হাস্যরসের জন্য জনপ্রিয় হলেও রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন বীরবল

mughal painting

তার্কিক, বুদ্ধিদীপ্ত, জ্ঞানী, বিচক্ষণ ও হাস্যরসিক… এমনই ছিল তাঁর ব্যক্তিচরিত্র। বুদ্ধিদীপ্ত মানসিকতায় তিনি সম্রাট আকবরের মন জয়ে সমর্থ হয়েছিলেন প্রথম সাক্ষাতেই। তিনি বীরবল। আমরা জানি আকবরের দরবারে বহু বিশিষ্ট মানুষদের মধ্যে ন-জনকে একত্রে বলা হত নবরত্ন। এই নয়জনেরই মধ্যে অন্যতম প্রধান সভাসদ ছিলেন বীরবল। বীরবলের বুদ্ধির কথা আমরা বিভিন্ন গল্পতে পড়েছি নানা সময়ে। গল্পকথার মতো শোনালেও বীরবল কিন্তু সত্যিই বুদ্ধিমান ছিলেন। বীরবলের জন্ম হয় মধ্যপ্রদেশের এক ব্রাহ্মণ পরিবারে। তাঁর নাম ছিল মহেশ দাস। তাঁর বুদ্ধির জোরেই তিনি আকবরের সভাতে স্থান লাভ করেছিলেন। আকবরই তাঁর নাম দিয়েছিলেন বীরবল। এখানে বীর এবং বল শব্দগুলো প্রধানত বুদ্ধির জোর বোঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে। তাঁকে রাজা উপাধিতেও ভূষিত করা হয়েছিল। এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে আকবরের সময় তিনি ওয়াজির-ই-আজম বা প্রধানমন্ত্রী পদেও নিযুক্ত হয়েছিলেন।

আকবরের সঙ্গে বীরবলের সাক্ষাৎকারের পর্বটি নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য, কারণ-ওই ঘটনা থেকেই আমরা তাঁর উপস্থিত বুদ্ধি এবং বিচক্ষণ মানসিকতার পরিচয় পেয়ে থাকি। এই নিয়ে বহু প্রচলিত একটি কিংবদন্তি শোনা যায়। আকবরের সঙ্গে বীরবলের সাক্ষাত হয় ১৫৫৬ সালে। আকবর একবার শিকারে গিয়ে বীরবলের কোনও একটি বুদ্ধিদীপ্ত কাজে খুশি হন। নিজের হাতের আংটি দিয়ে তিনি বীরবলকে বলেন তাঁর সঙ্গে রাজসভায় দেখা করতে। রাজসভার সামনে বীরবল গিয়ে উপস্থিত হলে তাঁর পোশাক-পরিচ্ছদ দেখে প্রহরীরা তাঁকে ভিতরে যেতে বাধা দেয়। সেই সময়ে বীরবল তাঁদেরকে সম্রাটের দেওয়া আংটি দেখায়। প্রহরীরা বুঝতে পারে সম্রাটের কাছ থেকে বীরবল নিশ্চয়ই এসেছে কোনও বড় পুরস্কার লাভের আশায়। উক্ত পুরস্কারের অর্ধেক প্রহরীদের দিতে হবে এমন শর্ত মেনেই প্রহরীরা তাঁকে ভিতরে প্রবেশ করতে দেয়। রাজসভায় আকবর তাঁর কী পুরস্কার লাগবে জানতে চাইলে বীরবল জানায় সে নিজের জন্য ১০০টি চাবুকের আঘাত চায়। এমন পুরস্কারের চাওয়ার কারণ জানতে চাইলে বীরবল আকবরকে সমস্ত সত্যি কথা বলেন… এই ঘটনাতে আকবর তাঁর উপরে অত্যন্ত খুশি হন এবং নিজের সভাসদ হিসেবে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। ধীরে ধীরে তাঁর নাম এবং পরিচিতি দুই বাড়তে থাকে।

আকবরের সভাসদ হিসেবে বীরবল প্রায়  ৩০ বছরেরও বেশি সময় নিযুক্ত ছিলেন। একজন একনিষ্ঠ এবং বিশ্বস্ত সভাসদ হিসেবে তিনি বারবারই আকবরের মন জয় করেছেন। আকবরকে দিয়েছেন সুপরামর্শও। বাংলা, বিহার এবং উড়িষ্যার বিভিন্ন জায়গাতে আকবরের সম্রাজ্য বিস্তারের অভিযানে তিনি অনেকক্ষেত্রেই নিযুক্ত ছিলেন। সামগ্রিকভাবে একটা জিনিস বেশ স্পষ্ট যে বীরবল শুধুমাত্র বুদ্ধিদীপ্ত নীতিবাগীশই ছিলেন না, সেনাবাহিনিতেও তাঁর ভূমিকা ছিল মনে রাখার মতো। তলোয়ার চালনাতেও তিনি বিশেষভাবে দক্ষ ছিলেন… আক্ষরিকভাবেই তাঁর মধ্যে বীরসত্তার প্রকাশ লক্ষ করা যায়।

বীরবল ছিলেন আকবরের অত্যন্ত স্নেহভাজন। তাঁদের পারস্পরিক কথোপকথন এবং দর্শনসম্পর্কীয় আলাপ আলোচনা স্থান-কাল-সময় নিরপেক্ষে আজও প্রাসঙ্গিক। ফতেপুর সিক্রিতে আকবরের নিজের মহলে ভেতরে, নিজ কক্ষের পাশেই ছিল বীরবলের কক্ষটি। আমরা অনেকেই কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে গিয়েছি, সেখানে সম্রাট আকবরের একটি ছবিতে ঠিক ডানপাশেই আমরা দেখতে পাব বীরবলকে। টুকরো টুকরো এমনই কয়েকটি ঘটনা থেকে জানা যায় যে বীরবলের প্রতি আকবর কতখানি নির্ভরশীল ছিলেন। আকবরের অনুপ্রেরণাতে তিনি ব্রহ্মকবি নামে সাহিত্য সংস্কৃতির চর্চা করতেন। একইসঙ্গে তিনি ছিলেন হিন্দি, ফারসি এবং সংস্কৃতে বিশেষভাবে দক্ষ। বেশ কিছু সঙ্গীত রচনাও তিনি করেছেন।

আকবর সর্বধর্ম সমন্বয়ে দীন-ই-ইলাহি নামে এক নতুন ধর্মমত প্রচার করেছিলেন। আইন-ই-আকবরী অনুসারে বীরবলও এই ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। বীরবল আকবরের থেকে প্রায় চোদ্দ বছরের ছোট ছিল। স্নেহভাজন এই সভাসদ ছিল আকবরের সভায় অন্যতম সেরা রত্ন। ঐতিহাসিক বিভিন্ন তথ্য থেকে আমরা জানতে পারি আকবরের প্রাসাদের সাতটি দরজার মধ্যে একটির নাম রাখা হয়েছিল বীরবলের দরজা। কার্যত বীরবলের মেধা এবং বুদ্ধিই তাঁকে সম্রাটের প্রিয়জনের জায়গা দিয়েছিল।