হুকা কম ক্ষতিকারক, মারাত্মক ভুল ধারণা

hookah
ID 39752075 © Stbernardstudio | Dreamstime.com

‘হুকাহ’ তামাকজাত এই বিশেষ বস্তুটি ‘ঘালিয়ান’, ‘শিশা’ ইত্যাদি নামেও সুপরিচিত। প্রথমে আসা যাক হুকাপানের কথায়। প্রকৃতপক্ষে হুকা শব্দটি প্রাচীন ভারতীয় শব্দ ‘হুক্কাহ’ থেকে এসেছে, যার অর্থ নারকেল, যা থেকে হুকা প্রথম তৈরি হয়েছিল। এটি পরে বিভিন্ন নামেই ইসলামী ও আরব বিশ্ব জুড়ে এর পরিচিত হয়ে ওঠে। আজকাল তো এগুলি বিভিন্ন ক্যাফেতে পাওয়া যায়। মানুষের জীবনধারা বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে বসে আড্ডা বা আলোচনার ক্ষেত্রটি ক্রমে কমে আসছে, জনপ্রিয়তা লাভ করছে বিভিন্ন ক্যাফেটেরিয়াগুলি। সেখানে হুকাপান ভালোই জায়গা করে নিয়েছে।

ধর্মীয় কারণেও অনেকে ধূমপান না করে হুকাহপানকে বেছে নিচ্ছেন। পশ্চিমে ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া, এবং আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে ক্যাফে এবং রেস্তোঁরা সহ বিভিন্ন জায়গাতে রঙিন হুকা সরবরাহ করা হচ্ছে। পাইপ এবং বিভিন্ন স্বাদযুক্ত তামাক সেবনেক প্রতি মধ্য প্রাচ্যের বহু যুবক হুকহর প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে বর্তমানে।

হুকা হল একটা জলভর্তি পাইপ বা নল যেটি মিষ্টি সুগন্ধযুক্ত এবং বিভিন্ন ফ্লেভারের তামাক সেবনের কাজে ব্যবহার করা হয়। এই পাইপ সাধারণত বেশ লম্বা হয় এবং তলায় থাকে একটি জল ও একটি তামাকের চেম্বার। এটি একাধিক ফ্লেক্সিবেল টিউব-এর সঙ্গে যুক্ত থাকে, যাতে একই হুকা থেকে একসঙ্গে একাধিকজন ধূমপান করতে পারা যায়। এই তামাকের চেম্বার বা প্রকোষ্ঠটিতে একটি বাটিতে জ্বলন্ত চারকোল রাখা হয় এবং চারকোলগুলি তামাকের উপর রাখা হয়। তামাক এবং চারকোলের মাঝখানে একটি ছিদ্রযুক্ত অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল রাখা থাকে। চারকোল যখন তামাককে গরম করে তোলে, তখন তামাক থেকে ধোঁয়া বের হয় এবং এই ধোঁয়া জলের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে বলে, তাপমাত্রা হারিয়ে ঠান্ডা হয়ে যায়। তাই সিগারেটের গরম ধোঁয়ার বদলে হুকা থেকে ঠান্ডা ধোঁয়া নির্গত হয়।

শুধুমাত্র যুক্তরাজ্যে এর ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে, প্রায় ২১০ শতাংশ( ২০০৭ সাল থেকে)। অল্প বয়সী বহু ছেলে মেয়েরাই এর প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। অল্প বয়সী অনেকেই বন্ধুমহলে থাকাকালীন হুকা খেয়ে থাকেন, এই প্রকারের তামাক সেবনের একমাত্র কারণই হল যে তারা মনে করেন যে সিগারেটের তুলনায় হুকা শরীরের পক্ষে কম ক্ষতিকারক, কিন্তু তাদের এই ধারণা কার্যত ভুল।

হুকাতে যে তামাক ব্যবহার করা হয় তাকে মিষ্টি স্বাদের এবং সুগন্ধযুক্ত করার জন্য নানারকম ফলের শাঁস এবং মধু মেশানো হয়। পছন্দ অনুযায়ী নারকেল, পুদিনা বা কফির ফ্লেভারও মেশানো হয়ে থাকে। এই মিষ্টি স্বাদ ও নানারকম পছন্দের গন্ধ অল্পবয়সীদের কাছে হুকাকে আকর্ষণীয় করে তোলে। এটা একটা প্রচলিত ধারণা যে হুকা থেকে যে ধোঁয়া নির্গত হয় তাতে নিকোটিন এবং অন্যান্য দূষিত পদার্থগুলি থাকে না। এটি সম্পূর্ণরূপে ভ্রান্ত। যদিও হুকা থেকে নির্গত ধোঁয়া নরম প্রকৃতির হয় এবং তাপমাত্রা কম থাকায় ফুসফুসের নরম কলাকোষগুলিকে আঘাত কম করে। কিন্তু তাতে হুকার ধোঁয়ায় উপস্থিত দূষিত পদার্থগুলির পরিমাণ তথা ক্যান্সার তৈরি করার জন্য তামাকে উপস্থিত ক্ষতিকর রাসায়নিকগুলির পরিমাণ কম হয় নয়। হুকাতে উপস্থিত কয়েকটি ক্ষতিকর রাসায়নিক হল— কার্বন মনোক্সাইড, টার, আরসেনিক, ক্রোমিয়াম, কোবাল্ট,ক্যাডমিয়াম, নিকেল, ফর্মালডিহাইড, অ্যাসিট্যালডিহাইড, অ্যাক্রোলিন, লেড, পোলোনিয়াম নামক তেজষ্ক্রিয় পদার্থ। এছাড়াও হুকাতে ব্যবহৃত চারকোল জ্বালালে, তা থেকে কার্বন মনোক্সাইড নানারকম ধাতব পদার্থ এবং ক্যান্সার সৃষ্টিকারী পলি অ্যারোমাটিক হাইড্রোকার্বন উৎপন্ন হয়, যা আরও নানারকম শারীরিক ক্ষতি সাধন করে। একটি সিগারেটে সাধারণত ৭-২২ মিলিগ্রাম নিকোটিন থাকে যার মধ্যে ১ মিলিগ্রাম শোষিত হয় শরীরে। হুকাতে কিন্তু ৭টি সিগারেটের সমান মাপের নিকোটিন জমা রাখা হয়।

ধূমপায়ীরা একটি সিগারেটে ২০ বার টান দিলে ৫০০-৬০০ মিলিলিটার ধোঁয়া সেবন করেন। সেখানে ৪৫ মিনিট টানা হুকা পান করলে ২০০ বার টান দিতে হয় এবং প্রায় ৯০০০ মিলিলিটার ধোঁয়া যার শরীরের ভিতরে। সিগারেটের তুলনায় হুকাপানে প্রায় ৬ গুণ বেশি কার্বন মনোক্সাইড এবং ৪৬ গুণ বেশি টার শরীরে প্রবেশ করে যার ক্ষতির মাত্রা মারাত্মক। দেখা গিয়েছে, দিনে একবার হুকা পান করলে যে ক্ষতি সাধিত হয়, তা দিনে ২-১০টা সিগারেট পানের সমান।

সুতরাং হুকাপানে শরীরের ক্ষতি কম তো হয়ই না উপরন্তু সিগারেটের থেকেও বেশি ক্ষতি সাধিত হয় শরীরে। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (ডাব্লুএইচও) নিশ্চিত করেছে যে এক ঘণ্টার হুকাসেশন ১০০ সিগারেট সেবনের পরিমাণ ক্ষতিকারক হতে পারে।

নিকোটিন ত্বকের ভিতরের রক্তনালীগুলির পথ সংকীর্ণ করে। এটি ত্বকের রক্ত ​​প্রবাহ বাধা পায়, যা এটিকে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন-এ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি পেতে বাধা দেয়। তামাকটি সাধারণত ফলের বা ফুলের স্বাদে নারকেল, আপেল, ভ্যানিলা এবং গোলাপের সঙ্গে সজ্জিত হয় … ফ্রুটফ্লেভারস তামাকের খারাপ স্বাদকে মুখোশ দেয়, তামাকজাত পণ্য ব্যবহার শুরু করা সহজ করে তোলে। লোকেরা একবার একটি তামাকজাত পণ্য ব্যবহার করতে শুরু করলেও তারা অন্যদের সঙ্গে খাওয়ার প্রবনতা  বেশি থাকে। প্রথম অংশটি তামাকের স্বাদ তৈরির জন্য ব্যবহৃত সংশ্লেষগুলি সাধারণত কৃত্রিম সুগন্ধযুক্ত যৌগগুলি তৈরি করে যা কার্সিনোজেনিক প্রভাবগুলিও বহন করে।

হুকাস্মোমকিংয়ে পুরুষ ও মহিলাদের শারীরিক নানা প্রভাব পড়ে। এটি শুক্রাণু উত্পাদন করার দক্ষতার উপরও প্রভাব ফেলে। যার ফলস্বরূপ কম বীর্যপাত হয়। দীর্ঘমেয়াদে, ধূমপান করলে জেনেটিক পরিবর্তনগুলি বংশধরকে প্রভাবিত করতে পারে। গর্ভবতী মহিলাদের ত্রুটিযুক্ত বাচ্চাদের জন্ম দেওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। ক্ষতিকারক ভারী ধাতু এবং টক্সিনগুলি মাতৃদুগ্ধের সঙ্গে নবজাতকের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

এছাড়াও মুখের ক্যান্সার, ফুসফুসের ক্যান্সার, পাকস্থলীর ক্যান্সার, ইসোফেগাসের ক্যান্সার, হৃৎপিণ্ডের রোগ ও ফুসফুসের অন্যান্য সমস্যা হতে পারে এর থেকে।

আজকাল কিছু কিছু হুকা বার দাবি করে, তারা হুকাতে নানারকম ফ্লেভার ব্যবহার করে। তামাক কোনওভাবেই ব্যবহার করে না। তর্কের খাতিরে সে কথা যদি মেনেও নেওয়া যায়, তবুও চারকোলের ধোঁয়াতে প্রচুর পরিমাণে উপস্থিত কার্বন মনোক্সাইড এবং টারের দূষিত পদার্থজনিত ক্ষতিকে এড়ানো সম্ভব কি? তাই অন্যান্য তামাকজনিত বদঅভ্যাসের মতো হুকাপানও একটি বদভ্যাস। একে বর্জন করাটাই উচিত।