২০৭০ সালের মধ্যে তীব্র আকার নেবে পৃথিবীর উষ্ণতা

প্রকৃতি Contributor
জ্ঞান-বিজ্ঞান
পৃথিবীর উষ্ণতা
Photo : Unsplash

এই মুহূর্তে মানবসভ্যতা তথা পৃথিবীর জন্য এক ভয়ংকর সমস্যা হল বিশ্ব উষ্ণায়ন বা গ্লোবাল ওয়ার্মিং। অনেক সমীক্ষায় ইতিমধ্যে ধরা পড়েছে এর মারণ রূপ। ওজোন স্তরের ছিদ্র থেকে শুরু করে উত্তর মেরুর বরফ গলা – সবেতেই ধরা পড়েছে এর ভয়াল রূপ। এমন অনেক প্রাণী রয়েছে, বিজ্ঞানীদের মতে পৃথিবীর উষ্ণতা আর ১-৪ ডিগ্রি বাড়লেই তাদের অধিকাংশ চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। আর এই বিশ্ব উষ্ণায়নের পিছনে প্রায় সম্পূর্ণভাবে দায়ী মানুষেরাই। এবারে বিজ্ঞানীরা গবেষণায় জানালেন ২০৭০ সালের মধ্যে পৃথিবীর গড় উষ্ণতা এমন জায়গায় পৌঁছতে পারে যার ফলে পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ মানুষের বাসস্থান পুরোপুরি ভাবে বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে যেতে পারে। আমেরিকা, ইউরোপে এবং চীনের এক আন্তর্জাতিক দলের এই গবেষণা সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে Proceedings of the National Academy of Sciences জার্নালে।

কীভাবে করা হয়েছে এই পৃথিবীর উষ্ণতা সংক্রান্ত গবেষণা?

বিজ্ঞানীরা এই গবেষণার জন্য ঐতিহাসিক তথ্যকেও গুরুত্ব দিয়েছেন। তারা পুরোনো ভৌগোলিক তথ্য ঘেঁটে দেখেছেন সবথেকে বেশি মানুষ বসবাস করতেন সেই সব অঞ্চলে যেখানে গড় তাপমাত্রা থাকত ১১-১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ১৫-২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস গড় তাপমাত্রা যুক্ত অঞ্চলে তার থেকে কম লোকজনের বাস এবং ২০-২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস গড় তাপমাত্রা যুক্ত অঞ্চলে আরও কম মানুষ বাস করে। বিজ্ঞানীরা বসবাসের উপযুক্ত জায়গা চিহ্নিত করতে গিয়ে প্রায় ৬০০০ বছর অব্দি আগেকার অবস্থার কথা মাথায় রেখেছেন।

এই গবেষণার সাথে যুক্ত মার্টিন শেফারের মতে এই জায়গা গুলো যেহেতু বসবাসের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের দ্বারা ব্যবহৃত তাই নিঃসন্দেহে সেগুলো উপযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। তারা এরপর দেখতে চেয়েছেন পৃথিবীর গড় উষ্ণতা বাড়ার সাথে সাথে কোন কোন অঞ্চল থেকে মানুষ বসবাস গুটিয়ে ব্যাপকহারে অন্যত্র চলে গেছে। গবেষণায় উঠে এসেছে এই মুহূর্তে প্রায় ২ কোটি মানুষ এমন জায়গায় বসবাস করে যেখানকার গড় উষ্ণতা ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস, এবং এই জায়গা গুলো পৃথিবীর মোট স্থলভাগের মাত্র ১%। কিন্তু বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে আফ্রিকা, এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের তাপমাত্রা প্রায় এরকমই হয়ে যেতে চলেছে।

কী জানা গেল এই গবেষণাতে?

ঠিক কত মানুষ এই তীব্র গরমের কবলে পড়তে পারে তা নির্ভর করছে তাপ ধরে রাখতে সক্ষম কার্বন-ডাই-অক্সাইড জাতীয় দূষকের পরিমাণ এবং পৃথিবীর জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের উপর। তবে আনুমানিক হিসেব অনুসারে প্রায় ৩৫০ কোটি মানুষ, যা কিনা পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যার সমান, ২০৭০ সালের মধ্যে প্রায় বসবাসের অনুপযুক্ত উষ্ণ জায়গায় বাস করতে বাধ্য হবে। অনেক বিজ্ঞানীদের মতে প্রায় ২০০ কোটি মানুষকে বাধ্যতামূলক ভাবে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার মধ্যে বসবাস করতে হবে। আর সে কারণে সবথেকে বেশি যে গোষ্ঠী সমস্যায় পড়তে চলেছে তারা হল সাধারণ নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং গরীব মানুষ। পরের ৫০ বছরে অপেক্ষাকৃত উষ্ণ অঞ্চল থেকে ব্যাপক হারে মানুষ বাসস্থান গুটিয়ে অন্যত্র চলে যাবে বলে তাদের পরীক্ষায় আভাস দেয়া হয়েছে।

এই গবেষণা মানুষের দ্বারা সৃষ্ট আবহাওয়া পরিবর্তন এবং বিশ্ব উষ্ণায়নের ভয়ঙ্কর দিকটি তুলে ধরেছে। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর নাটালি মাহওয়াদ এর মতে, “সংখ্যাটি এত বেশি এবং এত কম সময় অবস্থাটিকে আরও ভয়ঙ্কর করে তুলেছে।” তবে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এখনও মানুষের হাতে সময় আছে এই বিশ্ব উষ্ণায়ণের হার কে নিয়ন্ত্রণ করার। আর তা এখুনি না করা হলে খুব শীঘ্রই পৃথিবীর ভবিষ্যতের পক্ষে খুব কঠিন সময় আসতে চলেছে। গবেষণার সাথে যুক্ত গ্লোবাল সিস্টেম ইনস্টিটিউটের নির্দেশক টিম লেন্টনের মতে আর একটু উষ্ণতা বাড়লে নাইজেরিয়ার মত দেশ, যেখানে এই শতাব্দীর শেষে জনসংখ্যা ৩০০ গুণ বাড়তে চলেছে বলে অনুমান, ভয়ঙ্কর অবস্থার সম্মুখীন হতে চলেছে।