হাস্যরসিকতা সম্পর্কে ইসলামের মধ্যমপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি

সমাজ Contributor
মতামত
হাস্যরসিকতা

মনকে প্রশান্ত ও কাজের উপযোগী হিসেবে গড়ে তুলতে মানুষের বিনোদনের প্রয়োজন পড়ে। এই বিনোদন হতে পারে কারো সঙ্গে গল্প করে, কৌতুক কিংবা রসিকতা করার মাধ্যমে।

তবে এসব রসিকতার মাঝেও থাকতে হবে শরীয়ত নির্দেশিত শালীনতা ও সীমাবদ্ধতা। এমন কোনোভাবে রসিকতা করা যাবে না যাতে গোনাহ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে বা অন্যের অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ করা হয়।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও প্রয়োজনবশত সাহাবায়ে কেরামের সাথে রসিকতা ও সুন্দর সুন্দর ঘটনার বর্ণনায় মেতে উঠতেন।

একদা এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে চলাচলের জন্য বাহন উট চেয়ে বসে। নবীজী তাকে বললেন, “হ্যাঁ, তোমাকে একটা উটনির বাচ্চা দেব।” লোকটি বলল, “হে আল্লাহর রাসুল! আমি বাচ্চা উট দিয়ে কী করব?” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “আরে সব উটই কি উটনীর বাচ্চা নয়?” (আবু দাউদ, তিরমিযী)

হাদিসে এ রকম অনেক ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।

রসিকতা কিংবা কৌতুক মানুষকে প্রশান্তি দেয়। রাগ দমন করে। মানসিক প্রশান্তির অন্যতম চিকিৎসা গল্প ও রসিকতা।

রসিকতার অভিজ্ঞতা কমবেশি সবারই আছে। তবে শান্তি ও সমাধান খুঁজতে গিয়ে এমন কোনো রসিকতা করা যাবে না যা মানুষকে গোনাহের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। কেননা ব্যবহারের অসাবধানতায় মানুষের অনেক প্রিয় জিনিসও অপ্রীতিকর ও মন্দে পরিণত হয়।

রসিকতার কতিপয় নীতিমালা ও আদব

প্রথমত: রসিকতা করার ক্ষেত্রে কিছু বিষয়ের প্রতি গুরত্ব দিতে হবে

১। ভাল নিয়তে রসিকতা করা। অর্থাৎ, রসিকতা করার সময় মনে এমন নিয়ত পোষন করা যে, আল্লাহ তাআলা পছন্দ করেন এমন একটি ভাল কাজ করা হচ্ছে। যেমনঃ রসিকতার মাধ্যমে নিজ স্ত্রী বা কারো অন্তর খুশি করে তাদের কর্ম চঞ্চল করে তোলা। অথবা রসিকতা করার মাধ্যমে কাউকে কোনো ভাল কাজের নিকটবর্তী করা। অথবা স্বীয় নফসকে নেককাজের জন্য শক্তি সঞ্চয়ের লক্ষ্যে প্রফুল্ল করা।

২। রসিকতা করার ক্ষেত্রে অবশ্যই সত্য কথা বলা অর্থাৎ শুধুমাত্র সত্য ও বাস্তবধর্মী রসিকতা করা। মিথ্যাকে পরিহার করা। আবু হুরাইরা রাযিঃ বলেন, লোকেরা বলল, “হে আল্লাহর রাসূল আপনি কি আমাদের সাথে রসিকতা করছেন? নবীজী তখন বললেন, আমি সত্য ছাড়া কথা বলি না।”

৩। রসিকতা করার ক্ষেত্রে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সম্মানবোধ থাকতে হবে। মানুষকে তার যোগ্য মর্যাদার স্থানে রেখে তাঁর সাথে রসিকতা করতে হবে। কারণ, অনেক মানুষই ঠাট্টা-রসিকতা পছন্দ করেন না।

দ্বিতীয়ত: রসিকতার সময় কিছু বিষয় থেকে বেঁচে থাকতে হবে

১। ঠাট্টার ছলে হোক আর উদ্দেশ্যমূলক ভাবেই হোক মিথ্যা সকল অবস্থাতেই হারাম এবং শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে খুবই নিকৃষ্ট একটি কাজ। মানুষকে হাসানোর জন্য যে ব্যক্তি মিথ্যা বলে হাদিসে তার বিশেষ শাস্তির কথা উল্লেখিত হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “ধ্বংস হোক ঐ ব্যক্তি, যে মানুষকে হাসানোর জন্য মিথ্যা বলে। তার ধ্বংস অনিবার্য, তার ধ্বংস অনিবার্য।”

এছাড়াও তিনি বলেছেন, “আমি ঐ ব্যক্তির জন্য জান্নাতের মধ্যবর্তী স্থানে একটি বিশেষ ঘরের জিম্মাদারী গ্রহণ করছি, যে রসিকতার মাঝেও মিথ্যাকে পরিহার করে।”

২। হাসি-রসিকতার ক্ষেত্রে এতটা বাড়া-বাড়ি কাম্য নয় যাতে মজলিসটিই হাসি-তামাশার মজলিসে রূপান্তরিত হয়ে যায় এবং মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য চাপা পড়ে যায়। অতিরিক্ত রসিকতার ফলে অন্তর মরে যায় এবং একজন মুসলিম যে বাস্তব ও উপকারী গুনাগুন দ্বারা পূর্ণ থাকে সে তা থেকে দূরে সরে যায়।

৩। অন্যকে কষ্ট দেওয়া, ক্ষতি করা, অধিকার হরণ করা কিংবা এমন জিনিস দ্বারা ঠাট্টা করা নিষেধ যার দ্বারা ক্ষতি হতে পারে। আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে তার মুমিন বান্দাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন পরস্পরে কথা বলার সময় নরমস্বরে ভাল কথা বলবে। তারা যদি এমন না করে তাহলে শয়তান তাদের মাঝে ঝগড়া বাঁধিয়ে দেবে।

৪। বেগানা বা পর-নারীর সাথে ঠাট্টা-রসিকতায় মেতে ওঠা। কেননা এটি ফিতনা ও অশ্লীলতায় পড়ার কারণ এবং এর ফলে অন্তর হারামের দিকে ধাবিত হয়।

৫। শরীয়তের কোনো বিষয় নিয়ে ঠাট্টা-রসিকতা করা। এসব বিষয়ে রসিকতা করা কুফরী এবং এগুলো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়।

অনুরূপভাবে দ্বীনের ধারক বাহক তথা সাহাবা, উলামা, সালেহীন প্রমুখদের ক্ষেত্রে একই হুকুম। অর্থাৎ, তাদের চালচলন, কথাবার্তা, আচার-আচরণ, ফতোয়া ইত্যাদি নিয়ে কেউ ঠাট্টা বিদ্রুপ করলে তারও ঈমান চলে যেতে পারে।

আল্লাহ তা’আলা মুসলিম উম্মাহকে রসিকতার নামে সব ধরনের মিথ্যা, কষ্টদায়ক ও গোনাহের দ্বার উন্মুক্তকারী বিষয়াদি থেকে হেফাজত করুন। আমিন।