২০০ বছরের বেশি সময়ের জন্য মুসলিম বিশ্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল ইতালির সিসিলি দ্বীপ

Ancient Sicily Map.
Ancient Sicily Map in the Gallery of Geographical Maps at Vatican Museums. Photo 97158126 © - Dreamstime.com

ইউরোপীয় মহাদেশে ইসলামের অভিযান সম্পর্কে আলোচনা করা হলে, অধিকাংশ জায়গাতেই তুলে ধরা হয় মূলত দুটি জায়গার কথা। প্রথমটি হল, মুসলিম স্পেন বা আল-আন্দালুস, যার অস্তিত্ব ছিল ৭১১ থেকে ১৪৯২ অবধি (যদিও সেখানে মুসলিম সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বাস ছিল ১৬০৯ পর্যন্ত) এবং দ্বিতীয়টি হল, অটোমান সাম্রাজ্য, যা ১৩০০ শতকের গোড়ার দিকে আনাতোলিয়া থেকে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে  ছড়িয়ে পড়েছিল

তবে এই ধরনের আলোচনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাদ পড়ে যায়, ইতালীয় উপদ্বীপের দক্ষিণ উপকূলবর্তী দ্বীপ সিসিলি-তে মুসলিম শাসনের ইতিহাস এখানে ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল। জেনে নেওয়া যাক সেই গৌরবময় ইতিহাস।

দক্ষিণ আফ্রিকায় আঘলাবিদ শাসন

উত্তর আফ্রিকার মুসলিম বিজয়কে মুসলিম রাষ্ট্র ও বাইজেন্টাইন (পূর্ব রোমান) সাম্রাজ্যের মধ্যে যুদ্ধের ধারাবাহিকতা হিসাবে দেখা যেতে পারে, যা শুরু হয়েছিল মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর সময় থেকেই

খলিফা ওমর (৬৩৪-৬৪৪)-এর আমলে প্রথম দফায় অভিযানের ফলে মিশর এবং আধুনিক লিবিয়ার পূর্ববাংশ জয় করে ছড়িয়ে পড়েছিল মুসলিমরাতবে খলিফা উসমান ও আলীর আমলে মুসলিম সামরিক তৎপরতা হ্রাস পেয়েছিল।

এরপরে ৬৬১ সালে মুয়াবিয়া-র দ্বারা উমাইয়া খিলাফত প্রতিষ্ঠার পরে সামরিক তৎপরতা অব্যাহত ছিল। সপ্তম শতাব্দীর শেষের দিকে, মুসা ইবনে নুসায়েরের নেতৃত্বে মুসলিম সেনাবাহিনী মরক্কোতে আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে পৌঁছেছিল।

৭৫০ খ্রিস্টাব্দে আব্বাসীয় বিপ্লবের পরে উত্তর আফ্রিকার আপেক্ষিক স্বায়ত্তশাসন বৃদ্ধি পায়, এবং এর ফলে একটি নতুন পরিবার খলিফা পদ লাভ করে ও বাগদাদে মুসলিম জগতের জন্য একটি নতুন রাজধানী তৈরি হয়।

দূরত্বজনিত কারণে উত্তর আফ্রিকা শাসনের কাজে অসুবিধা হওয়ায়, আব্বাসীয় সরকার একজন স্থানীয় গভর্নর, ইব্রাহিম-ইবনে আল-আঘলাবকে ক্ষমতা প্রদান করেন এবং তিনি কায়রাওয়ানা এলাকায় (বর্তমান টিউনিশিয়া) ৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে অর্ধ-স্বায়ত্তশাসিত সাম্রাজ্য স্থাপন করেন

সিসিলি অভিযান

৮০০ শতকের শুরুর দিকে চরম অস্থিরতার মধ্যে সিসিলিতে আঘলাবিদ অভিযানের পিছনে বেশ কয়েকটি কারণ ছিলপ্রথমত, দ্বীপে রাজনৈতিক সমস্যার কারণে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সময় বাইজেন্টাইন নৌ-সেনাপতি ইউফেমিয়াস ৮২৬ সালে আঘলাবিদ রাজদরবারে হাজির হন। 

তাঁর বিদ্রোহের কারণগুলি স্পষ্ট ছিল না এবং আঘলাবিদ আমির প্রথম জিয়াদাতাল্লাহ তাঁকে সাহায্য করার বিষয়ে দ্বিধায় ছিলেন, বিশেষ করে ৮১৭ খ্রিস্টাব্দে বাইজেন্টাইনদের সাথে স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তি কার্যকর হওয়ার পরে তিনি তা লঙ্ঘন করতে চাননি

এই অভিযানের অপর একটি কারণ ছিলেন, আসাদ ইবনে আল-ফুরাত নামের এক বিদ্বান ব্যক্তিঅত্যন্ত জনপ্রিয় ও রাজনৈতিক ভাবে সক্রিয় এই বিদ্বান ব্যক্তিকে পছন্দ করতেন না আঘলাবিদ আমির। সেই সময় ইবনে আল-ফুরাত সিসিলি অভিযানের প্রস্তাব দেন।এবং তিনি বাইজান্টাইনের সাথে স্বাক্ষরিত শান্তি চুক্তিরও বিরোধিতা করেন, যেহেতু তখনও বহু মুসলিম নাবিক বাইজান্টাইনের হাতে বন্দি ছিল।

পরিস্থিতি পুরোটাই তখন আমিরের অনুকূলে। এর ফলে তিনি সহজেই বাইজান্টাইনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে মধ্য ভূমধ্যসাগরে তাদের বাণিজ্যিক প্রতিপত্তি খর্ব করে দিতে পারতেন এবং একই সাথে আসাদ-ইবনে আল-ফুরাত (এবং সেই সমস্ত অনুগামী ও সেনা, যাঁরা বিপ্লব করার জন্য আল-ফুরাতকে সাহায্য করতে পারেন)-কে সিসিলি অভিযানে পাঠিয়ে নিজের গদি মজবুত করতে পারতেন। এবং তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে, সিসিলি অভিযান ব্যর্থ হবে। এই হিসেব কষে আমীর সিসিলি অভিযান করেছিলেন। 

তবে এই অভিযান সফল হয়। উত্তর আফ্রিকা থেকে রওনা দেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই ওই বাহিনী (প্রায় ১০০০ জন) সিসিলির পশ্চিম তীরে পৌঁছে যায়। সেখানে বাইজেন্টাইন সেনাদের সাথে প্রবল যুদ্ধ হয় ও মুসলিমরা জয়ী হয়। সিসিলি-র পালেরমো শহর দখল করার সময় আসাদ ইবনে আল-ফুরাত অসুস্থ হয়ে মারা যান (৮২৮ খ্রিস্টাব্দ) এবং তখন মুসলিম সেনার উপরে বাইজেন্টাইন থেকে পাঠানো নতুন সেনাবাহিনী নতুন পরাক্রমে আক্রমণ চালায়

সিসিলি বিজয়

যুদ্ধে এবং রোগের কারণে প্রচুর সেনা ও নেতার প্রাণহানির পরে, যখন সিসিলি অভিযান ব্যর্থ হতে বসেছে, তখন উমাইয়া আল-আন্দালুস থেকে আসা সেনারা সিসিলি-তে এসে পৌঁছয় (৮৩০ খ্রিস্টাব্দ) এবং তাদের সাথে যোগদান করে আঘলাবিদ অভিযানে আসা সেনাবাহিনীর অবশিষ্ট কয়েক জন। 

এরপরে পুনরুজ্জীবিত মুসলিম সেনাবাহিনী পালেরমোর দিকে যাত্রা করে এবং সফলভাবে সেই শহর দখল করে

এতদিন পর্যন্ত সিসিলি অভিযান নিয়ে প্রথম  জিয়াদতাল্লাহ আগ্রহী না হলেও, এই সময় থেকে তিনি আগ্রহ দেখাতে শুরু করেন এবং নিজের এক আত্মীয়কে পাঠান পালেরমো-র গভর্নর (আরবদের কাছে বালারম হিসাবে পরিচিত) হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করার জন্য

এরপরেই, সিসিলি একটি কার্যকরী সরকার ও অর্থনীতি-সহ আঘলাবিদ সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশ হিসাবে বিবেচিত হতে শুরু করে। দ্বীপের বাকি অংশে অভিযান অব্যাহত ছিল।

ধীরে ধীরে নিকটবর্তী গ্রামাঞ্চল এবং শহরগুলি পৃথকভাবে পালেরমো-র মুসলিম শাসনের সামনে নতি স্বীকার করে। বাইজেন্টাইন অধিকৃত শেষ অংশগুলি ৯৬৫ সালে দখল করা হয়। ফলে গোটা দ্বীপই চলে আসে দক্ষিণ আফ্রিকার আঘলাবিদ শাসনের অধীনে। এভাবে সমগ্র সিসিলি দ্বীপে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং তারপরেও বহু বছর পর্যন্ত ইতালির এই এলাকা মুসলিম জগতের অন্তর্ভুক্ত ছিল।