SalamWebToday নিউজলেটার
Sign up to get weekly SalamWebToday articles!
আমরা দুঃখিত কোনো কারণে ত্রুটি দেখা গিয়েছে:
সম্মতি জানানোর অর্থ, আপনি Salamweb-এর শর্তাবলী এবং গোপনীয়তার নীতি মেনে নিচ্ছেন
নিউজলেটার শিল্প

হিজরি ক্যালেন্ডার: ইতিহাস ও ব্যবহারের সুবিধা

শিক্ষা ০৫ জানু. ২০২১
মতামত
হিজরি ক্যালেন্ডার
© Konstantin Yuganov | Dreamstime.com

সভ্যতার পরশ পাওয়ার পর থেকেই মানুষ দিন ও রাতের পার্থক্য করতে শিখেছে। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর আহ্নিক গতি ও বার্ষিক গতির সম্পর্কেও মধ্যযুগের মুসলমান ভৌগলিকরা আমাদের জানিয়েছেন। এই দিন রাতের আবর্তন, ঋতুপরিবর্তন ইত্যাদির উপর নির্ভর করে প্রাচীন কাল থেকে মানুষ নিজেদের দৈনিক ও সামাজিক কাজকর্ম নির্ধারণ করত। মূলত ব্যবসা বাণিজ্য ও কৃষি নির্ভরশীল ছিল ঋতুপরিবর্তনের উপর। আর এই পুরোটাই আল্লাহর নির্দেশের ফল।

মহান আল্লাহ কুরআনে ইরশাদ করেছেন,

তিনিই সূর্যকে করেছেন দীপ্তিময় এবং চাঁদকে আলোময় আর তার জন্য নির্ধারণ করেছেন বিভিন্ন মনযিল, যাতে তোমরা জানতে পার বছরের গণনা এবং (সময়ের) হিসাব। আল্লাহ এগুলো অবশ্যই যথার্থভাবে সৃষ্টি করেছেন। জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য তিনি আয়াতসমূহ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেন। [ অধ্যায় ১০, স্তবক ৫]

ইসলামী কালেন্ডারের প্রসার

আল্লাহর নির্দেশ মত দিন রাত ও ঋতুপরিবর্তন হয়। আর আল্লাহর নির্দেশ মেনেই আমরা অর্থাৎ আল্লাহর বান্দারা অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় রীতি রেওয়াজ মেনে ক্যালেন্ডার সিস্টেমের পত্তন করেছি। সমাজে প্রত্যেক মানুষের প্রতিদিনের যাপনে অশেষ সুবিধা দেয় এই ক্যালেন্ডার।

যদিও বর্তমানে সারা বিশ্বে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারই ব্যবহার হয়। কিন্তু সহিহ মুসলমান হিসাবে আমাদের কখনো ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে পনেরো শতক জুড়ে ইন্দোনেশিয়া থেকে স্পেন পর্যন্ত মুসলমান ক্যালেন্ডারই প্রচলন ছিল।

এখনও বহু ধর্মপ্রাণ মুসলমান নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনে হিজরি ক্যালেন্ডার বা ইসলামী ক্যালেন্ডার ব্যবহার করে থাকেন।

কিন্তু আমার বক্তব্য, শুধুমাত্র রমজান কিংবা ঈদ কবে দেখার জন্য এই ক্যালেন্ডার ব্যবহার না করে, অতীতের মতো আমরা আবার এই ক্যালেন্ডারের ব্যবহার কেন ফিরিয়ে আনতে পারি না? এ তো আমাদের উম্মাহর ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার একটি সৎ প্রয়াস।

কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,

নিশ্চয় মাসসমূহের গণনা আল্লাহর কাছে বার মাস আল্লাহর কিতাবে, (সেদিন থেকে) যেদিন তিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। এর মধ্য থেকে চারটি সম্মানিত, এটাই প্রতিষ্ঠিত দীন। সুতরাং তোমরা এ মাসসমূহে নিজদের উপর কোন যুলম করো না, আর তোমরা সকলে মুশরিকদের সাথে লড়াই কর যেমনিভাবে তারা সকলে তোমাদের সাথে লড়াই করে, আর জেনে রাখ, নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকীদের সাথে আছেন। [অধ্যায় ৯, স্তবক ৩৬]

ইসলামী ক্যালেন্ডার বা হিজরি ক্যালেন্ডারের সূচনা

কুরআন নাজিল হওয়ার আগে আরবরা পৌত্তলিক ধর্ম পালন করত। এই ধর্মে তারা চাঁদ ও সূর্যকে একযোগে ধরে একটি ক্যালেন্ডার বানিয়েছিল। বলাই বাহুল্য, এই ক্যালেন্ডার বিশেষ সুগঠিত ছিল না। মাস গুলি চাঁদ অনুসারে গণনা হত, এবং বছরের শেষে ১০-১১ দিন বাড়তি হিসাব করা হত সূর্যের জন্য।

এই ক্যালেন্ডারের মাসের নাম ও সময়কাল আমাদের বর্তমান ইসলামী ক্যালেন্ডারের সঙ্গে মিলে যায়। অনেকে বলেন, নবী আব্রাহাম (সাঃ) ও তাঁর পুত্র নবী ইসমাইল (সাঃ)-এর থেকেই আরবরা এই ক্যালেন্ডারের ধারণা পেয়েছে।

পৌত্তলিক আরবরা নিজেদের ব্যবসা ও রাজনৈতিক কারণের জন্য কোণও স্থির পবিত্র মাস রাখত না। সুবিধামতো কোন মাস পবিত্র মাস কিংবা কোন মাসে যুদ্ধযাত্রা করা যাবে সেগুলো ঠিক করে নিত। এই ব্যাপারকে বলা হয় আল নাসই, এটি আমাদের ধর্মে হারাম। মহান আল্লাহ তালা কুরআনে ইরশাদ করেছেন,

নিষিদ্ধ মাসকে পিছিয়ে দেয়া কুফরীর উপর আরেক কুফরী কাজ যা দ্বারা কাফিরদেরকে পথভ্রষ্ট করা হয়। এক বছর তারা একটি মাসকে হালাল করে, আরেক বছর ঐ মাসটিকে হারাম করে যাতে আল্লাহর হারাম করা মাসগুলোর সংখ্যা পূর্ণ করা যায়। এভাবে তারা আল্লাহর হারাম করা মাসগুলোকে হারাম করে নেয়। তাদের খারাপ কাজগুলো তাদের কাছে আনন্দদায়ক। আল্লাহ কাফির সম্প্রদায়কে সঠিক পথ দেখান না। [অধ্যায় ৯, স্তবক ৩৭]

চন্দ্রমাসের সঙ্গে সংযুক্তি

সেই জন্যই মহান নবী রাসুল (সাঃ) তাঁর জীবনের শেষ হজে আল নাসই সম্পূর্ণ ভাবে দমন করে আমাদের ক্যালেন্ডারটিকে চান্দ্রমাসের সঙ্গে সংযুক্ত করে দিতে নির্দেশ দেন। আমদের দিন রাত ও বছর হিসাব করা হয় চাঁদের আবর্তন ও পরিক্রমণের মাধ্যমে। প্রিয় নবী আমাদের বছর ও জীবন উভয়ের মধ্যে এক অপরূপ পবিত্র ঐকতান এনে দিয়েছেন।

সূর্য ও চাঁদ (নির্ধারিত) হিসাব অনুযায়ী চলে। [কুরআন অধ্যায় ৫৫, স্তবক ৫]

তিনি যথাযথভাবে আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। তিনি রাতকে দিনের উপর এবং দিনকে রাতের উপর জড়িয়ে দিয়েছেন এবং নিয়ন্ত্রণাধীন করেছেন সূর্য ও চাঁদকে। প্রত্যেকে এক নির্ধারিত সময় পর্যন্ত চলছে। জেনে রাখ, তিনি মহাপরাক্রমশালী, পরম ক্ষমাশীল। [ কুরআন অধ্যায় ৩৯, স্তবক ৫]

এইভাবেই মহান নবী আমাদের উম্মাহ প্রতি বার্তা দিয়ে যান যে আমাদের জীবন সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর উপর নির্ভরশীল। আল্লাহর অঙ্গুলিহেলনে আমাদের উন্নতি ও আনন্দ। সুতরাং, আল্লাহর কাছে সমর্পণ করলে তবেই আমরা অশেষ শান্তি পাব।

সভ্যতার প্রতীক হিসাবে ক্যালেন্ডারের ভূমিকা

প্রিয় নবীর দেহত্যাগের পর খলিফা উমর বিন আল খত্তাব (রাঃ) নতুন ক্যালেন্ডারের গঠনের জন্য একটি কমিটি নির্ধারণ করেন। বহু পণ্ডিত সমন্বিত এই ক্যালেন্ডার ১৬ জুলাই, ৬২২ খ্রিস্টাব্দে  দিনটিকে চান্দ্রমাসের সূচনা হিসাবে ঘোষণা করে। এই দিন আমাদের মহান নবী রাসুল (সাঃ) মক্কা থেকে মদিনায় পদার্পণ করেছিলেন। এইভাবেই শুরু হয় আমাদের ইসলামের হিজরি ক্যালেন্ডার।

আজ ভাবতেও অবাক লাগে এতদিন আগে এরকম একটি বিজ্ঞান সম্মত ক্যালেন্ডার বানানো হয়েছিল। এমন ক্যালেন্ডার যা সারা পৃথিবীর মুসলমানদের জন্য এক। বাংলাদেশে বসে এবং মরক্কোতে বসে একই দিনে দুইজন মুসলমান রমজান পালন করতে পারেন। যেকোনো দিন চাঁদ দেখে ও মসজিদে গিয়ে যেকেউ জেনে আসতে পারে কোন মাস চলছে এবং সেই দিনের মাহাত্ম্য!

প্রাথমিকভাবে, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কারণে এই ক্যালেন্ডারের উপর জোর দেওয়া হলেও আস্তে আস্তে তা ইসলামী সভ্যতার একটি পদেক্ষেপ ও প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।

পবিত্র সময়ের নির্ঘণ্ট

ইসলামী ক্যালেন্ডারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল পবিত্র ও অপবিত্র সময়ের খুব স্পষ্ট ভাগ। আমরা চান্দ্রমাস অনুসারে বছর শুরু করি একটি পবিত্র মাস মহরম দিয়ে। এরপর আসে রবি আল আওয়াল, বলা হয় এই মাসে আমাদের প্রিয় নবীর জন্ম হয়েছিল। এরপর আসে রবি- II, জুমদা- I, জুমদা- II। এগুলিকে সাধারণ মাস হিসাবে ধরা হয়।

এরপর আসে রজব। রজব অত্যন্ত পবিত্র মাস। এরপর আসে শাবান, যদিও শাবান পবিত্র মাস নয়। কিন্তু প্রিয় নবী শাবানকে সবসময় বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। এরপর আমাদের সকলের প্রিয় রমজান, তারপর খুশির ঈদ।

আমরা বছর শেষ করি জিলকদ ও জিলহজ্জ মাস দিয়ে।

এছাড়াও প্রতি মাসে পূর্ণচন্দ্রের দিন ইসলাম বিধি অনুসারে আমাদের উপবাসের নির্দেশ রয়েছে। হিজরি ক্যালেন্ডারের মূল লক্ষ্য হল আমাদের মানসিক ও ধর্মীয় বোধের উন্নতি করা। পবিত্র মাসের নীতি আমাদেরকে সাধারণ মাসের জন্য তৈরি করে। সমস্ত সমস্যার সঙ্গে আমরা তখন হাসি মুখে লড়াই করতে পারি।

হিজরি ক্যালেন্ডার মেনে চললে আমাদের ফিতরা বজায় থাকবে, আমরা হয়ে উঠব আধ্যাত্মিক।

হিজরি ক্যালেন্ডার মেনে চলা কি কঠিন?

অনেকে বলেন কঠিন! সারা বিশ্বের লোকেদের সঙ্গে মিলবে না। স্কুল কলেজ বা কর্মক্ষেত্রে অসুবিধা হবে।

অনেকে কিন্তু অন্য কথা বলেন।

প্রাচীন ইসলামী সমাজ কিন্তু এমন একটি ক্যালেন্ডার বানিয়েছিল যা সারাবিশ্বের মানুষের প্রয়োজনে লাগে। অনেকক্ষেত্রেই গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার ও ইসলামী ক্যালেন্ডারের মাসের মধ্যে মিল রয়েছে। শুধু রমজান, মহরম ও ঈদ বাদে।

আমাদের উম্মাহর প্রতি কর্তব্য অনুসারে আমাদের হিজরি ক্যালেন্ডারের জন্য দাবী জানানো উচিত। তাহলেই বিশ্বে হিজরি ক্যালেন্ডারের প্রচলন আবার হবে। এখনই অনেক সংস্থা সাধারণ ক্যালেন্ডারের পাশাপাশি হিজরি ক্যালেন্ডার মেনে চলা শুরু করেছে।

গ্রেগরিয়ান সোলার ক্যালেন্ডারে প্রচুর ভুল রয়েছে সেটি এই বিষয়ে পড়াশুনো করলেই জানা যায়।

সুতরাং,

আমার একটিই বক্তব্য। আমার ইমানদার মুসলমান ভাই বোনেরা, নতুন বছর থেকে হিজরি ক্যালেন্ডার ব্যবহার করা শুরু করুন। কর্মক্ষেত্র থেকে ছুটি, সমস্ত কিছু ইসলামী মাস অনুসারে করুন। দেখবেন এলাহি আল্লাহর অশেষ রহমত থাকবে আপনার রিজিকে। আমিন।