হোমস্কুলিং-এর সঠিক উপায় কোনগুলি?

শিক্ষা ২৯ ডিসে. ২০২০ Contributor
মতামত
হোমস্কুলিং
© Twenty2photo | Dreamstime.com

হোমস্কুলিং বা বাড়িতে পড়াশুনো- এই বিষয়ে নানা জনের নানা মতামত রয়েছে। কেউ বলেন স্কুলের পরিবেশে শিশু অনেক বেশি শেখে। শুধু তাই নয়, বাইরের পরিবেশের সঙ্গে কীভাবে মানিয়ে নেবে সেই বিষয়েও সম্যক ধারণা হয় তার।

আবার অনেকে বলেন বাড়িতে শিক্ষা বা হোমস্কুলিং-এর মাধ্যমে শিশুকে অনেক সুরক্ষিত পরিবেশে সঠিক শিক্ষাদান করা যায়। বিশেষ করে, আমাদের উম্মাহ ও ধর্মে ইসলামি শিক্ষার প্রচলন রয়েছে। সেই শিক্ষার জন্য হোমস্কুলিং-এর ভূমিকা অনস্বীকার্য!

কিন্তু হোমস্কুলিং শুনতে যতটা সহজ মনে হয় আদতে ততটা নয়। প্রত্যেক বাবা-মা যারা নিজের সন্তানকে নিজের সুরক্ষিত ঘেরাটোপের মধ্যে রেখে শিক্ষা দিতে চায়, তারা অজস্র প্রশ্নের সম্মুখীন হয়।

হোমস্কুলিং-এর সঠিক উপায় কোনটা?

ভাষাশিক্ষা, ইতিহাস, ভূগোল ও বিজ্ঞান শিক্ষার পাশাপাশি ইসলামি শিক্ষার উপর জোর দেব কীভাবে? দুই ধরনের শিক্ষাই কি ভারসাম্য বজায় রেখে প্রদান করা যায়?

প্রত্যেকটা প্রশ্ন যুক্তিযুক্ত। প্রত্যেকটা প্রশ্নের উত্তর না জানা থাকলে হোমস্কুলিং বেশ কঠিন হয়ে যায়।

সুতরাং, প্রত্যেক আদর্শ মুসলমান পিতামাতার এই চিন্তা থাকা উচিত যে কীভাবে সন্তানকে আদর্শ শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা যায়। কীভাবে আদর্শ মুসলমান হওয়ার শিক্ষা দেওয়া যায় ও ইহসান বা উতকর্ষতার জ্ঞান দেওয়া যায়।

আমি যখন হোমস্কুলিং শুরু করি সবার আগে আমার সমস্যা হয়েছিল কারিকুলাম নিয়ে। এমন কোনও কারিকুলাম এখনও তৈরি হয়নি যেখানে লোকায়ত শিক্ষা ও ইসলামি শিক্ষা পাশাপাশি রয়েছে। এমনকি ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্রগুলোতেও একই অবস্থা। এতে যেটা হয়, দুই ধরনের শিক্ষা পরপর শিশুকে দেওয়া হলে তার পক্ষে সমস্যাজনক হয়ে ওঠে। জীবনের পথে কোন শিক্ষা সে নেবে সেটা নিয়ে সে বেশ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়।

তখন আমি সিদ্ধান্ত নিই নিজের সন্তানের জন্য নিজের মতো করে আমি একটি সিলেবাস ও কারিকুলাম বানাবো। যেখানে লোকায়ত শিক্ষার পাশাপাশি ইসলামি শিক্ষাও থাকবে, এবং দুটোর মধ্যে কোনও বিরোধ থাকবে না।

তাছাড়াও, ভাল ব্যবহার, সহমর্মিতা, সহানুভূতি ইত্যাদিও থাকবে সেই শিক্ষার মধ্যে।

সর্বোপরি, আমার মেয়ে প্রতি মুহূর্তে উপভোগ করবে যখন আমি তাকে পড়াবো।

আমার মতো অনেকেই হোমস্কুলিং পদ্ধতিতে শেখানোয় বিশ্বাসী। তাদের সাহায্যের জন্য রইল আমার নিজের অর্জিত কিছু টিপস-

হোমস্কুলিং- এ নিজের উদ্দেশ্য ঠিক করুন ও তাতে অটল থাকুন

কোনও কিছু শুরু করার আগে একটি সঠিক দিক ও উদ্যেশ্য আমাদের প্রয়োজন হয়। আল্লাহ  তালা বলেন,

‘আমি সৃষ্টি করেছি জিন ও মানুষকে এ জন্য যে, তারা আমারই ইবাদাত করবে।’ [কুরআন অধ্যায় ৫১, স্তবক ৫৬]

সন্তানকে এমন শিক্ষা দিন যেন সে আল্লাহর ইবাদত করতে শেখে। কুরআন ও হাদিসের প্রতি তার জন্য অটল বিশ্বাস থাকে। মনে রাখবেন, নিজের সুরক্ষার মধ্যে শিশুকে শিক্ষা দিচ্ছেন মানে বাইরের হারাম বস্তুর থেকে আপনি তাকে দূরে রাখছেন। সেই দূরত্ব যেন তার বড় বয়সেও বজায় থাকে সেই উদেশ্যেই আপনি হোমস্কুলিং-এর শিক্ষা নিয়েছেন।

শিশুকে পড়তে শেখান। মহান আল্লাহ কুরআনের মাধ্যমে আমাদের প্রিয় নবী রাসুল (সা.) কে নির্দেশ দিয়েছিলেন,

 ‘তুমি পাঠ কর তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।’ [কুরআন ৯৬, স্তবক ১]

মহান নবীর আল্লাহর কাছ থেকে এই উদ্দেশ্য প্রাপ্ত হয়েছিলেন যে পাঠ ও শিক্ষার মাধ্যমে সমস্ত মানুষ যে আল্লাহর উপাসক হয়ে ওঠে। সকলে যেন ভালোত্ব ও উতকর্ষতার প্রসারে নিয়োজিত হয়।

মনে রাখবেন, আল্লাহর উদ্দেশ্য অনুসারে নিজের শিশুকে শিক্ষা দিলে আপনি ও আপনার সন্তানের উপর অশেষ রহমত বর্ষিত হবে।

কোনও কিছু শেখার থেকে কখনও পিছু হঠবেন না

মনে রাখবেন, হোমস্কুলিং-এ শিক্ষক আপনিই। সুতরাং আপনার যদি সম্যক জ্ঞান না থাকে তাহলে আপনি কিছুতেই সন্তানকে মনের মতো শিক্ষা দিতে পারবেন না। নিয়মিত কুরআন পাঠের অভ্যাস তৈরি করুন। তাফসির ও হাদিস নিয়মিত পরিমার্জনা করুন। কুরআনের মাহাত্ম্য এমনই যে প্রতি পাঠে আমাদের সামনে নতুন ভাবনার দরজা খুলে দেয়।

আমরা যদি নিয়মিত পঠন পাঠনের মধ্যে থাকি তাহলে আমাদের সন্তানও উৎসাহিত হবে। দুদিন আপনাকে কুরআন পাঠ করতে দেখলে তৃতীয় দিন সে নিজেও এসে বসবে আপনার পাশে।

সন্তানের মানসিকতার খেয়াল রাখুন

হোমস্কুলিং মানেই কিন্তু শুধুমাত্র শিক্ষিত করা নয়। সন্তানের মানসিক অবস্থা কেমন থাকছে। তার ব্যবহার কেমন, সে কীসে আগ্রহ পায়। কীসে তার ভয়। তার পড়াশুনোর ধরন কেমন এই সমস্ত বিষয়ে কিন্তু আপনাকেই খেয়াল রাখতে হবে। চাইল্ড সাইকোলজির সম্পর্কে অবগত না হলে হোমস্কুলিং-এর সঠিক উপকার আপনি আপনার সন্তানকে দিতে পারবেন না। উদাহরণ হিসাবে বলি, ইসলামে দৈহিক শাস্তি একেবারে নিষিদ্ধ। শিশুর গায়ে কখনও হাত তুলবেন না। শান্তভাবে তাকে বোঝান, আপনি যদি তার মানসিকতা বুঝে উঠে থাকেন তাহলে সে অবশ্যই আপনার কথা শুনবে।

জ্ঞানের জগত সম্পর্কে ধারণা রাখুন

আমরা একটা বিষয় জানার পর সেটা নিয়ে আর ফলোআপ করি না। এইটা হোমস্কুলিং-এর ক্ষেত্রে বেশ সমস্যা সৃষ্টি করে। সন্তানকে কোনও একটি বিষয় নিজে শিক্ষা দেওয়ার পর সেটির বিষয়ে খোঁজ রাখুন। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়,

আমরা বরাবর জেনে এসেছি মানবদেহে অ্যাপেন্ডিক্স একটি নিষ্ক্রিয় অঙ্গ। কিন্তু সম্প্রতি গবেষকরা জানিয়েছেন যে আমাদের পরিপাকতন্ত্রের যে ব্যক্টেরিয়া রয়েছে সম্ভবত অ্যাপেন্ডিক্স সেগুলির ‘সেফ হাউজ’ হিসাবে কাজ করে।

এই ভাবে সমস্ত বিষয় সম্পর্কে আপনি অবগত থাকলে আপনার সন্তানকে সঠিক শিক্ষা দিতে পারবেন।

সন্তানকে আল্লাহর মাহাত্ম্য সম্পর্কিত ধারণা দেওয়ার দায়িত্ব কিন্তু আপনারই

পাঠক্রম এমনভাবে তৈরি করুন যেন তাতে আল্লাহর সমস্ত বাণী ও উদ্দেশ্যর সঠিক নির্দেশণা থাকে। একটা উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা বোঝাই,

ধরুন আপনি আপনার সন্তানকে পাখি কীভাবে ওড়ে তা শেখাচ্ছেন। সুতরাং লোকায়ত শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে আপনি সন্তানকে এটাও বলবেন যে মহান আল্লাহর কুরআনে রয়েছে,

‘তারা কি আকাশে (উড়ন্ত অবস্থায়) নিয়োজিত পাখিগুলোর দিকে তাকায় না? আল্লাহ ছাড়া কেউ তাদেরকে ধরে রাখে না। নিশ্চয় তাতে নিদর্শনবলী রয়েছে সেই কওমের জন্য যারা বিশ্বাস করে।’ [কুরআন অধ্যায় ১৬, স্তবক ৭৯]

এভাবেই কিন্তু লোকায়ত শিক্ষার সঙ্গে ইসলামি শিক্ষার মেলবন্ধন করা যায়।

অনুরূপভাবে, আপনি যদি সন্তানকে মানবসভ্যতার ইতিহাস শোনান তবে তাকে অবশ্যই শেখাবেন যে মহান আল্লাহ বলেছেন,

‘অবশ্যই তোমাদের পূর্বে অনেক রীতি-নীতি অতিবাহিত হয়েছে, অতএব তোমরা যমীনে ভ্রমণ কর, দেখ অস্বীকারকারীদের পরিণতি কিরূপ হয়েছিল।’ [ অধ্যায় ৩, স্তবক ১৩৭]

অর্থাৎ, শুধুমাত্র আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করার জন্য কত উন্নত সভ্যতা ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে।

ইন্ট্যার‍্যাক্টিভ লার্নিং-এ জোর দিন

আমেরিকার বিখ্যাত রাষ্ট্রপতি বেঞ্জামিন ফ্র্যাংকলিন বলেছেন, ‘আমাকে মুখে বললে আমি বিস্মৃত হব, আমাকে শেখানো হলে আমি মনে রাখবো আর আমাকে যদি নিযুক্ত করা হয় তাহলে আমি অবশ্যই শিখব’

এই কথাটির অর্থ হল, আপনি যত আপনার সন্তানকে পড়াশুনোর সঙ্গে সংযুক্ত করবেন, সে তত তাড়াতাড়ি শিখবে।

নীরস ভাবে পড়িয়ে যাবেন না। শুধু ক্লাস ওয়ার্ক আর হোম ওয়ার্কের মধ্যে আপনার শিক্ষা যেন সীমাবদ্ধ না থাকে। আপনার সন্তানের সঙ্গে কথা বলুন। তার মতামত জানতে চান। সে কী ভাবছে বিষয়টি নিয়ে, অন্য কোনও উপায়ে সে কোনও সমস্যা সল্ভ করতে পারবে কিনা সেই বিষয়ে তাকে এনকারেজ করুন।

আপনার খোলা মনের এই উৎসাহ তাকে আরও বেশি করে শিখতে আগ্রহী করবে।

ভাবতে শেখান

ভাবনা চিন্তা করা আসলে আল্লাহর প্রতি ইবাদত করার অন্যতম পথ। আল্লাহ তালার এই পৃথিবী ও কুরআন থেকে যে শিক্ষা আমরা পাই একমাত্র ভাবনা চিন্তার মাধ্যমেই সেই শিক্ষা জীবনে আমরা সফলভাবে কাজে লাগাতে পারব।

ভাবনা চিন্তার মাধ্যমে আমাদের পঞ্চেন্দ্রিয়র অন্বেষণ থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সমস্ত কিছুই সম্ভব।

আল্লাহ তালা বলেন,

‘নিশ্চয় আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টিতে, রাত ও দিনের বিবর্তনে, সে নৌকায় যা সমুদ্রে মানুষের জন্য কল্যাণকর বস্ত্ত নিয়ে চলে এবং আসমান থেকে আল্লাহ যে বৃষ্টি বর্ষণ করেছেন অতঃপর তার মাধ্যমে মরে যাওয়ার পর যমীনকে জীবিত করেছেন এবং তাতে ছড়িয়ে দিয়েছেন সকল প্রকার বিচরণশীল প্রাণী ও বাতাসের পরিবর্তনে এবং আসমান ও যমীনের মধ্যবর্তী স্থানে নিয়োজিত মেঘমালায় রয়েছে নিদর্শনসমূহ এমন কওমের জন্য, যারা বিবেকবান।’ [কুরআন অধ্যায় ২, স্তবক ১৬৪]

সুতরাং আপনার সন্তানকে অবশ্যই ভাবতে শেখাবেন। সমাজের সকলর সঙ্গে মিশে মৃত মাছের মতো স্রোতের অনুকূলে ভেসে যাওয়ার আগে সে যেন থমকে দাঁড়িয়ে একবার ভাবতে পারে। এইটুকু ক্ষমতা আপনাকেই হোমস্কুলিং-এর মাধ্যমে তৈরি করতে হবে।

প্রোজেক্ট বেসড লার্নিং-এ জোর দিন

আগেই বলেছি, একঘেয়ে মুখস্ত বিদ্যার মাধ্যমে আপনি কিছুতেই আপনার সন্তানকে উপভোগ্য শিক্ষা দিতে পারবেন না। সে শিখতে চাইবে না, এমনকি পড়াশুনো তার কাছে ভীষণ একঘেয়ে একটি বিষয় হয়ে উঠবে। সুতরাং জ্ঞান ও ভাবনা আদানপ্রদানের মাধ্যমে আপনি আপনার

সন্তানকে শিক্ষিত করে তুলুন। আর এই বিষয়ে প্রোজেক্ট বেসড লার্নিং-এর কোনও জুড়ি নেই। একটি বিষয় ঠিক করে দিন এবং শিশুকে বলুন সেই বিষয়ে যে যা যা জ্ঞান আহরণ করতে পারে তা একটি খাতায় যেন সুন্দর ভাবে গুছিয়ে লেখে।

এছাড়াও আমাদের মহান নবীর জীবনের একটি ঘটনা তাকে শুনিয়ে আপনি জিজ্ঞাসা করতে পারেন সে এই জায়গায় থাকলে কী করত? এতে শিশুর ভাবনা ও ধারণা শক্তির উতকর্ষতা বৃদ্ধি পাবে।

আমাদের মহানবী রাসুল(সা)-র জীবন সম্পর্কে আপনার শিশুকে শিক্ষা দিন

ইসলামের সূচনা কীভাবে হয়েছিল। কীভাবে আল্লাহর বরকত প্রাপ্ত নবী আমাদের মধ্যে ইসলামের প্রসার ঘটান। সেই জন্য তাঁকে জীবনে কী কী কষ্টের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। হাদিস ও তাফসির থেকে ছোট ছোট ঘটনা গল্পের মতো আপনার শিশুকে শোনান। দেখুন সে কীভাবে ঘটনাগুলি গ্রহণ করছে। এরপর গল্পগুলিকে তাদের নিজের মতো করে লিখতে বলুন। পোস্টার বানাতে বলুন। এমনকি কখনও কখনও শিশুকে বলুন আপনাকে হাদিস সম্পর্কে শিক্ষা দিতে। দেখবেন, এভাবেই আপনি আপনার সন্তানকে ইসলামের পবিত্র উদ্দেশ্য সম্পর্কে ধারণা দিতে পারবেন।

হোমস্কুলিং আদতে স্বয়ং সম্পূর্ণভাবে নিজের সন্তানকে নিজের মতো করে তৈরি করা। সৎ উদ্দেশ্যে সঠিক পথ অনুসরণ করুন, আলহামদুলিল্লাহ, স্বয়ং আল্লাহ আপনার কাজ সহজ করে দেবে।