিক পরিবেশটি। রমজান মাস এবং মুহরাম মাস জুড়েই হালিম রান্নার ব্যাপক চল আমরা দেখতে পাই। এই সময়ে ভারতবর্ষের হায়দরাবাদে কড়াইতে কাঠের আগুনে এই হালিম তৈরি করার চল বেশ প্রাচীন আমরা বলতে পারি। একইসঙ্গে এই হালিম পাঠানো হয় দেশের বাইরেও অন্যান্য নানা স্থানে। এইভাবেই এক দেশের মানুষের সঙ্গে অন্য আরেক দেশের মানুষের একপ্রকারের সাংস্কৃতিক যোগাযোগের সূত্র তৈরি হয়ে যায়।

এই প্রসঙ্গে আমরা বলতে পারি কেবলমাত্র বৈদেশিক আক্রমণ কিংবা পর্যটকের হাত ধরেই সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল তৈরি হয় এমনটা কিন্তু নয়। বহু ক্ষেত্রেই খাদ্যসংস্কৃতির মাধ্যমেও একটা জাতির প্রসার ঘটে থাকে… ইতিহাসবিদগণে মতে হায়দ্রাবাদের নিজামদের আরব সৈন্যরা হারিশা এনেছিল হায়দ্রাবাদে। আর বিংশ শতকে হালিম জনপ্রিয়করণে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছিলেন সুলতান সাইফ নাওয়াজ জং বাহাদুর। সে যাই হোক বিংশ শতক পেরিয়ে এই একবিংশ শতকেও যে এই খাবারের পদটির ঐতিহ্য একেবারেই ম্লান হয়নি এমনটা বলাটাও ভুল হবে না।