হুসেন শাহী বংশের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত রাজশাহীর বাঘা মসজিদ

bagha mosque bangladesh

রাজশাহী জেলা সদর হতে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে বাঘা উপজেলায় অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক মসজিদ হচ্ছে ‘বাঘা মসজিদ’। মসজিদটি ১৫২৩-১৫২৪ সালে (৯৩০ হিজরি) হুসেন শাহী বংশের প্রতিষ্ঠাতা আলাউদ্দিন শাহের পুত্র সুলতান নুসরাত শাহ নির্মাণ করেন। ইটের দেয়ালে ঘেরা ৪৮.৭৭ মিটার বর্গাকার এর মাঝে স্থাপনাটি অবস্থিত। এই চত্বরের মাঝে বেশ বড় আকারের একটি পুকুরের পশ্চিম পাড়ের মসজিদটি নির্মিত। মসজিদ চত্বরে প্রবেশের জন্য দুটি পুরনো খিলান কৃত প্রবেশপথ ছিল। এর একটি উত্তর দিকে এবং অন্যটি ছিল দক্ষিণ দিকে।দক্ষিণ দিকে প্রবেশ করতে ছিল সাধারণ আয়তাকারের আকৃতির একটি কাঠামো আর এর উভয় পাশেই ছিল একটি করে মিনার। মসজিদটি সংরক্ষণ করার জন্য বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধীনে রয়েছে।

মসজিদের আঙিনা

পুরো মসজিদটি ২৫৬ বিঘার উপর অবস্থিত। সমতল ভূমি থেকে প্রায় ৮ থেকে ১০ ফুট উঁচু করে মসজিদটির আঙিনা তৈরি করা হয়। মসজিদটির উত্তর পাশের ফটকের উপরের স্তম্ভ কারুকাজ প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। মসজিদটিতে মোট ১০ টি গম্বুজ রয়েছে। আর ভেতরে রয়েছে ৬টি স্তম্ভ। মসজিদটিতে ৪টি মেহরাব রয়েছে যা অত্যন্ত কারুকার্য খচিত। দৈর্ঘ্য ৭৫ ফুট প্রস্থ ৪২ ফুট, উচ্চতা ২৪ ফুট ৬ ইঞ্চি। দেয়াল চওড়া ৮ ফুট গম্বুজের ব্যাস ৪২ ফুট, উচ্চতা ১২ ফুট। চৌচালা গম্বুজের ব্যাস ২০ ফুট উচ্চতা প্রায় ৩০ ফুট। ফার্সি ভাষায় লেখা একটি শিলালিপি রয়েছে মাঝখানে দরজার উপর।

ভেতরে এবং বাইরের দেয়ালে মেহরাব ও স্তম্ভ রয়েছে। বাঘা মসজিদের দৈর্ঘ্য ২২.৯২ মিটার, প্রস্থ ১২.১৮ মিটার এবং উচ্চতা ২৪ ফুট ৬ ইঞ্চি। এর দেয়াল ২.২২ মিটার পুরু। মসজিদটিতে সর্বমোট ১০টি গম্বুজ, ৪টি মিনার (যার শীর্ষদেশ গম্বুজাকৃতির) এবং ৫টি প্রবেশদ্বার রয়েছে। মসজিদটি চারিদিক থেকে দেয়াল দিয়ে ঘেরা এবং দেয়ালের দুদিকে দুটি প্রবেশদ্বার রয়েছে। দর্শনীয় মসজিদটির ভেতরে ও বাইরে সর্বত্রই টেরাকোটার নকশা রয়েছে। মসজিদের পাশের বিশাল দিঘি মসজিদের সৌন্দর্যকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে। তাছাড়া একটি মাজার শরীফও রয়েছে এই মসজিদটির পাশে।

মসজিদ সংলগ্ন দিঘি

মূলত চুন ও সুরকি দিয়ে বাঘা মসজিদের গাঁথুনি দেয়া হয়েছে। মসজিদের ভেতর এবং বাইরে দেয়ালের সুন্দর মেহরাব স্তম্ভ যে কাউকেই আকর্ষণ করতে যথেষ্ট। তা ছাড়াও এতে আরো আছে পোড়ামাটির অসংখ্য কারুকাজ যার ভেতরে রয়েছে আমগাছ, শাপলা, ফুল লতা পাতা সহ ফার্সি শিল্পে ব্যবহৃত হাজার রকমের কারুকাজ। হযরত শাহ শাহদৌলা ও তার ৫ সঙ্গীর এর মাজার রয়েছে এই মসজিদ প্রাঙ্গণ এর উত্তর পাশে। নাসিরুদ্দিন নুসরত শাহ কল্যাণমূলক কাজ হিসাবে মসজিদের সামনে একটি দীঘি খনন করেন। তিনি ছিলেন বাংলার স্বাধীন সুলতান আলাউদ্দিন হুসাইন শাহর পুত্র। ৫২ বিঘা জমির উপর রয়েছে এই দীঘিটি। পুরো দীঘিটি সারিবদ্ধ নারিকেল গাছ দ্বারা বেষ্টিত। প্রতিবছর শীতকালে দিঘিতে অসংখ্য পাখির আগমন ঘটে। পাখির কলতানে মুখরিত হয়ে ওঠে।

বাঘা মেলা

বর্তমানে দিঘিটির চারটি বাঁধানো পাড় নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া এ মসজিদ সংলগ্ন জহর খাকী পীরের মাজার রয়েছে। মূল মাজারের উত্তর পাশে রয়েছে তার কবর। ১৯৯৭ সালে মাজারের পশ্চিম পাশে খনন কার্যের ফলে ৩০ ফুট বাই ২০ ফুট আয়তনের একটি বাঁধানো মহল পুকুরের সন্ধান পাওয়া যায়। এটি মসজিদের সংলগ্ন মাটির নিচ থেকে আবিষ্কৃত হয়। এই পুকুরটি একটি সুরঙ্গ পথ দিয়ে অন্দরমহল এর সাথে সংযুক্ত ছিল। মসজিদের ভেতরে ও বাইরে এখনো প্রচুর পোড়ামাটির ফলক রয়েছে। মসজিদের ভেতরে উত্তর-পশ্চিম কোণে একটু উঁচুতে নির্মিত একটি নামাজের কক্ষ আছে। এ মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় প্রতিবছর ঈদুল ফিতরের দিন থেকে ৩ দিন পর্যন্ত ‘বাঘার মেলা’র আয়োজন করা হয়। এ মেলাটি ৫০০ বছরের ঐতিহ্য।