SalamWebToday নিউজলেটার
Sign up to get weekly SalamWebToday articles!
আমরা দুঃখিত কোনো কারণে ত্রুটি দেখা গিয়েছে:
সম্মতি জানানোর অর্থ, আপনি Salamweb-এর শর্তাবলী এবং গোপনীয়তার নীতি মেনে নিচ্ছেন
নিউজলেটার শিল্প

হুদাইবিয়ার সন্ধি: ইসলামি ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়

ইতিহাস ১১ জানু. ২০২১
ফোকাস
হুদাইবিয়ার সন্ধি
© Rrvenkat | Dreamstime.com

কখনও কখনও, এমন কিছু ঘটনা ঘটে যেগুলি তাৎক্ষণিক ভাবে অকিঞ্চিৎকর বা অবমাননাকর বলে মনে হয়। কিন্তু পরবর্তী সময় দেখা যায়, সেই ঘটনাই কোনও উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক মোড়ের সূচনা করে। ইতিহাসে এমন বহু ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। হুদাইবিয়ার সন্ধি (৬ হিজরী, ৬২৮ খ্রিস্টাব্দ) হল এমনই একটি ঘটনার উদাহরণ। আল্লাহ সুরা ফাতেহ-তে এই চুক্তিকে ‘প্রকাশ্য বিজয়’ (আয়াত ১) হিসাবে বর্ণনা করেছেন। এই সন্ধি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরে মুসলমানরা মদিনায় ফিরে আসলে এই সুরাটি প্রকাশিত হয়েছিল। এই সন্ধিকে কেন এমন অতুলনীয় বিজয় হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, তা আলোচনা করার আগে আসুন আমরা কিছু মূল ঐতিহাসিক ঘটনা আর একবার স্মরণ করি।

হুদাইবিয়ার সন্ধির প্রেক্ষাপট

ষষ্ঠ হিজরীতে, রাসূল (সাঃ) স্বপ্নে দেখেছিলেন যে, মুসলমানরা উমরা পালন করছেন। নবীর স্বপ্ন নিছক স্বপ্ন নয়, বরং সেটিও এক ধরনের ওহী। সেই কারণে তিনি প্রায় ১৪০০ সাহাবীকে নিয়ে উমরা পালনের লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করেছিলেন। মুসলমানরা ইহরামের পোশাক পরিধান করা সত্ত্বেও, মক্কার কুরাইশরা পবিত্র মসজিদগামী পথ রোধ করে। এরপরে, কিছু কৌশলে অবলম্বনের মাধ্যমে মুসলমানরা মক্কা থেকে প্রায় নয় মাইল দূরে অবস্থিত হুদাইবিয়ায় পৌঁছন। সেখানে উসমান ইবনে আফফান (রা) কে রাসূল কুরাইশদের কাছে প্রেরণ করেছিলেন। তিনি কুরাইশদের বুঝিয়েছিলেন যে, মুসলমানরা শান্তিপূর্ণ ভাবে উমরা পালন করতে এসেছেন এবং তারপরে তাঁরা ফিরে যাবেন।

কুরাইশদের সাথে কথা সেরে উসমান (রা)-এর মুসলিম শিবিরে ফিরতে দেরি হওয়ায়, গুজব ছড়ায় যে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। তখন অন্য সাহাবীরা একটি গাছের নীচে একসাথে অঙ্গীকার করেছিলেন যে তাঁরা মহানবী (সাঃ) – এর পাশে থেকে শেষ পর্যন্ত লড়াই করবেন। আল্লাহ সুরা ফাতেহ-এর ১০ এবং ১৮ আয়াতে এই সাহাবীদের শ্রেষ্ঠত্ব এবং তাঁদের অন্তরের পবিত্রতার কথা উল্লেখ করেছেন।

এর পরে উসমান (রা) ফিরে এলে মুসলমানরা কোনও হঠকারী পদক্ষেপ না করার সিদ্ধান্ত নেন। কুরাইশরা এই সময় মুসলিমদের ধৈর্য্য ও একতা পরীক্ষা করার জন্য উরওয়া বিন মাসুদকে দূত হিসেবে পাঠানো হয়। উরওয়া মনে করতেন যে, পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে মুসলমানরা নবী মুহাম্মদ (সাঃ)-কে পরিত্যাগ করবেন। কিন্তু দৌত্যে এসে উরওয়া ক্রমশ বুঝতে পারেন যে, মহানবী (সাঃ)-এর সঙ্গীরা তাঁর প্রতি কতটা অনুগত।

এরপরে চূড়ান্ত দৌত্যের জন্য পাঠানো হয় সুহায়ল ইবনে আমরকে। দীর্ঘ আলাপ আলোচনার পরে রসূল (সাঃ) এবং কুরাইশদের মধ্যে হুদাইবিয়ার সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়।

হুদাইবিয়ার সন্ধির প্রধান শর্তগুলি ছিল

(১) মুসলমানেরা সে বছর উমরা না করেই মদিনায় ফিরে যাবে।

(২) আগামী বছর উমরার জন্য এসে মুসলমানরা তিন দিন মক্কায় অবস্থান করতে পারবেন এবং তাঁদের অবস্থানকালে কুরাইশরা মক্কা ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যাবেন।

(৩) কুরাইশ এবং মুসলমানদের মধ্যে পরবর্তী অন্তত দশ বছর যুদ্ধ বন্ধ থাকবে।

(৪) কুরাইশদের মধ্যে থেকে কেউ মদিনায় আশ্রয়গ্রহণ নিলে তাকে ফেরত দিতে হবে। কিন্তু মদিনার কোনও মুসলমান মক্কায় আশ্রয়গ্রহণ করলে, তাকে ফেরত দেওয়া হবে না।

(৫) আরবের যে কোনও গোত্রের লোক মুসলমান বা কুরাইশদের সাথে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হতে পারবেন। (৬) মক্কার ব্যবসায়ীরা নিরাপদে মদিনার পথ ধরে সিরিয়া, মিশর প্রভৃতি দেশে ব্যবসা করতে যেতে পারবেন।

(৭) মক্কায় বসবাসকারী মুসলিমদের জান ও মালের নিরাপত্তা প্রদান করা হবে।

(৮) চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী উভয় পক্ষ একে অপরের সম্পদকে সম্মান করবে।

(৯) মক্কায় প্রবেশ করার সময় মুসলমানরা কোনও রকম বর্শা বা ফলা আনতে পারবে না। তবে আত্মরক্ষার জন্য নিজেদের সাথে কোষবদ্ধ তলোয়ার রাখতে পারবে।

সন্ধি পরবর্তী নৈতিক জয়

এই চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করার পরে, রসূল (সাঃ)-এর নির্দেশে সাহাবীরা সাথে আনা পশুর কোরবানী দিয়ে ও নিজেদের মাথা কামিয়ে মদিনায় ফিরে যান। হুদাইবিয়া থেকে মদিনা ফেরার পথে রসূল (সাঃ) ঘোষণা করেন, ইসলামের প্রকাশ্য বিজয় হয়েছে। সেই সময় অনেকেই তাঁকে প্রশ্ন করেন যে, উমরা পালন না করে ফেরত আসা সত্ত্বেও কীভাবে এই চুক্তিকে প্রকাশ্য বিজয় বলা সম্ভব। উত্তরে রসূল (সাঃ) বলেছিলেন, “বরং, এটি হল সমস্ত বিজয়ের মধ্যে সেরা।”

প্রকৃতপক্ষে এই হুদাইবিয়ার সন্ধি ছিল হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) -এর অতুলনীয় দূরদর্শিতার ফল। এই সন্ধি অনুসারে পরবর্তী বছর তিনি ২০০০ সাহাবীকে নিয়ে মক্কায় উমরা পালন করতে আসেন এবং সেখানে কুরাইশদের মধ্যে নেতৃত্বের শূন্যতা লক্ষ্য করেন। তার পরের বছরই অর্থাৎ অষ্টম হিজরীতে (৬৩০ খ্রিস্টাব্দে) রসূল (সাঃ) বিনা রক্তপাতে মক্কা দখল করেন। ঐতিহাসিকদের মতে, হুদাইবিয়ার সন্ধির মাধ্যমে ইসলামের যে বিজয় যাত্রা শুরু হয়েছিল তা মক্কা বিজয়ে পূর্ণতা লাভ করে। হুদাইবিয়ার সন্ধির গুরুত্ব মুসলমানরা দুই বছর পরে উপলব্ধি করেছিলেন।